মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী

মুক্তিযুদ্ধ, সপক্ষের শক্তি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে

প্রকাশিত: ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ , মার্চ ১২, ২০২১
মইনুদ্দীন কাদেরী শওকত
মুক্তিযুদ্ধ ও সপক্ষের শক্তি নিয়ে কিছু বলার আগেই উপমহাদেশের মুক্তি সংগ্রামের একটি সংক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপট ও মুক্তিকামীদের নাম স্মরণ করতে চাই। ১৭৫৭ সালে রায়দুর্লভ, জগৎশেঠ, উমি চাঁদ প্রমুখের চক্রান্তে এদেশের স্বাধীনতা বৃটিশদের পদানত হবার পর থেকেই মুক্তি সংগ্রাম শুরু হয়। প্রথমে ভারতবর্ষেই স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে ব্রতী হন মীর কাসিম। এরপর হায়দার আলী এবং তদীয়পুত্র ফতেহ্ আলী টিপু ওরফে টিপু সুলতান বৃটিশদের গোলামীর জিঞ্জির ভেঙে আজাদীর জন্যে মুক্তিযুদ্ধ করা অবস্থায় ১৭৯২ সালে শাহদাৎ বরণ করেন।
পরবর্তী পর্যায়ে শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ, তদীয়পুত্র শাহ্ আবদুল আজিজ, হাজী শরিয় উল্লাহ, তদীয়পুত্র মুহাম্মদ মহসিন ওরফে দুদু মিয়া, সৈয়দ আহমদ বেরলভী, সৈয়দ নিসার আলী ওরফে শহীদ তিতুমীর, উপজাতীয় আফগান সর্দার আকবর শাহ্, বেরেলীর বখ্ত খান, কানপুরের আজীম উল্লা খান, অযোধ্যার মহিয়সী নারী বেগম হযরত মহল, বীর সৈনিক আহমদ উল্লাহ, দেওবন্দ মাদ্রাসার শিক্ষক ছাত্রবৃন্দ, বদরুদ্দিন তায়াবজী, মওলবী লিয়াকত হোসেন, আবদুর রসুল, আবদুল হালিম গজনবী, শেখ উল হিন্দ মাহমুদ-উল-হাসান, মৌলবী বরকতুল্লাহ, ওবায়দুল্লাহ সিন্ধী, রহমত আলী জাকারিয়া, শেরে বাংলা এ.কে.ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দ্দী, মওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা মোহাম্মদ আলী, মাওলানা শওকত আলী, মাওলানা আকরাম খা, ডাঃ সাইফুদ্দিন বিচলু, ডাঃ মুখতার আহমদ আনসারী, হযরত মোহানী, হোসেন আহমদ মাদানী, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান প্রমুখ বিভিন্ন সময়ে মুক্তির জন্যে, মুক্তিকামী জনগণের সংগ্রাম করেছেন। তাঁদের সকলের আত্মার প্রতি সম্মান জানিয়ে বলতে চাই, যারা স্বাধীনতার জন্যে, আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভ করার জন্যে সংগ্রাম করে তাঁরাই স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি। বৃটিশ ভারতে বাংলা ও আসাম ছিল মুসলিম প্রধান অঞ্চল এবং এই অঞ্চল দু’টি হতেই প্রথমে মুক্তি সংগ্রামের সূচনা হয়। বাংলার মুসলমান বৈদেশিক শাসকদের প্রতি কখনো সদয় ছিলনা ক্রুব্ধ আক্রোশে তাঁরা ফুঁসছিলো। তাই, সবকিছু কেড়ে নিয়েও অতৃপ্ত বৃটিশ তাঁদেরকে বঞ্চনা ও অমর্যাদার অতলে তলিয়ে দিতে উদ্যত হয়েছিল। কিন্তু, মুক্তিকামী মুসলমানরা নীরব থাকেনি তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।
উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বাংলার মুসলমানরা বৃটিশ-শাসনের বিরুদ্ধে ইস্পাত কঠিন ঐক্য নিয়ে রুখে দাঁড়ায়। তারা তাদের সুপ্ত অসন্তোষ তিনটি আন্দোলনের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। এ আন্দোলনগুলো হচ্ছে ফারায়েজী আন্দোলন (১৮১০-১৮৩১), নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-১৮৬০) এবং পাবনা রাজস্ব বিদ্রোহ (১৮৭৩)। এই সব আন্দোলনের মধ্যে ফারায়াজী আন্দোলনটি প্রকৃতিগতভাবে ছিল আর্থ-সামাজিক ও ধর্মীয় চেতনায় সমুজ্জল। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল মুসলমান কৃষক ও গরীব ভূমি মালিকদেরকে সামন্ত জমিদারদের অত্যাচার ও শোষণ থেকে রক্ষা করা। সাথে সাথে সাধারণ মুসলমানদের সামাজিক ন্যায় বিচারও নিশ্চিত করা। মূলতঃ ফারায়াজী আন্দোলনই এই অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধকে প্রথমে অনুপ্রাণিত করে।
১৯৭১ সালে আমরা যে মুক্তিযুদ্ধ করেছি তার লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র ও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা। এই লক্ষ্যে যাঁরা বিশ্বাস করেন তাঁরাই ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি।
আজ যারা গণতন্ত্রের নামে সন্ত্রাস, ধর্মের নামে ভাওতাবাজি ও সমাজতন্ত্রের নামে পুঁজিপতি-চোরাকারবারীদের লেজুর বৃত্তি করছে তারা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি নয়। এদের সম্পর্কে সতর্ক থেকেই আমাদের এগুতে হবে। কিভাবে এগিয়ে যাওয়া যায় এব্যাপারে সকলকে নিঃস্বার্থভাবে ঐক্যমতে পৌঁছতে হবে।
সকলকে মহান স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।
১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং সতীর্থ মুক্তিযোদ্ধা যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁদের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।
অবশেষে দুঃখের সাথে বলতে হয় মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ব্যবহার করে একটি মহল ফায়দা লুটলেও প্রকৃতি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান কেউ দেখায় না। বিগত চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে সভাপতি পদে এডভোকেট আবু মোহাম্মদ হাশেম নির্বাচিত হতে পারেননি। অথচ তিনি মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে কয়েকবার নির্বাচন করেও মুক্তিযোদ্ধা মনজুরুল আলম মনজু নির্বাচিত হতে পারেননি। এ রকম বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনে প্রকৃতি মুক্তিযোদ্ধাদের নির্বাচিত করা হয় না, সম্মান জানানো হয় না। এর কারণ দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বোধগম্য নয়।