কৃষি ও কৃষকের সঙ্গেই থাকতে হবে

প্রকাশিত: ৩:৪৫ অপরাহ্ণ , জুন ৯, ২০২০

মেটালে আমরা কাজ করছি মাঠে আমাদের সাহসী, পরিশ্রমী কৃষক ভাইদের সাথে। এই করোনাকালে আমরা কেন কাজ করছি, মেটাল কেন সকল ব্যবসায়িক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সে সম্পর্কে আমার প্রিয় সহকর্মীদের সঙ্গে কিছু কথা শেয়ার করার অভিপ্রায়ে এই লেখা।

এখন যে করোনা হায়েনা আমাদের এবং বিশ্বের সকল দেশে হানা দিয়ে মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করে ফেলছে তা কখন যাবে সে সম্পর্কে একটি বৈজ্ঞানিক বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তে পাওয়া গেছে। সেই সিদ্ধান্তটি হচ্ছে এমন- যখন কোন দেশে বা এলাকায় হার্ড ইমিউনিটি অর্জিত হবে তখন করোনার চেইন ভেঙ্গে যাবে এবং করোনা ক্রমান্বয়ে অপসারিত হবে। ইমিউনিটি মানে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা, তাহলে হার্ড ইমিউনিটি কি? না, এটা কোন ব্যক্তিগত রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা নয়-এটি হচ্ছে সামষ্টিক বা গোষ্টিভিত্তিক বা সামাজিক, সম্মিলিত রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা।

এটা অর্জিত হতে হবে সমাজ দেহের মধ্যে- কোন একক ব্যক্তি শুধু নয়। ইংরেজি বানানটি খেয়াল করলে আপনারা দেখবেন এটি HERD- HARD নয়, HARD মানে কঠিন কিন্তু HERD মানে গোষ্টি, পাল ইত্যাদি। তাহলে এই হার্ড ইমিউনিটি কখন অর্জিত হবে? – যখন সমাজের, দেশের, এলাকার সকলেই যদি সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে তাহলে ক্রমান্বয়ে এই ইমিউনিটি সমাজে আসতে থাকবে। এটাকে ন্যাচারল হার্ড ইমিউনিটি বলে। অথবা যখন ভ্যাক্সিন আবিস্কার হবে – সমাজ এবং দেশের সবাই যখন এই ভ্যাক্সিন নিয়ে ফেলবে তখন হবে সত্যিকারের হার্ড ইমিউনিটি অর্জন।

তাহলে আমরা এখন কী করতে পারি? আমরা যা করতে পারি তা হচ্ছে সকল স্বাস্থ্যবিধি কড়াকড়িভাবে পরিবারের, সমাজের, দেশের সবাইকে নিয়ে মেনে চলতে পারি। আর আমরা যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে কোন কাজ না করে বাড়িতে বসে থাকি, তাহলে অর্থনীতি চলবে কিভাবে? অর্থনীতির চাকা না ঘুরলে অর্থ কোথা হতে আসবে। অর্থ দরকার আমাদের থাকা, খাওয়া, স্বচ্ছলতার জন্য- চিকিৎসা, ইত্যাদির জন্য।

তাহলে আমাদের কী করার আছে? হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের জন্য আমাদের স্বাস্থ্যবিধি ও কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে এবং অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে কাজও করতে হবে। এই রকম অবস্থাকে এখন বলা হচ্ছে নিউ নরমাল (new normal)। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বর্তমান পরিস্থিতিকে এইভাবেই সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই নিউ নরমাল মানে হচ্ছে মানুষ ব্যক্তিগত এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা সমূহ নিশ্চিত করে সকল স্বাভাবিক কাজ কর্ম করে যাওয়া যাতে অর্থনৈতিক সচলতাকে অগ্রসরমান করা যায় এবং এটা সত্যি যে অন্যদিকে কিছু মানুষ ও এই পরিস্থিতির মধ্যেই মৃত্যুর কাছে হেরে যাবে।

