বাজেট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কার কী প্রতিক্রিয়া?

প্রকাশিত: ৯:৩৮ পূর্বাহ্ণ , জুন ১২, ২০২০

নতুন অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট করোনার ফলে সৃষ্ট ‘সংকটকে সম্ভাবনায় রূপদানের বাস্তবসম্মত দলিল’ বলেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। এর বিপরীতে অবস্থান নিয়ে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি, জাসদ, সিপিবিসহ নানা রাজনৈতিক দল বাজেট প্রস্তাবে জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি বলে জানিয়েছে।

মহামারি করোনাভাইরাসের মধ্যে বৃহস্পতিবার বিকেলে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য বাজেট প্রস্তাব পেশ করেন যার আকার ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা।

নতুন এই বাজেট নিয়ে বিভিন্ন দিক নিয়ে সমালোচনা করেছে বিএনপি, সিপিবি এবং জাসদের মতো রাজনৈতিক দলগুলো।

তবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবারের বাজেটকে ‘সম্ভাবনাময়’ বলে উল্লেখ করেছেন।

বাজেট পরবর্তী এক প্রতিক্রিয়ায় ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট- করোনা মহামারির ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটিয়ে উঠে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করবে। এবারের বাজেটকে করোনার বিদ্যমান সংকটকে সম্ভাবনায় রূপদানের বাস্তবসম্মত প্রত্যাশার দলিল বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

তিনি বলেন, চলতি বাজেট জনগণ ও ব্যবসায়ীদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে অর্থনৈতিক উত্তরণের সূচনা করবে।

বাজেট গতানুগতিক ও অন্তঃসারশূন্য: বিএনপি নেতা মঈন খান 

নতুন অর্থবছরের বাজেটকে ‘গতানুগতিক ও অন্তঃসারশূন্য’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী ড. মঈন খান।

বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের কাছে তিনি এমন মন্তব্য করেন।

এসময় তিনি বলেন, “দেশে করোনা মহামারির মধ্যে আমরা সরকারের কাছে একটি বিশেষ বাজেট প্রত্যাশা করেছিলাম। কিন্তু আজ জাতীয় সংসদে পেশ করা পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট, সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এটি একেবারেই গতানুগতিক। বাজেটে বিশেষ কিছু নেই। সারবস্তুও খুঁজে পাওয়া মুশকিল। বাজেটে ভালো ভালো কথা বলা হয়েছে। এটি আসলে কথামালারই ফুলঝুড়ি।”

এসময় তিনি আরও বলেন, “সংকটের মাঝেও গতবছরের চেয়ে বাজেটের আকার বড় করা হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এমনটা করা অযৌক্তিক। জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ ঘাটতি ধরা হয়েছে। সামগ্রিক ভাবেই এ বাজেট বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।”

জনগণের জীবন-জীবিকা উপেক্ষিত হয়েছে: আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী
বিএনপির আরেক নেতা ও স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন অর্থবছরের এই বাজেটে ‘জনগণের জীবন-জীবিকা উপেক্ষিত হয়েছে’ বলে মন্তব্য করেছেন।

করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাজেটে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটেনি বলে তার অভিমত।

বিএনপি’র এ নেতা বলেন, “বাজেটে মেগা প্রজেক্টগুলোয় বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি এই দুর্যোগের মুহূর্তে প্রশ্নবিদ্ধ এক সিদ্ধান্ত। এসব বরাদ্দ পরবর্তীতে দেওয়া যেত। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাজেটে এসব নিয়ে আসার কোনো প্রয়োজনীয়তা ছিল না। অথচ দেশের স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তাখাতে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা ছিল। সেগুলো বঞ্চিত হয়ে মেগা প্রজেক্টে অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমে দুর্নীতির ধারা অব্যাহত রাখা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “একইভাবে বাজেটে যে কালোটাকাকে শুধু সাদা করা নয়, যে প্রক্রিয়ায় সাদা করার কথা বলা হচ্ছে সেটাও দুর্নীতিতে অব্যাহতভাবে থাকার একটা প্রয়াস আমরা দেখতে পাচ্ছি।”

