ফেনীর ঠিকানা ট্রাভেলার্সের আয়োজনে নৌভ্রমণ

প্রকাশিত: ৩:৩৮ অপরাহ্ণ , ডিসেম্বর ৫, ২০২০

 

সাংবাদিক ও লেখক মার্ক টোয়েন বলেছেন আজ থেকে বিশ বছর পর আপনি এই ভেবে হতাশ হবেন যে,আপনার পক্ষে যা যা করা সম্ভব ছিল তা করতে পারেননি। তাই নিরাপদ আবাস ছেড়ে বেরিয়ে পড়ুন। আবিষ্কারের জন্য যাত্রা করুন, স্বপ্ন দেখুন আর শেষমেষ আবিষ্কার করুন।
ভ্রমণের মজাই আলাদা। যদি তা নৌবহরে হয় ! ভ্রমণে ভিন্নতা আনে, আনে নতুন আমেজ! কেউ যদি উপভোগ না করেন এখনো ; করে ফেলুন !
ভ্রমণ প্রিয় পৃথিবীর প্রায়ই মানুষ। এমন মানুষ পাবেন না ; যারা ভ্রমণ করতে চায় না। প্রতিটি মানুষ এক টুকরো প্রশান্তি খোঁজে। ভ্রমণ নিয়ে আসে সে প্রশান্তি!
বিশ্ববিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা বলেন “ ভ্রমণ প্রথমে তোমাকে নির্বাক করে দেবে,তারপর তোমাকে গল্প বলতে বাধ্য করবে।’’
আজকাল জীবনটা বোরিং বোরিং । ধুমধাম ব্যস্ততা। কর্পোরেট লাইফ জড়ো প্রতিষ্ঠানের মতোই।এই কর্পোরেট থেকে মুক্তি পেতে ,একঘেঁয়েমি ,আলস্য মুহুর্ত কাটিয়ে তুলতে পারে এক ধামাকা ভ্রমণ।
মানুষ অনেকভাবে ভ্রমণ করে। কেউ আকাশ পথে,কেউ রেলপথে,কেউ বাই রোডে,কেউ জলপথে। একেকটা ভ্রমণ, একেক রকম অনুভুতি জাগায়। ভ্রমণ তিনভাবে হতে পারে।কেউ এমনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে চলে। সেখানে ঘুরে দেখে। কেউ বিনোদন স্পটকে টার্গেট করে ছুটে চলে। সেখানে শান্তি খোঁজে। কেউরা জল পথে লঞ্চ, স্টিমার, নৌকা করে আনন্দ ঢালি উপচে নিয়ে আসে।
জাপানি এক প্রবাদ আছে- বাঁশের নল দিয়ে পুরো আকাশ দেখা যায় না।
বাংলাদেশে বেশিরভাগ ভ্রমণ পিকনিক আদলে হয়ে থাকে। যে যানবাহনেই যাক, গন্তব্যে নিজেরাই খাওয়া,আনন্দ, পূর্তির ব্যবস্থা করে। স্থানকে ভালবাসে ;উপভোগ করে। আবার অনেকে খাওয়ার আয়োজনের বাড়তি ঝামেলা এড়িয়ে ভ্রমণকে প্রধান অনুষঙ্গ করে।
ফেনী থেকে এবার কিছু উদ্যোমী তরুণ আয়োজন করে চিয়ার্স একটা মজাদার ভ্রমণের । শীতের শুরুতে ভ্রমণটার উদ্দেশ্য ছিল খুব পরিকল্পনা মাফিক। পরিপাটি আয়োজন। ইউনিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ! ঐতিহ্যকে নতুন মোড়কে ব্রান্ডিং করা। বহুল প্রচারিত কোরিওগ্রাফি ও ফিল্মকে উজ্জেবিত করা। ইতিহাসকে স্বরন করা।
তেমন একটা আয়োজন ঠিকানা ট্রাভেলসের আয়োজনে ২০ নভেম্বর ১২০ সারথীকে নিয়ে বিশাল নৌবহর। এইভাবে নৌবহর ফেনীতে প্রথম। এতো গুলো সারথীর অনুভবকে সাথী করে এরেঞ্জ করা চাট্টিখানি কথা না। নিজ শহরের মনকে টাচ করে ঢাকা চট্টগ্রাম হতে কবি লেখকদের উপস্থিত করা ছিল এই ট্রাভেলার্সদের অনবদ্য আন্তরিকতা।
মৃদু শীতের হিমেল হাওয়া নিয়ে লেমুয়া ব্রিজের ঘাট থেকে তিন নৌকা সিনবাদ, পঙ্খিরাজ ও টাইটানিক নামে নামকরণ এর দ্বাররক্ষক তিন নও-জোওয়ান আরিফ, ফিরোজী ও হেলালের কাঁথে ভর করে ১২০ জন ভ্রমণ উৎসুককে নিয়ে বেয়ে ওঠে হৃদয় উজাড় করা ঢেউয়ের তালে। গান কবিতায় প্রকৃতিও বিমুগ্ধ হয়।
কালিদাস পাহালিয়া ,ছোট ফেনী ও মুহুরী তিন নদীর বুকে পাখির উড়াল , জেলের নিবিষ্ট মনে জাল বিছানো। নীরব নদীর কিনার ঘেঁষে গাঁয়ের মানুষের অষ্পলক চোখের নজর ! ইট দালানের মানব তার মনকে প্রশস্ত করতে সুযোগ পেয়ে যায় নিমিষে। পড়ন্ত রোদ ! কাবু;আহা কী আনন্দ। তবু ঘাম ঝরে না। হেমন্তের শেষ। শীতের শুরু। দূরন্ত সারথীর আবেগে ঘাম দেখার কথাই নেই। নৌকায় বসে খাওয়া ,ঘুরা অনেকের জন্য ছিল প্রথম। অন্যরকম এক অনুভুতি। একশত অনুভুতির সাথে আকন্ঠ বিনিময়, নতুন ঠিকানায় আরো শক্ত বন্ধন।
নৌকায় হেলে দুলে বসে ঢেউয়ের তরঙ্গে যাত্রা ,কাঠের নৌকোয় প্লাষ্টিকের চেয়ারগুলো স্থান পায় ভ্রমণ সুখে আত্বহারা মানুষের সেবায়। কোন কমতি ছিল না। থাকে না কোন পিকনিক কিংবা ভ্রমণ আয়োজনে।
লিন ইউতাং বলেন- ‘‘ভ্রমণ শেষে নিজ বাড়িতে ফেরার আগ পর্যন্ত কেউ বুঝতে পারে না ভ্রমণ কত সুন্দর ছিল। ’’