এই নিউ নরমালের মধ্যে জীবনযাত্রা ও জীবিকা নিশ্চিত হবে এবং ক্রমান্বয়ে ন্যাচারাল হার্ড ইমিউনিটি ও অর্জিত হবে। এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ নিউ নরমালের দিকে যাচ্ছে। ন্যাচারাল হার্ড ইমিউনিটি অর্জিত হওয়ার পর কিংবা ভ্যাক্সিনেশনের পরই আমরা আবার নরমাল এরা (normal era) বা স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় ফিরে যেতে পারব। এখন আমাদের নিউ নরমালের জীবনযাত্রাকে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। যেসব দেশ এই নিউ নরমালের মধ্যে থেকে ন্যাচারাল হার্ড ইমিউনিটি দ্রুত অর্জন করতে পারবে তারাই অর্থনৈতিক স্থবিরতাকে পাশ কাটিয়ে মানুষের রোজগার নিশ্চিত করতে পারবে এবং অধিকাংশ মানুষের দারিদ্রতাকে ঠেকাতে পারবে।

আমাদের দেশেও এখন আমরা এই বিষয়গুলি পরিষ্কার করে না বুঝলে মানুষের অভাব এবং দারিদ্রের কষাঘাতকে আমরা ভালভাবে রুখতে পারব না। আবেগের চেয়ে ও আমাদের বেশি দরকার এরকম সংশ্লিষ্ট বিষয় ভাল করে বুঝে দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রাখতে সচেষ্ট হওয়া। নিউ নরমালে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন, চিকিৎসার সহজলভ্যতা এবং যথাসম্ভব সাধারণদের নাগালের মধ্যে আনার চেষ্টা অবশ্যই সরকারকে করতে হবে। সরকার করছেও, এ কাজের জন্য এবার বাজেটে বরাদ্দ ও আরো বাড়াতে হবে। তাছাড়া জন সচেতনতা তৈরি করা, ব্যক্তিগত ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে মানুষের ধারনাকে পরিস্কার করার ব্যাপার ও সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কাজের মধ্যেই থাকা উচিত। তাহলে নিউ নরমাল এরা বা সময়ে আমাদের বেশীরভাগ মানুষ কোভিড কিংবা কাজ ও খাদ্যের অভাবে হারিয়ে যাবে না।

এই পরিস্থিতিতে মেটালও তাই সকলকে, আমাদের সকল সহকর্মীকে এই উপদেশই দিচ্ছে যে প্রথমে নিজের বক্তিগত সুরক্ষার সকল ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, পরিবারের সকলের সুরক্ষা ও নিশ্চিত করতে হবে, অফিসে সকল সহকর্মীর সুরক্ষা দেখভাল করে- সকল স্বাস্থ্যবিধি মেনে সকলে মিলে অর্থনীতির চাকাকে ঘোরাতে হবে, কোম্পানীর ব্যবসায়িক সকল কাজকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে- তাহলে দেশের অর্থনীতি যেমন থেমে থাকবে না, আমাদের কোম্পানীর ব্যবসা ও সচল থাকবে। অর্থনীতির চাকা না ঘোরাতে পারলে অর্থের সংস্থান করা খুব কঠিন। আমরা দুই শত্রুকে একসঙ্গে মোকাবিলা করছি একটি করোনার হায়না, আরেকটি অস্বচ্ছলতার দুষ্টচক্র যাতে আমরা অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতাকে ও ঠেকাতে পারি।


আবু ফরহাদ

আশা করি, আমি সবাইকে বিষয়টি বুঝাতে চেষ্টা করেছি, হয়তো অনেকেই বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন। এ সময়ে কোন রকমের শারিরীক অসুবিধা বোধ করলে বাসায় বিশ্রামে চলে যাবেন, বিশ্রাম নিবেন- অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবেন। আপনাদের শারিরীক কোন রকমের সমস্যা হলে অবশ্যই জানাবেন- কোম্পানী আপনাদের সকলের ব্যাপরেই চিন্তা করে। এই সময়ে যে কোন শারিরীক সমস্যায় কোম্পানী আপনাদের সঙ্গে থাকবে- এ ব্যাপারে কোম্পানির মানবিক ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় বজায় থাকবে – করোনা হায়নাকে মোকাবিলা ও অর্থনীতির চাকা ঘোরানো দুটোই তো আমাদের করতে হবে। আমাদের কৃষি ও কৃষকের সঙ্গে থাকতেই হবে- কৃষি ব্যবস্থা সচল থাকলে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে। মেটাল কৃষির জন্য, দেশের জন্য।

বিশিষ্ট ব্যাংকার  ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

** লেখার মতামত লেখকের। নিউজ৭১অনলাইনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে।