বিসিএসের পেছনে কেন আমাদের এত দৌড়?

প্রকাশিত: ৬:৪৬ অপরাহ্ণ , আগস্ট ১৮, ২০২০

ডা. শারমিন ইয়াসমিন খান

বিসিএস কি কোনো বিশেষায়িত ডিগ্রি?-উত্তর হচ্ছে, না। বিসিএস হচ্ছে বাংলাদেশ জীবনধারণের জন্য একটি অবলম্বন অর্থাৎ চাকরি মাত্র।

এদেশের পরীক্ষার নিয়ম অনুযায়ী তিন ঘণ্টা এমসিকিউ দিয়ে যেকোনো ছাত্রছাত্রীকে জাজ (মূল্যায়ন) করে ফেলার একটি কৌশলমাত্র। কারণ তিন ঘণ্টা এমসিকিউ এবং অথৈ সাগরে হাবুডুবু খাওয়া ৫ মিনিটের ভাইভা দিয়ে কখনো একজন ছাত্র ছাত্রীকে মূল্যায়ন করা যাবে বলে আমি মনে করি না।

হালনাগাদের হাইপের বিষয় হচ্ছে এই বিসিএস। বিশেষ করে বিশেষায়িত ডিগ্রিধারী টেকনিক্যাল ক্যাডার বিসিএসের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে।

কেন ঝুঁকে পড়েছেন এই প্রশ্নের উত্তরে অলরেডি হাজার-হাজার মানুষ কথা বলেছেন এবং নিউজ পোর্টালগুলোতেও চলে এসেছে। অতশত আমি বুঝি না সহজ-সরল ভাষায় আমি যা বুঝি সেগুলো আমি বলবো।

প্রথমে বলে নিতে চাই, কে কোন সাবজেক্টে যাবে অথবা কে কোন চাকরি করবে সেটি একান্তই তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। মার্গারেট থ্যাচার বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন রসায়নবিদ। মালয়েশিয়ার পুরো প্রেক্ষাপট পরিবর্তন করা মাহাথির মোহাম্মদ ছিলেন একজন চিকিৎসক। চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। তার আগের জন ছিলেন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। ঠিক তেমনি বিলগেটস পড়াশোনা করেছিলেন হার্ভার্ডের বিজনেস ইস্কুলে। এসব দেশে কি পলিটিকাল সায়েন্সের মানুষদের অভাব ছিল?

তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স অথবা কেমিস্ট্রি পড়ুয়া কোনো ছাত্র, বুয়েটের কোনো ছাত্র-ছাত্রী অথবা কোনো চিকিৎসক যদি জীবনধারণের জন্য অথবা পেশা পরিবর্তন করে পুলিশ, ফরেন ক্যাডার হতে চায় এটি তার নাগরিক অধিকার।

কিন্তু মনে প্রশ্নটা ঠিক তখনই যাগে যখন একজন উঠতি তরুণ মেধাবী যিনি কিনা গবেষণার ক্ষেত্রে অনেক ভালো করতে পারতেন শুধুমাত্র সিস্টেমের কারণে তার পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় চলে যান তখন।

সমস্যা তো প্রথমেই আমাদের সিস্টেমে তৈরি হয়ে আছে।আমার কাছে এই বিসিএস পুরো জিনিসটাই একটি গোঁজামিল সিস্টেম মনে হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সব অফিস-আদালতে মাথায় বসে থাকেন এডমিন ক্যাডারের মানুষজন। এডমিন ক্যাডারে এতবছর কারা গিয়েছেন?

যে সাবজেক্টগুলো থেকে এডমিন ক্যাডারে ছাত্র-ছাত্রীরা স্থানান্তরিত হচ্ছেন সেই সাবজেক্টগুলো কি আদৌ উপযুক্ত? যে একই সিস্টেমের পরীক্ষা দিয়ে বিভিন্ন এডমিন ক্যাডারগুলোতে তারা প্রবেশ করছেন সেই পরীক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে আমরা কেউ প্রশ্ন তুলেছি?