ভ্রমণের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল সোনাগাজির মুহুরী প্রজেক্ট। সরকার যেখানে দেশের বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। নদী থেকে অবৈধ মাটির উত্তোলন ,বিদুৎ কেন্দ্র , লাইন স্থাপনে শ্রমিকদের শ্রম শেষে তাদের অস্থায়ী বাসস্থানে বসে ক্লান্তি ঝাড়া, দুপুরে তাদের সাদা ভাতে বুটের ডালে,একটু ভর্তা সহযোগে খাওয়া দৃষ্টি কাড়ে ভ্রমনরতদের। ওদের সাথে কথা বলে জানা গেল কোন ধরণের অনাকাঙ্খিত সমস্যায় তারা পড়ছে না। আনসার,পুলিশের নিরাপত্তা সারাক্ষণ। স্থানীয় বাসিন্দারা জানায় দিনে রাতে এখন সবাই নিশ্চিন্তে এখানে ঘুরতে আসতে পারে। ছিনতাই , রাহাজানি অনেক কমে গেছে।
সোনাগাজী উপজেলার এই আলোচিত স্থান নিয়ে অনেকের কৌতুহল! পর্যটন এরিয়া হিসেবে বর্তমানে প্রজেক্ট এর নান্দনিকতা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা দেয়াও ছিল আয়োজকদের প্রত্যাশা।
পুরো টিমকে ম্যানেজ ও পরিচালনা করেন মেনটর কবি ইকবাল চৈৗধুরী। প্রতিটা সারথীর অনুযোগ,তাদের সেফটি তিনি নিশ্চয়তায় রাখেন। কবিকে সম্মাননা প্রদান করে আয়োজনের মিডিয়া পার্টনার সময়ের গর্জন। তিনি সহ বাকি নাবিক হেলাল ,ফিরোজী ও আরিফের দিনরাত শ্রম দিয়ে আয়োজনটাকে উৎসবে পরিণত করে। খাওয়ার মেনু ছিল গ্রাম্য ছোঁয়া; লাড়কির আগুনে দোয়া ওঠা তৃপ্তির ঢেকুরে শামিয়ানা টাঙ্গিয়ে। মহিষের দৈ কাচের গ্লাসে বৈচিত্র্যতা নিয়ে আসে একগুচ্ছ শহরের আভস্ত মানুষের খুব কাছে। এই দৈ ঐখানকার বেশ জনপ্রিয়।


