করোনাকাল

ধনীরা যখন গরিবের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান

প্রকাশিত: ২:৩১ অপরাহ্ণ , মে ২৯, ২০২০

শাহানা হুদা রঞ্জনা
করোনাভাইরাসে একের পর আক্রান্ত হচ্ছেন দেশের বড় বড় মানুষ। তাদের সবাইকে এখন দেশেই নিতে হচ্ছে করোনার চিকিৎসা। তাহলে এবার কি আমাদের বিত্তবান ও ক্ষমতাবান মানুষেরা ভাববেন দেশে এমন চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা, যেখানে বিপদ-আপদে সব মানুষ ভালো চিকিৎসা সেবা পাবে?
১৯৯২ সালের ৩০ নভেম্বর। আব্বাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরপরই জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল, আমরা বেশ কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

হঠাৎ জরুরি বিভাগের লোকজন এসে তাড়া দিয়ে বলল, “বডি সরান, বডি সরান। আমাদের ট্রলি লাগবে। বাইরে অ্যাম্বুলেন্সে বডি রেখে এসে ডেথ সার্টফিকেট নেন।” প্রথমে থতমত খেলেও পরে বুঝলাম, আব্বাকে না সরালে ওরা অন্য রোগী আনতে পারছেন না, তাই ট্রলিটা দরকার। হাসপাতালে ট্রলির মহাসংকট।

সেই সংকট কিন্তু আজ এই ২৮ বছরেও কাটেনি। কাটবে কীভাবে, আমরা কেউ কি কখনো সরকারি হাসপাতালের উন্নয়নের কথা ভেবেছি? ভাবিনি। খুব দরকারে ছুটে যাই, দরকার শেষ হলেই পিঠটান দেই।

অথচ দেশের অধিকাংশ মানুষ শুধু সরকারি স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার ওপরই নির্ভরশীল। আর এই সরকারি সেবাখাতেই রয়েছে বহুমাত্রিক সিস্টেম লস।

২০১১-২০১৯ সাল পর্যন্ত বাজেটে গড়ে শতকরা ৪.৫৮ ভাগ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে। এই তথ্যই প্রমাণ করে আমাদের স্বাস্থ্যখাত কতটা অবহেলিত। ২০১৭-১৮ সালে ১০ হাজার মানুষের জন্য হাসপাতালগুলোতে গড়ে তিনটি বিছানা বরাদ্দ ছিল।

সরকার যখন স্বাস্থ্যখাতে কম বাজেট বরাদ্দ করে, তখন চিকিৎসা নিতে গিয়ে মানুষের নিজের পকেটের খরচ বেড়ে যায়। একটি হিসেবে বলছে, স্বাস্থ্যখাতে নাগরিকরা তাদের পকেট থেকে শতকরা ৯৬.৫ ভাগ টাকা খরচ করতে বাধ্য হয়।

সেদিক থেকে বোঝা যাচ্ছে, এ দেশের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষ সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আছেন। তাদের সংসারের ব্যয় মিটিয়ে চিকিৎসা খরচ চালানোর কোনো উপায় থাকে না। এবং সব বৈষম্য মিলিয়ে তাদেরই অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

অসুস্থতার কারণে সাধারণ মানুষের জমা টাকা খরচ হয়, আয় কমে যায়, উৎপাদন কমে যায় আর অভাব বাড়ে। দরিদ্র্য মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে দেয় না। অবশ্য এ দেশে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুবিধা নিয়ে আলোচনা করারও কোনো মানে হয় না। এরা সরকারি সুবিধা হয় পাবেন অথবা পাবেন না। না পেলে মারা যাবেন, বাস্তবতা তাই বলে।

শুধু করোনাকালেই নয়, অন্য যেকোনো সময়ে কারও কখনো যদি সরকারি হাসপাতালের আউটডোর, জরুরি বিভাগ, আইসিইউ, কেবিন বা ওয়ার্ডে যাওয়ার বা থাকার অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে, তাহলে বুঝতে পারবেন কতটা কষ্টকর পরিবেশে মানুষ চিকিৎসা নেন আর আমাদের চিকিৎসকরা চিকিৎসা দেন।

আমার নিজের অভিজ্ঞতা হচ্ছে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের আইসিইউতে মাটিতে এবং বিছানায় রোগী, বিড়াল হেঁটে বেড়াচ্ছে, বিছানার চারপাশে দু’চারটা আড়শোলা, খাবারের টেবিলে পিঁপড়া, গার্ডের নিষেধ সত্ত্বেও গাদা গাদা দর্শনার্থীর ভীড় এবং কর্মরত চিকিৎসকদের চারপাশে দাঁড়িয়ে জনা দশেক লোক।

এরমধ্যে নতুন নতুন সিরিয়াস রোগী আসছেন। পুরানো রোগী মারা যাচ্ছেন। আর তাদের আত্মীয়-স্বজন মাতম করে কাঁদছেন। আর অসংখ্য হার্টের রোগী এসব দৃশ্য দেখতে বাধ্য হচ্ছেন।

