হেফাজতের উত্থান ও পৃষ্ঠপুষোকতায় সরকারের ভূমিকা

প্রকাশিত: ৭:৫৯ অপরাহ্ণ , এপ্রিল ২১, ২০২১

কামাল পারভেজ : একটা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে আল্লামা মোহাম্মদ শফি”র নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম নামক সংগঠনে যাত্রা শুরু করে। প্রথম থেকে তারা অরাজনৈতিক সংগঠন বলে দাবী করলেও অন্ধকার থেকে কড়া নেড়ে হাটহাজারী থেকে মতিঝিল শাপলা চত্বরে গিয়ে উঠে। ২০১৩ সালের ৫ মে আওয়ামীলীগ সরকারকে উৎখাত করতে লাখো হেফাজত কর্মী জমায়েত হতে থাকে।সারাদিন ব্যপি মতিঝিলে স্লোগানে স্লোগানে কান ভারী হতে থাকে। সরকারের কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আইন ভঙ্গ করে মতিঝিল এলাকায় মিছিল মিটিং করার দূর সাহস যোগাতে পেরেছিলো। সরকার সুকৌশলে সারা দেশে গণপরিবহন বন্ধ করে দিলেও রুখতে পারেনি হেফাজতে ইসলাম কর্মীদের। দিন শেষে অন্ধকার গনিয়ে আসতেই ঘটনা টার্নিং পয়েন্ট হতে শুরু করে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী পাল্টা আক্রমণ করতে শুরু করলে হেফাজত কর্মীরা হতভম্ব হয়ে পরে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে জীবন বাঁচার তাগিদে মতিঝিল ছাড়তে বাধ্য হয়। সেদিনের ঘটনায় কতজনের প্রাণহানি ঘটলো কতজন হেফাজত কর্মী কতজন নিরীহ জনসাধারণ মারা গেলো তা আজও সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। সরকারও কোনো বিবৃতি দিতে পারেনি তেমনি হেফাজতে ইসলামের দাবি দুই থেকে আড়াই হাজার সমাগমে থাকা লোক মারা যায়।মৃত্যু হওয়া সংখ্যা সঠিক পরিসংখ্যানে নেই তেমনি সাধারণ জনগণও কোনটা সঠিক তা বুঝে উঠতে পারছেনা। মানবাধিকার সংগঠন “অধিকার” এর দেওয়া বিবৃতিতে সরকার প্রত্যাখান করে উল্টো মামলা দিয়ে “অধিকার” সংগঠনের নির্বাহী প্রধান ব্যারিস্টার আদিলুর রহমানকে জেলে পাঠায়।এদিকে হেফাজতের সাথে চা-চক্রে প্রথম দিকে বিএনপির কয়েক নেতার পদচারণা করে হাটহাজারী মাদ্রাসাতে,আল্লামা মোহাম্মদ শফি হুজুরের দোয়া নিতে নাকি এই স্বাক্ষাৎ। হেফাজতে ইসলাম পরবর্তী আন্দোলন চাঙ্গা করতে নতুন পরিকল্পনার দিকে এগুতে গেলেই সুকৌশলে সরকারও হাত বাড়িয়ে দিয়ে আওয়ামীলীগ সরকারের কয়েক নেতা – মন্ত্রী আগমন ঘটে আল্লামা শফির দরবারে। সরকারও আল্লামা শফির ভাগিনা খ্যাত তথ্য মন্ত্রী ড.হাসান মাহমুদকে দিয়ে সম্পর্কটা দৈ – মিষ্টির মতো করে নেয়।যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও বক্তব্যে বলেন কওমী মাদ্রাসায় লেখা পড়া হয়,কওমী মাদ্রাসার ছাত্ররাই সহি সুদ্ধ ভাবে কোরআন পড়ে। এক কথায় বুঝিয়ে দিলেন আলিয়া মাদ্রাসা, খারিজী মাদ্রাসা, ও সুন্নি নামক মাদ্রাসা গুলোর পড়ালেখার মানসম্মত নয়। হেফাজতে ইসলাম সুকৌশলেই সরকারের সাথে সু-সম্পর্ক রেখে “দাওরায়ে হাদিস” কে মাস্টার্স সমমনা সরকারি ভাবে স্বীকৃতি আদায় করে নেয়। সরকারি চাকুরীতে সুযোগ পাবেন সমানভাবে। হেফাজতে ইসলাম সরকারকে দেওয়া ১৪ দফার দাবীর প্রথম পর্যায়ের মূল উদ্দেশ্য গুলো সফল করে নেয়। এদিকে আওয়ামীলীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর পরই কিছু মাওলানারা (সুন্নী হালে আল জামাত) ওলামালীগ গঠন করে সরকারের গুনকীর্তন গাইতে লাগলো,অবশ্য তাদেরও একটা লক্ষ উদ্দেশ্য ছিলো, কিন্তু তা হেফাজতে ইসলাম গোলপাক খায়ে দিয়ে তাদের স্বার্থ আদায় করে নিলো গুমরা মুখে ওলামালীগ পিছু হাটলেন। এখন আর আগের মতো ওলামালীগের কীর্তন শুনা যায়না। হারিয়ে গেলো ওলামালীগ, আপন হলো হেফাজতে ইসলাম। ঠিক একই মঞ্চে দেখা যায় আল্লামা শফি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে।আল্লামা শফি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কওমীর মাতা বলে উপাধিও দেন। এদিকে অন্ধকার থেকে প্রথমে যারা কড়া নাড়ছিলো তাদের পরিকল্পনা ধূলিসাৎ হয়ে পড়লো। একরকম হেফাজতে ইসলাম সরকারের ভোগলে চলে গেলেন, হাতছানি দিয়ে ডাকা পৃষ্ঠপুষোকতায় আপনজন হয়ে উঠলো সরকারের। হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন চলমান মাঝ পথেই ধীরগতিতে চলতে শুরু করলো। সরকারও চাইছিলো হেফাজতে ইসলামকে হাতে রেখে বিএনপি – জামাতকে কোনঠাসা করে রাখবে। কিন্তু সাধারণ জনগণও যা বুঝার তাই বুঝতে পারলো। অন্ধকারে কড়া নাড়ার কুশলীরা রূপরেখা বদলাতে ভিন্ন পন্থায় এগুতে লাগলো।আল্লামা মোহাম্মদ শফির মৃত্যুর পর কে হবে হেফাজতের প্রধান তা নিয়ে দফায় দফায় বৈঠকের সমাধান সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক না হওয়ায় মেনে নিতে পারননি আল্লামা শফির পুত্র মাওলানা মোহাম্মদ আনাস মাদানিকে। নিয়মানুসারে শফি হুজুরের পর আল্লামা মোহাম্মদ জুনায়েদ বাবুনগরী সংগঠনের প্রধান হবেন। হেফাজতে ইসলামের সংখ্যাঘরিষ্টতায় নেতা – কর্মী বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি, জুনায়েদ বাবুনগরীকে প্রধান করার পক্ষে আলোচনায় আসলেই শফি হুজুরের পুত্র আনাস মাদানি সুকৌশলে দ্বিতীয় গ্রুপ তৈরী করেন।আনাস মাদানি চেয়েছিলো পিতার পর কর্তৃত্ব তাঁর হাতেই নিবেন এবং সরকারের সাথে পৃষ্ঠপুষোকতার সম্পর্কটা রেখে ফয়দা লুটবেন। এখানে ব্যার্থ হয়ে শফি হুজুরের মৃত্যুকে হাতিয়ার বানিয়ে একরকম পৃষ্ঠপুষোকতাদের পরামর্শে জুনায়েদ বাবুনগরীর গ্রুপের বিরুদ্ধে মামলার জালে ফেলান। যা ইতিমধ্যে পিবিআই বাবুনগরীসহ তেতাল্লিশজনকে দায়ী করে আদালতে রিপোর্ট দাখিল করেন। হেফাজতে ইসলাম ঐক্যর পয়েন্ট থেকে স্বরে দাঁড়ালেন শুরু হলো