আইনের শাসন সবার জন্য সমান নয়

প্রকাশিত: ৯:২৮ পূর্বাহ্ণ , অক্টোবর ২৮, ২০২০

সাংসদ হাজী সেলিমের পুত্র ইরফান সেলিমকে দ্রুত গ্রেপ্তারের ঘটনার প্রশংসা করা হলেও প্রশ্নও আছে অনেক৷ ইরফান সেলিমের বাড়ির টর্চার সেলের খবর এখন জানা যাচ্ছে৷ তাহলে আগে কি ছিল না?আর এই ঘটনায় নৌবাহিনীর কর্মকর্তার সাথে না হয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে হলে কি প্রতিকার পাওয়া যেত?

রোববার রাতে কলাবাগান এলাকায় নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ আহমেদের মোটর সাইকেলের সঙ্গে ইরফানের গাড়ির ধাক্কা লাগা এবং তার জেরে ওই কর্মকর্তাকে মারপিটের ঘটনায় ইরফান ও তার সহযোগীরা আটক হয়েছোল৷ সোমবার দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত তাদের বাসা ও অফিসে অভিযান হয়েছে৷ বাসা থেকে মাদক, অস্ত্র, ওয়াকিটকি, দড়ি, হাড়সহ আরো অনেক কিছু উদ্ধার হয়েছে৷ ব়্যাব এটাকে বলছে টর্চার সেল৷ ওই এলাকায় নাকি তাদের আরো টর্চার সেল আছে৷ সোমবার অভিযানের পর র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত ওয়াকিটকি, অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের ঘটনায় ইরফান ও তার সহোগীদের দেড় বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে৷ আর তাদের বিরুদ্ধে নৌবাহিনীর কর্মকর্তার দায়ের করা হত্যাচেষ্টা মামলতো আছেই৷

পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘‘প্রভাবমুক্ত থেকেই হাজী সেলিমের ছেলের বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত হবে৷’’ কিন্তু হাজী সেলিম ও তার পুত্রের বিরুদ্ধে আগে কি কোনো অভিযোগ ছিল না? তখন কি চাপ ছিলো? পুরনো ঢাকার জমি দখল, বুড়িগঙ্গা দখল তো সবার জানা৷ একাধিকবার অভিযান চালিয়েও তা দখলমুক্ত রাখা যায়নি৷ হাজী সেলিম চাপের মুখে পড়ার পর সোমবারই পুরান ঢাকায় হাজী সেলিমের দখলে থাকা অগ্রণী ব্যাংকের জমি তারা পুলিশের সহায়তা ছাড়াই উদ্ধার করে নিয়েছে৷ এতদিন উদ্ধার করতে পারেনি৷তাহলে আইনের শাসন কোথায়? আর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীরও বা ভূমিকা কী?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান বলেন, ‘‘আইনের শাসন না থাকায় সাধারণ মানুষ তাদের ওপর অন্যায়ের প্রতিকার পায় না৷ কিন্তু এখানে সরকারের দুইটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ জড়িত৷ এমপি এবং নৌবাহিনীর কর্মকর্তা৷ সরকার তার বিবেচনায় মনে করেছে এখন নৌবাহিনীর কর্মকর্তার পক্ষেই অবস্থান নেয়া শ্রেয়৷ তাই আমরা অভিযান বা অ্যাকশন দেখতে পাচ্ছি৷ তা না হলে দেখতাম না৷ মেজর(অব.) সিনহা হত্যার ঘটনায়ও তাই হয়েছে৷ তার আগে কত ক্রসফায়ার হয়েছে৷ কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে?’’

বিশ্লেষকেরা বলছেন এরকম আরো অনেক হাজী সেলিম এবং ইরফান সেলিম আছেন৷ তাদেরও সাম্রাজ্যও আছে৷ তারা রাষ্ট্রের আর কোনো ক্ষমতাশালী পক্ষের সাথে দ্বন্দ্বে জড়ানোর আগে তাদের কাহিনি প্রকাশ পাবে না৷ ক্যাসিনো, বা পাপিয়াদের ঘটনাও একই কারণে প্রকাশ পেয়েছে৷ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুর্নীতির ঘটনায় সাহেদ-সাবরিনারা আটক হয়েছে৷ কিন্তু মূল হোতাদের কিছু হয়নি৷ তারা মনে করেন, এখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী জনগণের জন্য কাজ করে না৷ তারা ক্ষমতারই পক্ষে কাজ করে৷ শুধু মাত্র ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তারা একটি পক্ষে সক্রিয় হয়৷ সাধারণ মানুষের জন্য নয়৷ শেখ হাফিজুর রহমান বলেন, ‘‘কোটি টাকায় যদি মনোনয়ন বিক্রি হয় তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে তাদের ওপর অন্যায়ের প্রতিকার পাবে৷ এখানে প্রতিকার পেতে ক্ষমতা লাগে৷ যার ক্ষমতা বেশি সেই অন্যায় করে৷ আবার ক্ষমতা থাকলে প্রতিকারও পায়৷ এটাকে আইনের শাসন বলে না৷ আইনের শাসনে আইন ধনী, গরিব, শিক্ষক, পুলিশ সবার জন্য সামান৷’’সংবাদ মাধ্যমও ঘটনার পরে তারা পুলিশ যা বলে তা বড় করে ছাপে৷ তার আগে তাদের কোনো প্রতিবেদন দেখা যায়না৷ হাজী সেলিমের ছেলে যখন নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে মারধর করেন তখন অনেক সংবাদমাধ্যই তা নিয়ে কোনো প্রতিবেদন করেনি৷ তবে সোমবার দুপরে র্যাব যখন অ্যাকশনে যায় তখন তারা জোরেসোরে প্রতিবেদন প্রকাশ করে৷ এটিএএন নিউজের বার্তা প্রধান প্রভাষ আমিন বলেন, ‘‘এটা সংবাদমাধ্যমের বড় ধরনের ব্যর্থতা৷ এর পিছনে হয়তো অনেক কারণ আছে৷ অনেক স্বার্থও থাকতে পারে৷ কিন্তু এটাও ঠিক যে সংবাদমাধ্যম কখনো খারাপ ব্যক্তিকে ভালো হিসেবে চিহ্নিত করেনি৷’’

তবে সরকারের পক্ষ থেকে মনে করা হয় যে, যখন কোনা প্রভাবশালী ব্যক্তি অন্যায় আচরণ করে তখন তার ব্যাকগ্রাউন্ড খোঁজার প্রয়োজন হয়৷ আর তখনই অনেক অপরাধের কথা বেরিয়ে আসে৷ সব সময় আগে জানা যায় না৷ নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘‘ক্যাসিনোসহ আরো অনেক ঘটনা সরকারের উদ্যোগেই প্রকাশ হয়েছে৷ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে৷ তবে সব কিছু সব সময় জানা যায় না৷ সরকার সেটা জানতে পারে ব্যবস্থা নেয়৷’’

এই প্রভাবশালীরা যদি কোনো বাহিনীর সদস্য বা অন্য প্রভাবশালীদের সঙ্গে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে না জড়াত তাহলে কি আইনের আওতায় আসত? তাদের কীর্তিকলাপ বেরিয়ে আসত? সাধারণ মানুষ হলে প্রতিকার পেত? এইসব প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘এটা অতীত থেকে চলে আসা একটা কালচার৷ এই সমাজে অনেকেই অনেক কিছু প্রকাশ করে না৷ তবে শেখ হাসিনার সরকার এটা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে৷’’ DW