এ তো শুধু ঢাকার একটি হাসপাতালের অবস্থা। পঙ্গু ও শিশু হাসপাতালেও একই অবস্থা দেখেছি। তবে হ্যাঁ, এতসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সরকারি হাসপাতালেই রোগীরা কম টাকায় সবচেয়ে ভালো চিকিৎসাটা পান।

আর ঢাকার বাইরের অবস্থা তো সহজেই অনুমেয়। করোনা হাসপাতালগুলোতে এই অবস্থা এখন আরও অনেক ভয়াবহ। এ সংক্রান্ত প্রচুর প্রতিবেদনও হয়েছে গণমাধ্যমে।

তাহলে হঠাৎ কেন আমরা এ রকম একটি প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করছি?

কারণ, গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে একটি স্ট্যাটাস বারবার ঘুরে-ফিরে দেখতে পাচ্ছি। স্ট্যাটাসটি এ রকম, “বড় ভাইয়ের কষ্ট বাড়ছে। এক-একটি শ্বাস যেন হাজার মণ ওজনের এক একটি পাথর। রিং বসানো হার্ট এত ভার সইতে পারে? এক পর্যায়ে ছোট ভাইয়ের ভেন্টিলেশন খুলে দেওয়া হলো বড় ভাইকে। হয়তো ক্ষণিকের স্বস্তি পেলেন, কিন্তু যে ধকল গেছে- তা আর কাটিয়ে উঠতে পারলেন না। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফুসফুসের কার্যক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের পরিচালক মোরশেদুল আলম। সময়মতো ভেন্টিলেশন সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে হয়তো তাকে বাঁচানো সম্ভব হতো। বড় ভাই মারা যাওয়ার পর ছোট ভাইকে আবার নেওয়া হয়েছে। তড়িঘড়ি করে যন্ত্রটি খুলে নিয়ে আবার দেওয়া হয়েছে ছোট ভাইয়ের মুখে। সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন তিনি।”

এই বর্ণনার কতটা সত্যি আর কতটা কল্পনাপ্রসূত, জানি না। তবে ঘটনাটি আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে সত্যি বলেই ধরে নেওয়া যায় এবং সাধারণ মানুষের ভাগ্যে এমনটাই ঘটে।

করোনাকালে সবচেয়ে অসুবিধা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়েছেন সেইসব ধনী মানুষ, বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও নেতা-কর্মী, যারা সাধারণত স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যে কোনো সমস্যায় বিদেশে চলে যান। এনারা যেহেতু দেশের মাটিতে কোনো চিকিৎসা নেন না, তাই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্পর্কেও তাদের তেমন কোনো ধারণা রাখার প্রয়োজন হয়নি এতদিন। করোনার কারণে এ বছর সেই মানুষগুলো দেশেই চিকিৎসা নিতে বাধ্য হতে হচ্ছেন, বিদেশে যেতে পারছেন না। ফলে ওনাদের এ ধরনের অভিজ্ঞতা হচ্ছে।

শুনেছি সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সরকারের অধীনস্থ হাসপাতাল যেমন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুয়েতমৈত্রী বা কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি হয়েছেন। তিনি কেন সরকারের অধীনস্থ হাসপাতালের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না? কেন এতগুলো হাসপাতাল বাদ দিয়ে উনি সিএমএইচে গেলেন? অসংখ্য করোনা আক্রান্ত সাধারণ মানুষ তাহলে এইসব নির্ধারিত হাসপাতালে কীভাবে চিকিৎসা নিচ্ছেন?

বাংলাদেশ জনসংখ্যা অনেক বেশি, স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ কম এবং ব্যবস্থাপনাগত কিছু অব্যবস্থার কারণে দেশের স্বাস্থ্যখাতের অবস্থা সবল নয়- করোনা পরিস্থিতিতে এ কথাগুলো যেন আরও বেশি করে প্রমাণিত হয়েছে।

যেহেতু ধনী ও ক্ষমতাধর রাজনৈতিক-প্রশাসনিক ব্যক্তিরা এসব হাসপাতালে যান না, তাই এসব হাসপাতালে মান উন্নয়ন এবং জবাবদিহিতার কোনো সংস্কৃতিও গড়ে ওঠেনি। এখানে যারা আসেন, তারা বেশির ভাগই সাধারণ মানুষ। তারা যে এখানে ফ্রি চিকিৎসা পাচ্ছেন, একটি বিছানা-বালিশ পাচ্ছেন, খাওয়া পাচ্ছেন এই তো বেশি। কতটুকু সুযোগ সরকার দিচ্ছে আর কতটা তারা পাচ্ছেন, এই কথা জানার জন্যও কেউ থাকে না।