ইসলামিক স্টাডিজ ইতিহাস বাংলা অথবা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন সাবজেক্ট থেকে তারা ফরেন, প্রশাসন ও পুলিশসহ অন্যান্য ক্যাডারে নির্বাচিত হয়েছেন।

না, আমি কোনো সাবজেক্টকে ছোট করে বলছি না। কিন্তু একটু লক্ষ্য করলেই দেখতে পাবেন এখন যখন ডাক্তার এবং ইঞ্জিনিয়াররা পরীক্ষা দেয়া শুরু করেছেন তখন এসব এডমিন ক্যাডারগুলোতে তারাই গ্রহণযোগ্যতা বেশি পাচ্ছেন। কারণ তারা আসলেই দেশের রত্ন, দেশের ভবিষ্যৎ।

বিসিএসের পরীক্ষার নিয়মকানুন এবং সিলেবাস একজন মানুষকে কতটুকু মূল্যায়িত করতে পারে? বাংলা, ইংলিশ, গণিত, বিজ্ঞান এবং অন্যান্য সাবজেক্টের এমসিকিউ, রিটেন এবং বিশাল সমুদ্রে হাবুডুবু খেয়ে ভাইভা দেয়ার পরে আসলেই একজন মানুষ কতটুকু উপযুক্ত হতে পারে?

আমরা যদি কানাডা, নিউজিল্যান্ড, জার্মানির মতো দেশগুলোর সিনেট মেম্বারদের কোয়ালিফিকেশনের দিকে তাকাই তাহলে আমরা বুঝতে পারব আমাদের এবং তাদের মাঝে এত বিস্তর ফারাক কেন?

একজন ছাত্র বা ছাত্রী বুয়েট এবং ঢাকা মেডিকেলসহ সরকারি প্রথম সারির মেডিকেল থেকে পাস করা একজন স্টুডেন্ট এদেশের জন্য রত্ন। তারা যে সেক্টরে হাত দেবেন সেই সেক্টরই তারা ভালো করতে পারবেন। কিন্তু যে দেশে ভার্সিটিতে ঢোকার পরে mp3 নিয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটি এত ঐতিহ্যময় লাইব্রেরিতে বসে পড়েন অথবা ইন্টার্নি করার সময় যখন আমাদের কাজ শেখার কথা সেই সময় ওয়ার্ডে বসে বিসিএসের পড়া পড়ে অথবা পিজির লাইব্রেরিতে বিসিএসের জন্য গাইড নিয়ে বসে পড়েন তাহলে তারা তাদের নিজের মেধার ওপর কতটুকু সুবিচার করছে বলে আপনি মনে করেন?

বিসিএসের পেছনে কেন এত দৌড়?

যখন একজন চিকিৎসক অথবা ইঞ্জিনিয়ারের নিজের সাবজেক্টের ওপর দখল নেয়ার কথা, মাস্টার্স পিএইচডি করার কথা, তখন তারা এম্পিথ্রি নিয়ে বিসিএসের পিছনে ছুটে চলেছেন। তার পেছনে আরেকটি প্রধান কারণ হচ্ছে ক্যাডার মাঝে বৈষম্যকরণ।

আমরা সবাই দেখতে পাই, এডমিন ক্যাডারে যারা আছেন তারা ব্যাকবেঞ্চার হয়েও এই যে সে যারা ফার্স্ট বেঞ্চের ছাত্র-ছাত্রীদের ওপরে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন। যে দেশে মেধার মূল্য দেয়া হয় না সেই দেশে তারা ক্যারিয়ার শিফট করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাকে দেশের জন্য ভালো হচ্ছে?

আজ থেকে ১৫ অথবা ২০ বছর পর আমাকে এবং আপনাকে কারা চিকিৎসা দেবেন? আমাদের দেশে পাওয়ার প্লান্টগুলোতে কারা কাজ করবেন?

পুরো পৃথিবী যখন আধুনিকায়ন হচ্ছে নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করছে তখন আমাদের দেশে আমরা ফাঁকা বুলি আওড়িয়ে শুধু শুধু কন্ট্রোভার্সি তৈরি করছি। কিন্তু কাজের বেলায় আমরা কেউই কিছু আবিস্কার করতে পারছি না।

চিকিৎসকদের মূল্যায়ন যেভাবে করা উচিত

চিকিৎসক এবং ইঞ্জিনিয়ারদের ডিগনিটি কখনোই বিসিএস দিয়ে মূল্যায়ন করা যাবে না। বিসিএস কখনোই কোন ডিগ্রি নয়। কিছু বছর আগেও বিসিএস নেয়া তো হাইপ ছিল না। ৩৩ তম বিসিএসের পর থেকে যখন বেতন স্কেল পরিবর্তন করা হলো বেতন বৃদ্ধি করা হল তখন থেকেই শুরু হয়েছে।

বিসিএস শুধুমাত্র চাকরির নিশ্চয়তা এবং নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো দিয়ে জীবনকে সুরক্ষা করে মাত্র। আপনি কোন বিসিএসে এডমিন হয়েছেন অথবা স্বাস্থ্য ক্যাডারের টিকেছেন সেটি কখনোই আপনার পরিচয় হতে পারে না। আপনার পরিচয় হবে চিকিৎসক হওয়ার পরে আপনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে কী কী ডিগ্রি নিয়েছেন এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে আপনি কী কী অবদান রেখেছেন।

ইউকে লাইসেন্স এক্সাম PALB or NHS job, Degree from Royal college of physicians, US USMLE, CANADA MCCEE, Australia AMC পরীক্ষাগুলো হচ্ছে চিকিৎসকদের জন্য তৈরিকৃত এবং পারফেক্ট পরীক্ষা।

টেকনিক্যাল ক্যাডারদের জন্য বাংলাদেশে বর্তমানে যে বিসিএস ব্যবস্থা চালু আছে তা কখনোই তাদের জ্ঞানকে প্রতিফলিত করে না।

বিসিএস সময়সাপেক্ষ, ভাগ্য এবং ধৈর্যের পরীক্ষা। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে যারা বিসিএসে টিকতে পারছেন না কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে বড় বড় ডিগ্রি নিচ্ছেন নিজের জ্ঞানকে প্রতিফলিত করছেন তারা কিন্তু ঠিকই নিজের ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবেন।

বিসিএস শেষ করার পরেও চিকিৎসকরা ডিগ্রি করতে না পেরে হতাশায় ভুগেন। বিসিএস যদি ডিগ্রি হয়ে থাকে তাহলে কেন তারা হতাশায় ভোগেন?

আর যারা বিসিএস করার পরে আমি কি হনুরে ভাবছেন তারা মোটেও ঠিক করছেন না। এই বিসিএসকে আমরাই হাইপে নিয়ে এসেছি। আমাদের পরিবারের চিন্তাভাবনা জন্যই বিসিএসকে আমরা মূল্য দিচ্ছি।

আপনি আমি আমাদের চিন্তাভাবনা ধ্যান ধারণা যদি পরিবর্তন করতে পারি এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে নতুন কিছু করে দেখাতে পারি তাহলে পরবর্তী জেনারেশনে এটি কমলেও কমতে পারে।

সবশেসে আমি যা উপলব্ধি করি তার সার কথা হলো-বিসিএসে চরম অবহেলার সিস্টেমের মধ্যে দিয়ে তৈরি চাকরির ভাগ্য নির্ধারিত হয়। এই সিস্টেমের মধ্যে দিয়ে হয়তো আমাকেও যেতে হবে। হয়তোবা সেটি জীবিকার জন্য অথবা হিউমিলিয়েশন থেকে বাঁচার জন্য। সবাই বলে সিস্টেমকে চেঞ্জ করতে হলে সিস্টেমের মধ্যে ঢুকতে হয়। কথাটি আসলে ঠিক নয়। সিস্টেমকে চেঞ্জ করতে হলে সিস্টেমে বাইরে থেকেই পরিবর্তন আসা জরুরি বলে আমি মনে করি।

লেখক: ডা. শারমিন ইয়াসমিন খান

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা বিদ্যায় উচ্চতর ডিগ্রিতে অধ্যয়নরত