রশি টানাটানি। আগেই বেলছি অন্ধকারে থাকা কুশলীরা রঙ বদলায়ে ঢিল ছুড়ে দিলো মোদি বিরোধী আন্দোলনের দিকে,যুক্ত করে দেওয়া হলো চরমোনাই পীর “ইসলামী আন্দোলন”সংগঠনকে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি বিরোধী আন্দোলনকে চাঙ্গা করতেই সরকারও বুঝে গেলো হেফাজতে ইসলাম পুরোদমে হাত থেকে খসে যাচ্ছে, এবার সরকারকে কৌশল পাল্টাতে হবে লক্ষ রেখে শক্ত হাতে দমন-পীড়ন করতে হবে। ব্যস সরকারও রনকৌশল পাল্টালো। মতিঝিলের ঘটে যাওয়া সরকারের ধামাচাপা দেওয়া পুরনো মামলাগুলো একটু ঘষামাজা করতে শুরু করলো। এরই মধ্যে মুফতি মামুনুল হকের নারী কেলেঙ্কারির ঘটনায় সুযোগ বুঝে জাল ফেলো দিলো হেফাজতে ইসলাম বাবুনগরীর গ্রুপের উপর। একদিকে করোনাভাইরাস প্রভাব বিস্তারকে পুঁজি করে সরকার লকডাউনের ঘোষণা করে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন নস্যাৎ করে দিলো। রমজান মাসেই শুরু হলো হেফাজতের নেতা – কর্মীদের ধরপাকড়, আবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বাসায় স্বাক্ষাৎ বাহিরে থাকা হেফাজতের নেতাদের সাথে , এ যেনো হাস্যকার বিষয়। ঐদিকে সোনারগাঁও থানা এলাকায় মামুনুল হকের ঘটনায় ওসি রফিকুল ইসলামকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে দিলেন সরকার। আরেক এ এস আই গোলাম রাব্বানী ফেসবুক লাইভে এসে কথা বলায় তাকেও সাসপেন্ড করলো। কিন্তু বড় কর্তা ঢাকা উত্তরের উপ- পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোঃ হারুন বহাল তবিয়তে আছেন। প্রশ্ন হলো ওসি রফিকুল ইসলামকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া এবং একজন এ এস আই গোলাম রাব্বানীকে সাসপেন্ড করা হয় তাহলে সম-অপরাধী হবেন ডিসি হারুন সাহেবও। ২০২০ সালে ধানমন্ডি এলাকায় হেফাজতের এক মাহফিলে মামুনুল হকের সাথে একই মঞ্চে বক্তৃতা রাখেন, সেখানে হেফাজতে ইসলামের গুনকীর্তন গাইতে থাকেন। তখন কি মামুনুল হক ২০১৩ সালের ৫ মে’র ঘটনার আসামী ছিলেন না? তাহলে আসামীর সাথে একই মঞ্চে কিভাবে বক্তৃতা রাখলেন? এটা এখন সাধারণ জনগণে প্রশ্ন। হেফাজতে ইসলামের নেতারা, ওসি এবং এ এস আই এরা সবাই অপরাধী হলে বড় অপরাধী হবেন ডিসি হারুন। এখানে আরও প্রশ্ন থেকে যায় ৫ মে’র ঘটনায় হেফাজতে ইসলামের যাঁরা আসামী ছিলেন এতোদিন কেনো তাদের গ্রেফতার করা হয়নি,পুলিশের খাতায় নাকি আসামী খুঁজে পাচ্ছেনা, অথচ পুলিশের বড় বড় কর্মকর্তা সরকারের নেতা- মন্ত্রীরা দিনের পর একই মঞ্চে বক্তৃতা ও খাওয়া ধাওয়া করেছেন তখন কি তারা চোখ বেঁধে এসেছিলেন নাকি কালো চশমা দিয়ে আসামীদের সাথে আত্মীয়তা করেছিলেন। এতোদিন পর বুঝতে পারলাম ঘরের বউ ভালো না…….। লেখক — চট্টগ্রাম ব্যুরো চীফ আমাদের নতুন সময়