প্রকৃতি,নদী আর সেখানকার জেলেদের ধরা মাছ দেখে অনেকে কিনেও আনে। শিশুরা উৎফুল্ল থাকে সারাদিন। তারেক ইসলাম ঘোরাঘুরির ফাঁকে যাকে পায় কাছে সোনাগাজির ডাবের , পেঁপের স্বাদ নিতে সহায়তা করে। মাটির কাছে গিয়ে এমন তরতাজা খানা খাওয়ার পরিতৃপ্তি বহু বছর জোটেনি। এক কথায় করোনা অনেকদিন মুষড়ে রেখেছে সবার মনমানসিকতা। সেখানকার খাঁটি দুধের চা’য়ে ছিল ছোটবেলার কোন একটা ঘ্রান! আহ! অমৃত!
শেষ বিকেলেও ছবি তোলার মহাহিড়িক । শুরুতেই অনেকে ভিডিও করে ছেড়ে দেয় সামাজিক মাধ্যমে। কবিদের আবৃত্তি ,গান,লাইভে মাতিয়ে রাখে যার যার পছন্দের মানুষকে নিয়ে। সোনাগাজী থেকে কয়েক কবি যুক্ত হয় ; স্বাগত জানায় তাদের মাটিতে; সহযোগী যোদ্ধাদের।
ফেরার পথে সন্ধার বিরহী গান। মলিনতা নেমে আসে সারথীদের মনের সাথে মিল কওে সূর্য মামা। লাল সূর্য ডোবে ডোবে। তখনি নৌকা গুলোয় ভরে ওঠে বিদায় ক্ষনের ব্যথা। সোহেল গাজীর ছেলে মানুষী ছিল সারাদিন ভর। কাজেও ,দুষ্টমীতেও।
কৌতুক অভিনেতা ইমরান শাহ আলম রসের গান গেয়ে ফেরার পথে আঁধারের ভয়কে দূর করে দিয়েছেন। এই নদীতে জল দস্যুদের উৎপাত আছে বৈকি এখনো! হাসতে হাসতে সবার দম যাবার অবস্থা। নদীর পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দে প্রকম্প তোলে কৌতুক ভরা হাসির সুরে।
একটি অভিজ্ঞতার টিপসঃ
ব্যক্তি জীবনের কথা যদি বলি অপ্রয়োজনীয় আর্থিক সংগতি থাকলে ও পারিবারিক চাপ যদি না থাকতো তাহলে আমি ভ্রমন করেই বেড়াতাম। আমি একজন লেখক মানুষ। কাজ ও ভ্রমণ আলাদা চোখে রাখি না। কোন ভ্রমণ কোন সংগঠন থেকে আয়োজন হলে; তাতে একা যাবে না দোকলা যাবে এটা পারিপার্শ্বিক পরিসিথতির উপর , পরিবারের সদস্যের মেন্টালিটি ও পছন্দের উপর ডিপেন্ড করবে। যেহেতু কলম সৈনিক,পত্রিকায় কাজ করি তাহলে ম্যাক্সিমাম সময় আমাদের পরিবার ছাড়াই যেকোন জায়গায় অবস্থান নিতে হয়। তাহলে সেখানে প্রশ্নবোধক থাকার অবকাশ আসে না।
ব্যক্তিগত আলাপ নিয়ে ঘাটাঘাটি চরম অন্যায় ও অভদ্রতা। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি বিব্রত না হচ্ছেন আপনাদের সাথে একলা ভ্রমণরত মানুষটার জন্য। আপনার পরিবারের অনুপস্থিতিতে ওই মানুষের সাথে কাজ করতে পারলে ভ্রমণে ওই মানুষ একা কেন তা নিয়ে জল্পনা হবার কথা না। কেননা আপনার সাথে আপনার পরিবার আছে ভ্রমণে। আপনি সুরক্ষিত আছেন। লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বলেন ‘‘ যাকে তুমি ভালবাস না,তার সাথে কখনো ভ্রমণ করো না।”
এমন মনমানসিক মানুষরা কখনো ভ্রমণে যাওয়া উচিতই না। পরনিন্দা ও অন্যের ব্যক্তি জীবন নিয়ে সন্দেহ কারী এদের জন্য নিজ ঘরেই ঘুরার জায়গা বানানো দরকার। যে ভ্রমণ আপনাকে উদ্বেলিত করবে না,পরিবর্তন আনবে না সে ভ্রমণ আপনার দরকার নেই।