অতিধনীদের কাছ থেকে ৫ লাখ কোটি টাকা আদায়ের দাবি জাসদের

প্রস্তাবিত বাজেটে অতি ধনীদের কাছ থেকে পাঁচ লাখ কোটি টাকা কর আদায়ের দাবি করেছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ।

বাজেটে কর্পোরেট ট্যাক্স কমানো ও কালো টাকা সাদা করার প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ সভাপতি হাসানুল ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার।

প্রস্তাবিত বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় তারা বলেছেন, ”বাংলাদেশ ‘সুপার রিচ’ বা অতিধনীদের দেশে পরিণত হয়েছে। দেশে পাঁচ লাখ ব্যক্তি আছে, যারা এক কোটি টাকা ব্যক্তিগত আয়কর দিতে পারেন কিন্তু দেন না। এই পাঁচ লাখ ‘সুপার রিচ’ বা অতিধনীদের তালিকা করে তাদের কাছ থেকে পাঁচ লাখ কোটি টাকা ট্যাক্স আদায়ের কঠিন পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলে বাজেট বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ঋণের ওপরে নির্ভরশীলতা কমে যাবে।”

আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পাঠানো বাজেট প্রতিক্রিয়ায় হাসানুল হক ইনু ও শিরীন আখতার এসব দাবি জানান।

জাসদের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দলটির দুই শীর্ষ নেতা বলেন, “সবাই আশা করেছিল, বৈশ্বিক মহামারি ও জাতীয় বিপর্যয়ের মধ্যে এবারের বাজেট গতানুগতিকতার বাইরে নতুন দিক উন্মোচনকারী বাজেট হবে। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ও সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ধারাবাহিক প্রচেষ্টার শুরু এবারের বাজেট থেকেই হওয়া উচিত ছিল। বাজেটে স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, খাদ্য, শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ কিছু বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা খুবই সামান্য।”

তারা আরও বলেন, “স্বাস্থ্যসেবা খাত ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে যতটুকু বরাদ্দ বেড়েছে, সেটাও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কীভাবে ব্যয় হবে তা পরিষ্কার নয়। নতুন করে যারা কর্মহীন ও আয়হীন হয়েছে বা হবে, তারা কীভাবে সামাজিক সুরক্ষা খাতে অন্তর্ভুক্ত হবেন— সেটাও পরিষ্কার না। শহর থেকে দুই কোটি মানুষ গ্রামে ফিরে যাবার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তাদের কর্মসংস্থানসহ গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য পল্লি উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর বদলে কমানো হয়েছে। তাই এককথায় বলা যায়, বাজেট প্রস্তাব গতানুগতিকতার গণ্ডিতে আটকে আছে।”

প্রস্তাবিত বাজেট মানুষের স্বার্থবিরোধী: সিপিবি

অন্যদিকে প্রস্তাবিত বাজেটকে মানুষের ‘স্বার্থবিরোধী’ বলে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি- সিপিবি।

বাজেট প্রস্তাবে মানুষের জীবন বাঁচাতে জনস্বাস্থ্য খাতের প্রাধান্য না পাওয়ার ‘জনগণের আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষিত’ হয়েছে বলে মনে করছে দলটি।

সিপিবি বলেছে, প্রস্তাবিত বাজেটের ৯৯ শতাংশই মানুষের স্বার্থবিরোধী, গতানুগতিক ও আমলাতান্ত্রিক।

বাজেট প্রস্তাব নিয়ে বৃহস্পতিবার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় এমন মন্তব্য করেছেন সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহ আলম।

‘এই বাজেটে ১ শতাংশ লুটেরা ধনীকদের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়েছে’ উল্লেখ করে একে ‘গণবিরোধী দলিল’ আখ্যায়িত করে তা প্রত্যাখান করেন তারা।## টিবিএস রিপোর্ট