স্বপ্ন ও দার্শনিকতায় ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’

প্রকাশিত: ১:৪৫ অপরাহ্ণ , জুলাই ১২, ২০২১
সাজ্জাদুল হাসান

বঙ্গবন্ধু কন্যা, জননেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ মূলত আধুনিক বাংলাদেশের দৃষ্টি ও দর্শন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার লক্ষ্যে এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার একটা সচেতন প্রয়াসে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর দার্শনিকতাকে বাস্তবায়ন করে চলেছেন। 

‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ দার্শনিক প্রত্যয়টির যাত্রা শুরু হয়েছিল ১২ ডিসেম্বর, ২০০৮ যখন বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা গড়ার’ দৃঢ় অঙ্গীকারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনি ইশতেহারে ‘ভিশন টোয়েন্টি টোয়েন্টি ওয়ান’ বা ‘রূপকল্প ২০২১’ ঘোষণা করে। সেই নির্বাচনি অঙ্গীকারে বলা হয়, ‘২০২১ সালে স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে’ পরিণত হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যখন ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর ইশতেহার ঘোষণা করে, তখন অনেকেই বিষয়টি নিয়ে উপহাস করে বলেছে, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ একটি আষাঢ়ে গল্প। তথাকথিত কিছু বুদ্ধিজীবী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ বেশ কিছু সংস্থা এবং গণমাধ্যমও এই রূপকল্পের সমালোচনা করে বলেছিল, ‘আওয়ামী লীগ দিবাস্বপ্ন দেখছে এবং দেখাচ্ছে’। কিন্তু তাদের সবার যুক্তি ও ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে বিশ্ব মানচিত্রে তথ্য প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ আজ বিপ্লব রচনা করেছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের সময় ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের সদস্য হয়। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন তিনি বেতবুনিয়ায় ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রোপিত বীজ থেকে যে চারাগাছটির জন্ম, তারই বিকাশ দেখি ১৯৯৬ সালে। জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে জাতির পিতার স্বপ্নকেই বাস্তবায়ন করেন।

১৯৯৮-৯৯ সালের বাজেটে তিনি কম্পিউটারের ওপর থেকে শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করেন। ১৯৯৭ সালে মোবাইল ফোনের মনোপলি মার্কেট ভেঙে দেন। অনলাইন ইন্টারনেটকে সচল করেন এবং দেশে বছরে ১০ হাজার প্রোগ্রামার তৈরির নির্দেশনা প্রদান করেন। ১৯৯৭ সালে তিনি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৫৭তম দেশ, যাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট রয়েছে। ২০১৮ সালের ১২ মে উপগ্রহটি মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়।

আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে বসবাস করছি। আমাদের জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মাত্র ১০ বছরের মধ্যে সবকিছুতেই প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। প্রত্যেকের হাতে এখন অ্যানড্রয়েড মোবাইল ফোনসেট। মানুষের চিন্তাভাবনা ও চাহিদার ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে ডিজিটাল কমিউনিকেশন। ব্যবসায়-বাণিজ্য থেকে শুরু করে চাকরি, পড়াশোনা হচ্ছে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। করোনা মহামারিতে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা অনলাইন মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে।

২০০৯ সালের আগে বাংলাদেশে সরকারি কোনো সেবাই ডিজিটাল পদ্ধতিতে ছিল না। কিন্তু বর্তমানে সরকারি সব দপ্তরের টেন্ডার থেকে শুরু করে প্রাথমিক সব তথ্য মিলছে ওয়েবসাইটে। সেই সঙ্গে সরকারি সব তথ্য যাচাই-বাছাই এবং সংরক্ষণ করা এবং এসব তথ্য গ্রহণ ও আবেদনের যাবতীয় কার্যক্রম থাকছে অনলাইনে। বিগত বছর প্রথমবারের মতো মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক থেকে শুরু করে দেশের বিচারিক কার্যক্রম এবং গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও আলোচনা সবকিছুই হয়েছে অনলাইনে। পাসপোর্ট সেবা, ভোটার আইডি কার্ড বিষয়ক সেবা থেকে শুরু করে লকডাউনে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পুলিশের অনুমতি পাশটির জন্যও এখন আবেদন করা যাচ্ছে অনলাইনে। দেশে সরকারি কার্যক্রমের ৬০ ভাগেরও বেশি সম্পন্ন হচ্ছে অনলাইনে।

ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষ এখন ঘরে বসে আয় করছে। ‘ডিজিটাল ইকোনমি রিপোর্ট’-২০১৯-এর তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ ফ্রিল্যান্সার কাজ করছেন। ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে এরা প্রতি বছর ১০ কোটি ডলারেরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। পৃথিবীতে যেসব দেশ ফ্রিল্যান্সিং কাজ করে, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে প্রথম দিকে। বাণিজ্যবিষয়ক পত্রিকা ‘ফোর্বস’-এর জরিপে ফ্রিল্যান্সিং থেকে আয়ের দিক থেকে এগিয়ে থাকা শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। ফ্রিল্যান্সিং থেকে আসা এই অর্থ আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করছে। পাশাপাশি বিদেশে আমাদের ফ্রিল্যান্সারদের অনলাইন সুনাম ও দক্ষতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের দোরগোড়ায় দ্রুত, স্বচ্ছতার সঙ্গে, হয়রানিমুক্ত ও স্বল্পমূল্যে সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য এক আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। সরকারের একসেস টু ইরফরমেশন প্রজেক্টের মাধ্যমে তথা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল সমাজ বিনির্মাণের মাধ্যমে জনগণ ঘরে বসেই এখন সেবা পাচ্ছেন।

উল্লেখ্য, জাতীয় তথ্য বাতায়নে এটুআইয়ের মাধ্যমে ৩৩ হাজার পোর্টাল সংযুক্ত করা হয়েছে, যেখানে ৫১ হাজার সরকারি অফিস সংযুক্ত আছে। ই-নথি, জাতীয় তথ্য বাতায়ন, ৩৩৩ জাতীয় হেল্পলাইন, ডিজিটাল সেন্টার, ই-নামজারি, ডিজিটাল সার্ভিস ডিজাইন ল্যাব, মাইগভ প্ল্যাটফরম, উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটর, বিচার বিভাগীয় তথ্য বাতায়ন, ই-মোবাইল কোর্ট, এসডিজি ট্র্যাকার, এজেন্ট ব্যাংকিং, জিটুপি সিস্টেম, ই-চালান, কিশোর বাতায়ন, শিক্ষক বাতায়ন, মুক্তপাঠ, আই-ল্যাব বা ইনোভেশন ল্যাব, ভার্চুয়াল কোর্ট সিস্টেম, ই-লার্নিং, ডিজিটাল ক্লাসরুম, ভার্চুয়াল ক্লাস’ প্ল্যাটফরম—এরকম বিভাগ খুলে সরকার জনগণের জীবনমান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

করোনার মহামারিতে গোটা পৃথিবীর অর্থনীতি আজ বিপর্যস্ত। এই মহামারি সামলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। গত ১০ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর জন্যই এই মহামারি পরিস্থিতি আমরা ভালোভাবে সামলে যাচ্ছি। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল সমাজ তৈরির ফলেই আমরা ঘরে বসেই অনলাইনে সব ধরনের সেবা পাচ্ছি। দেশের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাব্যবস্থা থেকে শুরু করে শিক্ষা, অফিস-আদালত, ব্যাংক, সামাজিক-উৎসব, কনফারেন্স, অনলাইনে করার পাশাপাশি আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটাও অনলাইনে করতে পারছি।

এখন দেশের ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা ও জেলায় ৫ হাজার ২৭৫টি ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে জনগণকে সেবা দেওয়া হয়। প্রতারণা ও সহিংসতার শিকার হলে জরুরি প্রয়োজনে ৯৯৯ নম্বরে কল করে পুলিশের সেবা পাচ্ছি আমরা। অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ব্যাপক গুরুত্ব বহন করছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার নিঃসন্দেহে অবদান রেখেছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। কোরবানিকে সামনে রেখে অনলাইনে পশু বেচাকেনা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। যার মাধ্যমে জনসমাবেশ কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। করোনা-সংকট মোকাবিলায় সুরক্ষা অ্যাপের মাধ্যমে টিকা-গ্রহীতাদের রেজিস্ট্রেশন, ফুড ফর নেশন, কল ফর নেশন, করোনা ট্রেসিং অ্যাপসহ নানাবিধ ডিজিটাল সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে সরকার।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার আধুনিক রূপই হচ্ছে আজকের আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ। ‘ভিশন-২০২১’-এর দার্শনিক প্রত্যয়ে একটি সুখী, সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন পূরণের জন্য তার সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার ও তার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের বেতবুনিয়ায় ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনের মধ্য দিয়ে যে পথচলা শুরু, বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তার সুযোগ্য উত্তরাধিকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর একটা আধুনিক রাষ্ট্র তৈরির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

আমাদের পরম সৌভাগ্য, শেখ হাসিনার মতো সৎ, নির্ভীক, দরদি ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মহৎ মানুষকে আমরা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কর্মের সুযোগে আমি তার প্রজ্ঞা ও মননকে দেখেছি; দেখেছি তার ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বলতা। পিতার আদর্শ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই তার রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি ও দর্শন। এই চেতনা ও আদর্শকে প্রতিষ্ঠায় জীবনের শেষ প্রহর পর্যন্ত কাজ করে যাবেন—এই তার প্রত্যয়। একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক দৃষ্টি ও দার্শনিকতায় দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার পূরণের সঙ্গে সঙ্গে আগামী প্রজন্মের জন্য উন্নত সমাজ স্থাপন করে যাচ্ছেন। শেখ হাসিনার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ সেই উন্নততর সমাজের দীপ্তি ও দর্শন।

লেখক : সাবেক সিনিয়র সচিব