সাকিল আহমেদ, কোলকাতা

ভারতরত্ন প্রণব মুখার্জির মহাপ্রয়াণে বিনম্র শ্রদ্ধা

প্রকাশিত: ১২:৫০ পূর্বাহ্ণ , সেপ্টেম্বর ১, ২০২০

ডায়মন্ড হারবারের প্রতি ছিল তাঁর আজন্ম টান। একজন যুবক অধ্যাপক প্রণব মুখোপাধ্যায় তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করে ছিলেন বাংলা কংগ্রেসের হাত ধরে।
আজ সব স্মৃতি হয়ে থাকল।দেশপ্রাণ বীরেন্দ্র শাসনামলের বংশের উত্তরসূরী অতুলনান্দ শাসমলের হাত ধরে তিনি বাংলা কংগ্রেসে যোগ দেন। অতুল বাবুর কন্যার সহপাঠী ছিলেন প্রণব জায়া শুভ্রা মুখোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন ডায়মন্ড হারবার উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী।
শুভ্রা মুখোপাধ্যায়ের বাবা ছিলেন ম্যাজিট্রেট। ডায়মন্ড হারবার গঙ্গার পাড়ে একটি স্টুডিওর পিছনে ভাড়া থাকতেন। নাচ গান ছবি আঁকার পারদর্শী ছিলেন প্রণব জায়া শুভ্রা।
ডায়মন্ড হারবার রোডের অদূরে বিদ্যানাগর কলেজে অধ্যাপনা করতেন।
প্রণব বাবুর দাদা পীযুষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন শান্তিনিকেতনের জাম্বুনির বাসিন্দা। এই প্রতিবেদক তাঁর কয়েকজন বন্ধু নিয়ে শান্তিনিকেতনে বেড়াতে গিয়ে একটি সাহিত্য আড্ডা বসে প্রণব বাবুর দাদার প্রতিবেশী ড. ভারতী বন্দোপাধ্যায় ও অরূপ পান্তির বাড়িতে। ভারতের রাষ্ট্রপতি তখন প্রণব মুখোপাধ্যায়। দাদা পীযুষ মুখোপাধ্যায় ঘরোয়া আড্ডায় রাষ্ট্রপতি ভাইয়ের গুনগান ও পারিবারিক কথা বলতে গিয়ে পীযুষ বাবু এই প্রতিবেদকের সামনে বলেছিলেন প্রণব খুব ম্যানেজ মাস্টার ছিলেন। শুভ্রার বিয়ের ব্যাপারে যে বন্ধুটি যোগাযোগ করে দিয়েছিলেন বিয়ের তালিকা থেকে সেই বন্ধুর নাম বাদ দিয়েছিলেন। প্রণব বাবুর গম্ভির বাবা যাতে খুশি হন তাই ম্যানেজ ছিল। দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি হবার সময় প্রটোকল অনুযায়ী বাড়ির কারোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ হত না মুখার্জি পরিবারে। ল্যান্ড ফোনে বিবিএক্স হয়ে তাঁর হাতে ফোন যেত অনেক হ্যাপায়। পীযুষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন প্রণব বাবুরঘ দাদা। জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের।
ডায়মন্ড হারবার উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের পড়ে মেট্রিক পাস করেছিলেন শুভ্রা মুখোপাধ্যায়।তাঁদের আদি বাড়ি ছিল যশোরে নড়াইলে। রাষ্ট্রপতি হয়ে শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে শ্বশুর বাড়ি যান বাংলাদেশে। বিদ্যানাগর কলেজে অধ্যাপনার পর বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন শুভ্রা দেবী। কয়েক বছর আগে ফাস্ট লেডি অফ ইন্ডিয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ডায়মন্ড হারবার গার্লস হাই স্কুলের শতবর্ষের অনুষ্ঠানে। আসতে পারেননি প্রণব বাবুর হঠাৎ শরীর খারাপ হওয়ায়। তবে স্কুলের উন্নয়নে দশ লক্ষ টাকার চেক ডায়মন্ড হারবার গার্লস স্কুলের উন্নয়নে শুভ্রা দেবী পাঠিয়েছিলেন। তাঁর আগমন উপলক্ষে তৈরি হয়েছিল হেলিপ্যাড। আজ সব স্মৃতি।বহুবার ডায়মন্ড হারবার এসেছেন প্রণব মুখোপাধ্যায়।কখনো প্রদেশ ২ কংগ্রেস সভাপতি আবার কখনো অর্থমন্ত্রী হিসেবে। নিজের জীবনের প্রথম যে কলেজে তিনি অধ্যাপনা করতেন সেই বিদ্যানাগর কলেজে এসেছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি হয়ে। আজ শোকে বিহ্বল যেমন বীরভূম তেমনি শোকে বিহ্বল ডায়মন্ড হারবারও।

১৯৩৫ সালের১১ ডিসেম্বর জন্ম ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যাযের পৈতৃক ভিটা বীরভূমে। মাত্র ৪৭ বছর বয়সে১৯৮২ সালে হয়েছিলেন ভারতের সবচেয়ে তরুণ অর্থমন্ত্রী।
ভারত সরকার দেশের প্রতি তাঁর অবদানক সম্মান জানিয়ে বেসামরিক সর্বোচ্চ সম্মান ভারতরত্ন প্রদান করেন ২০১৯ সালে।

প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রী সভায় এই তরুণ অর্থমন্ত্রী শেষে ভারতের ১৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ২০১২ থেকে২০১৭ পর্যন্ত।
ক্ষমতার অলিন্দে থাকা ভারতরত্ন প্রণব মুখোপাধ্যায় একটা যুগের অবসান।
রাজ্য সাভার সদস্য ছিলেন বহু বছর। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির দায়িত্ব যোজনা কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন।
মুর্শিদাবাদের অবিসংবাদিত কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরীর আহবানে জঙ্গিপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে তিনি কংগ্রেসের টিকিটে২০০৪ সালে সাংসদ হন।
ভারতীয় রাজনীতির চাণক্য রাজীব গান্ধীর প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সমাজবাদী কংগ্রেস দল গঠন করেছিলেন।দীর্ঘ ৪০ বছরের রাজনৈতিক জীবন স্তব্ধ হল আজ ৩১ আগস্টে। মস্তিস্কে অস্ত্রোপচার করার জন্যে ১৯ আগস্ট ভর্তি হয়েছিলেন আর্মি হাসপাতালে।আজ সব কিছু পিছু ফেলে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
আমার দীর্ঘ ২৮ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে প্রণব বাবুকে পেয়েছি প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি যোজনা কমিশনের চেয়ারম্যান কখনো রাষ্ট্রপতি আবার কখনো অর্থমন্ত্রী হিসেবে কভার করতে গিয়ে।রাজনীতিতে ভারতের চাণক্য চলে গেলেন। ৮৪ বছরের এক যুগের অবসান ঘটল। তাঁকে প্রণাম।

রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় স্মরণে ভারত সরকার জাতীয় শোক ঘোষণা করেছে সাত দিনের। ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী গভীর শোক জ্ঞাপন করেছেন।