যদি কোনো ধনী ও ক্ষমতাবান মানুষ এসব হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে বিরাজমান অব্যবস্থা ও অভাব-অনটন দেখতে পারতেন, তাহলে হয়তো এই হাসপাতালগুলোর অবস্থা আরও একটু উন্নত হতো।

যেমন, এদেশের নামকরা চিত্রশিল্পী নিতুন কুন্ডুর শরীর একবার খুব খারাপ করায় তাড়াতাড়ি শিল্পীকে একটি বড় সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু হাসপাতালে বিছানা খালি পাওয়া গেল না। তারপর ওনাকে মাটিতে থাকতে হয়েছিল কিছুক্ষণ। তাতে তিনি অনুভব করেছিলেন, সরকারি হাসপাতালের বেড রোগীর জন্য কতটা প্রয়োজনীয়। পরবর্তীকালে শিল্পী নিতুন কুন্ডু সেই হাসপাতালে অনেক সাহায্য সহযোগিতা করেছিলেন।

শুধু সরকারের ওপর নির্ভরতা এইসব সরকারি হাসপাতালগুলোকে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে দেয়নি। এর সঙ্গে প্রয়োজন বেসরকারি সহায়তা ও আর্থিক অনুদান এবং কঠিন নজরদারি।

আমরা জানি, এ দেশে এমনও শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে, যারা চাইলে দেশের স্বাস্থ্যখাতকে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। চিকিৎসা করাতে গিয়ে একজন দরিদ্র মানুষকে যে টাকাটা পকেট থেকে হাসপাতালে খরচ করতে হয়, এইসব শিল্প প্রতিষ্ঠান অনুদান দেওয়ার মাধ্যমে খুব সহজেই সেই খরচটা বহন করতে পারে। বিত্তবানরা যদি চান এক্ষুনি সরকারি হাসপাতালগুলোর আইসিইউ ইউনিট সাজিয়ে দিতে পারেন। ট্রলি, বেড, হুইল চেয়ার, টেস্ট কিট, ওষুধ, ভেন্টিলেটার, পিপিইসহ অনেক কিছুই দিয়ে দিতে পারেন।

সিঙ্গাপুরে হাসপাতালে কর্মরত একজন স্বাস্থ্যকর্মী জানালেন, কোভিড-১৯ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ওরা অবাক হয়ে গেছেন। কারণ দেশের ধনাঢ্য মানুষ, বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপ থেকে এত এত সহায়তা আসছে যে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হাত জোড় করে ফিরিয়ে দিচ্ছে। অন্যান্য সময়ও হাসপাতালগুলো নানা ধরনের সহায়তা পায় বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে।

ভারতের বড় বড় শিল্পপতিরা ব্যবসা করার জন্য যেমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, তেমনি পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেও এমন হাসপাতাল গড়ে তুলেছেন। আর যেন-তেন হাসপাতাল নয়, সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী যেমন যেতে পারেন, বিদেশিরাও সেই একই হাসপাতালেই যান। আবার যেতে পারেন সাধারণ ভারতীয়রাও, যাদের চিকিৎসা হয় অর্ধেক টাকায়। এই বাকি টাকাটা দিয়ে দেয় হাসপাতাল বা অন্য কোনো সংস্থা তাদের করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর) ফান্ড থেকে। আমরা ঠিক এ রকমই একটা সাপোর্ট চাইছি।

করোনাভাইরাসে একের পর আক্রান্ত হচ্ছেন দেশের বড় বড় মানুষ। তাদের সবাইকে এখন দেশেই নিতে হচ্ছে করোনার চিকিৎসা। তাহলে এবার কি আমাদের বিত্তবান ও ক্ষমতাবান মানুষেরা ভাববেন দেশে এমন চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা, যেখানে বিপদ-আপদে সব মানুষ ভালো চিকিৎসা সেবা পাবে?

শুধু লাভের জন্য পাঁচ তারকা ব্যবসায়িক বিনিয়োগ নয়, চাই অনুদান এবং কঠিন নজরদারি। যেন চিকিৎসা করাতে গেলে সাধারণ মানুষের পকেটের টাকা পকেটেই থাকে।

যদি এই করোনাকালের কথা বলি, তাহলে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে চিকিৎসা সুবিধা ও সেবা নিশ্চিত করা। বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো উৎপাদনই এখন কাজে আসবে না, যদি দেশের আর সব সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিত্তবান মানুষগুলোও সঠিক চিকিৎসা সুবিধা না পান।

তাই উচিত ঝাঁপিয়ে পড়ে এক্ষুনি করোনা মোকাবেলায় নানা কিছু দিয়ে সহায়তা করা। করোনাকালেই শুরু হোক সেই পথচলা। ‘সাধারণ মানুষ’ এবং ‘অসাধারণ মানুষ’ যেন একই হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারেন, ঠিক এ রকমই একটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখি।

লেখক: সিনিয়র কোঅর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন