মানবতাবাদী গায়ক ফকির আলমগীর স্মরণে -সুজন হাজং

প্রকাশিত: ৩:০৪ পূর্বাহ্ণ , আগস্ট ৬, ২০২১

শহিদ বীরাঙ্গনা হাজং মাতা রাশিমনিকে নিয়ে একটা গান লিখেছিলাম। এটি বিপ্লবী চেতনার গান। একটি জাগরণের গান। সামাজিক সচেতনতা ও আন্দোলনের গান। গণসংগীত শিল্পী ফকির আলমগীরকে চিন্তা করেই লিখেছিলাম গানটি। যেহেতু গানটি হাজং বিদ্রোহ তথা কৃষক আন্দোলনে হাজং মাতা রাশিমণির বীরত্বগাঁথা কৃতিত্ব ও বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নিয়ে লেখা তাই শ্রদ্ধেয় ফকির আলমগীরের দরাজ কণ্ঠেই গাওয়ানোর পরিকল্পনা ছিল। কয়েকবার কথাও বলেছিলাম, তিনি গানটি গাওয়ার ইচ্ছা সানন্দে প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু করোনার কারণে গানটি সেইসময় গাওয়া হলোনা। এখন তো আর কোনদিন গাওয়া হবে না।

জাতীয় কবিতা পরিষদের আয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরে প্রতিবছর ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় কবিতা উৎসব উদযাপন করা হয়।
যেখানে এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা থেকে প্রথিতযশা অনেক বিদেশি কবিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাঁরা এসে স্বকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিভিন্ন ভাষায় কবিতা পাঠের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন দেশ, বিভিন্ন ভাষা বৈচিত্র্যের কবিতা উৎসবের মিলন মেলায় স্বতঃস্ফূর্ত, উজ্জ্বল উপস্থিতি লক্ষ্য করতাম ফকির আলমগীরের।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক,
ফকির আলমগীর ছিলেন মানবতাবাদী গায়ক। তিনি আজীবন সোচ্চার ছিলেন সাম্প্রদায়িকতা ও অমানবিকতার বিরোদ্ধে‌।

তিনি প্রতিবারই অমর একুশে গ্রন্থমেলায় আসতেন। তুমুল আড্ডা দিতেন। কবি, লেখক, পাঠক, ভক্ত অনুরাগীদের সাথে কুশল বিনিময় করতেন। বিভিন্ন ধরণের গল্প করতেন। ছবি তুলতেন। চা খেতেন। আপাদমস্তক একজন সংস্কৃতিবান পরিশীলিত বাঙালি ফকির আলমগীর। বিভিন্ন মঞ্চে ও মঞ্চের বাইরেও গান শোনাতেন। কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষের দুঃখ কষ্টের কথা সবসময় বলতেন। বিভিন্ন সংগঠনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে তাঁর অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত ছিল। কাউকে কথা দিলে সে কথা তিনি রাখতেন। মানুষকে খুব সহজেই আপন করে নেয়ার অসাধারণ গুণ ছিল তাঁর। একজন নিরহংকার, বন্ধুবৎসল, সাদা মনের মজার মানুষ ছিলেন। ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ ভরাট গলায় হাস্যরসাত্মক কথা বলতে ভালবাসতেন। বন্ধুদের সাথে কৌতুক করতেন।

গণসংগীতের চর্চা ও বিকাশের জন্য তিনি ১৯৭৬ সালে ৠষিজ শিল্পগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করেন। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৯৯ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন।

ফকির আলমগীরের ও সখীনা গেছস কি না ভুইলা আমারে গানটির আবেদন গ্রামীণ সমাজে ব্যাপক ও বিস্তৃত। ‘মায়ের এক ধার দুধের দাম’, গানটি‌ মা দিবসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থান,
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও নব্বইয়ের সামরিক শাসনবিরোধী গণ–আন্দোলনে
তাঁর গান বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, নেলসন ম্যান্ডেলা, কমরেড মণিসিংহ, বেগম রোকেয়া, জন হেনরী, মাওলানা ভাসানী, সুফিয়া কামাল, ভূপেন হাজারিকা, ফিদেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভারা, ইলামিত্র, মহাশ্বেতা দেবী, জাহানারা ইমাম, শেখ হাসিনা, সুচিত্রা সেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ শামসুল হক,‌ শাবানা আজমী, কবরী সারোয়ার, কামাল লোহানী, আনিসুজ্জামান, রেজোওয়ানা চৌধুরী বন্যা, মালালা ইসুফজাই, এভারেস্টজয়ী মুসা ইব্রাহীমসহ অসংখ্য বরেণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে গান গেয়েছেন। সম্প্রতি আলোচিত
তনু হত্যার প্রতিবাদেও গান গেয়েছেন।
ড. তপন বাগচীর লেখা শতাধিক গানে কণ্ঠ দিয়েছেন ফকির আলমগীর।

ফকির আলমগীর তাঁর জীবদ্দশায়
বলেছিলেন, “শ্রেণি সংগ্রামের গান, মানবমুক্তির গান, লড়াইয়ে শপথে উদ্দীপ্ত করার যে গান, সেটাই আমি গাওয়ার চেষ্টা করি। যতদিন শ্রেণি-বৈষম্য থাকবে, শোষণ-বঞ্চনা থাকবে, অন্যায়-অবিচার থাকবে, ততদিন গণসঙ্গীতের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে না।”

সমাজের শোষণ-বঞ্চনা, শ্রেণিবিভাজনের বিরোদ্ধে অসংখ্য প্রতিবাদের গান গেয়েছেন ফকির আলমগীর। দেশের ক্রান্তিকালে সংগ্রামী চেতনার গান গেয়ে উদ্বুদ্ধ করেছেন গণমানুষকে। উজ্জীবিত করেছেন নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষের কণ্ঠস্বরকে। মানবতার জয়গান গেয়ে জীবনের আত্মতৃপ্তি খোঁজা বরেণ্য গণসংগীত শিল্পী ফকির আলমগীর এখন চিরঘুমের দেশে। কিংবদন্তি ফকির আলমগীর করোনার কাছে পরাজিত হলেও গণমানুষের ভালবাসার কাছে অপরাজিত। তাঁর গান অনুপ্রাণিত করবে
আমাদের সমাজ, দেশ, শ্রমজীবী মানুষ এবং সংগ্রামী চেতনাকে।

লেখক: সুজন হাজং, গীতিকার, পরিচালক, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি, বিরিশিরি নেত্রকোণা।