পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ানোর দায়িত্ব সরকারের

প্রকাশিত: ৬:৪৪ অপরাহ্ণ , জানুয়ারি ২৯, ২০২২

– বাপ্পি সরদার –

প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ । প্লাস্টিক দূষণ বলতে প্লাস্টিক পদার্থ ব্যবহারের পর অপচনশীল দ্রব্য হিসেবে যা বন্যপ্রাণী, পৃথিবীর আবাসস্থল এবং মানব সমাজে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। মূলত মাইক্রো, মেসো এবং মাইক্রোবর্জ্য তিন রকমের প্লাস্টিক পণ্যের ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা যেতে পারে। গত ২০২০ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২১ ইং ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা বাংলাদেশে ২০ জেলার ১০০ জন করে ব্যক্তির উপর প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার ও দূষণ সম্পর্কে জরিপ চালানো হয়, যা বাস্তবায়ন করে সবুজ আন্দোলন তথ্য ও গবেষণা পরিষদ। বাংলাদেশের মানিকগঞ্জ, মাগুরা, টাঙ্গাইল, পঞ্চগড়, রংপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, মেহেরপুর, যশোর, ঢাকা, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নওগাঁ, বগুড়া, নীলফামারী, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, ভোলা জেলায় সাংগঠনিক কাজ এবং গবেষণা চালানো হয়। তাতে দেখা গেছে বাংলাদেশের শতকরা ৯৮ ভাগ জনগণ প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করেন তবে ২ ভাগ জনগণ এখনো কাঁচ ও মাটির পন্য ব্যবহার করেন। অধিকাংশ মানুষ প্লাস্টিক পণ্য সহজলভ্য হওয়ায় ব্যবহারে আগ্রহী আবার প্রবীণ ও কিছু সচেতন ব্যক্তি পাটজাত পণ্য ও কাপড়ের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ব্যবহার করেন। তবে তরুণ প্রজন্মই প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার বেশি করে থাকেন। গ্রামাঞ্চলে প্লাস্টিকের ব্যাগ একবার ক্রয় করলে পুনরায় পরিষ্কার করে ব্যবহার করার প্রবণতা বেশি। সে ক্ষেত্রে শহর অঞ্চলে একবার ব্যাবহারের চিত্র বেশি। প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ।” আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে ১৯৫০ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সারা পৃথিবী জুড়ে প্রায় ৭৫০ কোটি টন প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করা হয়েছে। যার মধ্যে ব্যবহৃত ৮০ ভাগ পণ্যের পচন ধরেনি। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ প্রায় ১৩০০ কোটি টন প্লাস্টিক ব্যবহার করা হতে পারে। আরেকটি সমীক্ষায় দেখা যায় প্রতি মিনিটে সাগরে ৩৫ হাজার প্লাস্টিক পণ্য পানিতে গিয়ে পড়ে। যা বছরে গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৪ মিলিয়ন। প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে কার্বন নিঃসরণ ও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি বছর সারা পৃথিবী জুড়ে প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনে ১৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল দরকার পড়ে। প্রতি কেজি প্লাস্টিক উৎপাদনে ২/৩ কেজি কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন হয়। যার ফলে জলবায়ুতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। প্লাস্টিক মোড়কে জোড়া খাবার যখন ফ্রিজে রাখা হয় পরবর্তীতে সেটি বাইরে বের করলে স্টাইরিন নামক গ্যাস উৎপাদিত হয় যা নিঃশ্বাসের মাধ্যমে বা লোমকূপ দিয়ে মানব দেহে প্রবেশ করে। যার ফলে মাথা ব্যাথা, দুর্বলতা, জটিল ও কঠিন রোগ ব্যাধির জন্য এমনকি স্নায়ুতন্ত্র বিকলের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। প্লাস্টিকের পানির বোতল ও ট্যাপ ব্যবহারের প্রবণতা বেশি। যার মাধ্যমে মানুষের শারীরিক প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস, এলার্জি, হাঁপানি, চর্ম রোগ, থাইরয়েডের অতিরুক্ত হরমোন ধারণ এবং ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগ দেখা দিয়েছে। সাগরে পতিত প্লাস্টিক পণ্যে সূর্য রশ্মির বিকিরণ ঘটে, যার ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিক উৎপন্ন হয়ে মাছের শরীরে প্রবেশ করে। অতিরিক্ত প্লাস্টিক পণ্য সাগরে পতিত হওয়ায় প্রায় ৮৫০ প্রজাতির জলজ প্রাণী রোগে আক্রান্ত হয়। প্রতিবছর ১০ থেকে ১২ লাখ পাখি প্লাস্টিক দূষণের শিকার হয়। প্রতিবছর মাথাপিছু একজন ব্যক্তি ১৮ কেজি পলিথিন ব্যবহার করে। নিম্নমানের পলিথিন উৎপাদনের জন্য রাসায়নিক দ্রব্য ও রং ব্যবহার করা হয়। যেমন ক্যাডমিয়াম, লেড, টাইটোনিয়াম, ক্রোমিয়াম, নিকেল কপার ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। শহরে বছরে ৮.৫ লাখ টন পরিত্যক্ত প্লাস্টিক পলিথিন উৎপন্ন হয়। ৩ লাখ টন প্লাস্টিক নদীর পাড় ও উপকূলীয় অঞ্চলের মাটির নিচে ও পাড়ে ফেলে দেওয়া হয়। দেশের শতকরা ৪০ ভাগ তরুণ প্লাস্টিক ব্যবহার করে থাকেন।” প্লাস্টিক পণ্যের পরিবর্তে পচনশীল পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে হবে। বিশেষ করে সোনালী আঁশ অর্থাৎ পাটের পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে হবে। সরকারিভাবে আলাদা প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যেকটি বিক্রয় কেন্দ্রে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি ও নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে। গণমাধ্যমে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিয়মিত বিজ্ঞাপন প্রদান ও পলিথিন ব্যবহারে অনীহা তৈরি করা যায় এমন গল্প, গান,নাটক,সিনেমা নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠন ও সমাজে পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে সচেতনতার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি পাটকল গুলোকে পুনরায় চালুর ব্যবস্থা করতে হবে প্রয়োজনে ভর্তুকি প্রদান করতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে কৃষকদেরকে পাট উৎপাদনে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি অধিদপ্তর থেকে পাটের বীজ ও সার সাশ্রয়ী মূল্যে প্রদান করতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাট কেনার ব্যবস্থা করতে হবে। বিভাগীয় শহরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা রোধে ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ করতে হবে। রিসাইকেলিং প্রক্রিয়া জোরদার করতে হবে এবং আলাদা কমিশন গঠন করতে হবে। পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি ও ক্রেতা পর্যায়ে দাম কমানো এবং কাপড়ের ব্যাগের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সমুদ্র ,নদী ও জলাশয়ে প্লাস্টিক পণ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে এবং সারাদেশের বাজার, পাবলিক প্লেস ডাস্টবিন নির্মাণ করতে হবে।পলিথিন উৎপন্ন হয় এমন সকল কারখানা বন্ধ করতে হবে। হোটেল, কাঁচা বাজারসহ সকল দোকানে পাটের ব্যাগ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে জৈব প্লাস্টিক উৎপাদনে গবেষণা জোরদার এবং বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোক্তাদের অর্থ সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। বন, পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোকে গিয়ে স্টেকহোল্ডার বডি তৈরি করতে হবে।পাট মন্ত্রণালয়কে ঢেলে সাজাতে হবে এবং পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।

 

লেখক: বাপ্পি সরদার প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান সবুজ আন্দোলন পরিচালনা পরিষদ। [email protected]