বিচারব্যবস্থা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাবনা

প্রকাশিত: ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ , আগস্ট ১৪, ২০২০

বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম:

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়ের উল্লেখযোগ্য অংশ কাটাতে হয়েছিল কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে, নির্জন সেলে। কথিত রাষ্ট্রদ্রোহমূলক বক্তব্য প্রদান, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, খুনের চেষ্টাসহ বিভিন্ন হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা, ‘দ্য বেঙ্গল স্পেশাল পাওয়ার অর্ডিন্যান্স, ১৯৪৬’ যা পরবর্তীকালে অস্থায়ীভাবে পুনঃপ্রবর্তন ও ধারাবাহিকতা দেওয়া হয় ‘দি ইস্ট বেঙ্গল অ্যাক্ট, ১৯৫১’-এর মাধ্যমে, ‘দি ইস্ট পাকিস্তান পাবলিক সেফটি অর্ডিন্যান্স, ১৯৫৮’ এবং ‘ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুলস, ১৯৬৫’, যেগুলো নিরাপত্তা আইন নামে অধিক পরিচিত ছিল, এর আওতায় তাঁকে বারবার গ্রেপ্তার ও আটক করে কারাগারে রাখা হয়েছিল। আদালতের আদেশে এক মামলায় মুক্তি পাওয়ার পর জেলগেটেই আবার আরেক মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল একাধিকবার। আপসহীন-সংগ্রামী বঙ্গবন্ধু সে সব পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন অদম্য সাহস ও জনগণের ওপর গভীর আস্থা রেখে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ ও তত্ত্বাবধানে বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু তাঁর লেখায় তৎকালীন সময়ের রাজনীতি, শাসকগোষ্ঠীর ভূমিকা, তাঁর নিজস্ব ও অন্যান্য রাজনীতিবিদের ভূমিকা ও অবস্থান, তাঁকে বারবার মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার ও নিরাপত্তা আইনে আটকের পাশাপাশি আইন, আদালত ও বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা, মূল্যায়ন ও দৃষ্টিভঙ্গি বিবৃত করেছেন।

বঙ্গবন্ধু সর্বপ্রথম গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সম্ভবত ১৯৩৮ সালের মার্চ বা এপ্রিল মাসে। তিনি তখন স্কুলছাত্র। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক তখন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শ্রমমন্ত্রী। বাংলার ওই দুই নেতার গোপালগঞ্জ আগমন উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর ওপর দায়িত্ব পড়ে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করার। তিনি দলমত নির্বিশেষে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেন। কিন্তু পরে হিন্দু ছাত্ররা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী থেকে সরে পড়তে শুরু করে কংগ্রেসের আপত্তি ও প্ররোচনায়। এ নিয়ে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে ‘আড়াআড়ি চলছিল’ (বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত শব্দ) এবং দু-একজন মুসলমানের ওপর অত্যাচারও হয়। ওই দুই নেতার সফর হয়ে যাওয়ার কিছুদিন পর বঙ্গবন্ধুর এক সহপাঠী আব্দুল মালেককে হিন্দু মহাসভার সভাপতি সুরেন ব্যানার্জির বাড়িতে ধরে নিয়ে আটক ও মারধর করার খবর পেয়ে বঙ্গবন্ধু কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়ে মালেককে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু মালেককে ছেড়ে না দিয়ে সেখানে উপস্থিত রমাপদ দত্ত নামে একজন বঙ্গবন্ধুকে গালি এবং পুলিশে খবর দেন। ঘটনাটি উভয় পক্ষের মধ্যে মারধর পর্যন্ত গড়ায় এবং অবশেষে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহযোগীরা মালেককে দরজা ভেঙে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষ্য অনুযায়ী, রাতে হিন্দু নেতারা থানায় বসে হিন্দু অফিসারের সঙ্গে পরামর্শ করে ‘এজাহার’ তৈরি করে মামলা দায়ের করে। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি ‘ছোরা’ দিয়ে রমাপদকে আহত করে খুন করার চেষ্টা, লুটপাট ও দাঙ্গাহাঙ্গামা লাগিয়েছিলেন; যদিও বঙ্গবন্ধুর বর্ণনামতে তাঁদের হাতে লাঠি ছিল, কোনো ‘ছোরা’ ছিল না। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোপালগঞ্জে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমানের হস্তক্ষেপে ঘটনাটি আপস হয় ১৫শ’ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদানের মাধ্যমে (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-১০-১৩)।

উপরোক্ত ঘটনাটি যদি বর্তমান সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে আমাদের সমাজে ফৌজদারি মামলা দায়েরের সময় অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে নিরপরাধ ব্যক্তিদের জড়িয়ে এজাহার/অভিযোগ দায়ের করার প্রবণতা এখনও খুব প্রবল ও বাস্তব একটি বিষয়।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর একান্ত স্নেহভাজন হিসেবে তাঁকে নেতা মেনে বঙ্গবন্ধু ছাত্র অবস্থায় কলকাতা এবং পূর্ব বাংলায় (আজকের বাংলাদেশ) পাকিস্তান আন্দোলনের প্রথম কাতারের সংগঠক ও ছাত্রনেতা ছিলেন। কিন্তু ‘৪৭-এ পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পরের বছরেই অর্থাৎ ‘৪৮-এর ১১ মার্চ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন ২৩ ফেব্রুয়ারি আইন পরিষদে ‘পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেবে’ বলে ঘোষণা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে বঙ্গবন্ধু এর প্রতিবাদ জানান এবং বিভিন্ন ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা করেন এবং ২ মার্চ ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে ১১ মার্চ সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। ১১ মার্চ ধর্মঘট পালনকালে বিক্ষোভরত অবস্থায় সচিবালয়ের সামনে থেকে বঙ্গবন্ধুসহ অন্যদের গ্রেপ্তার করা হয়। ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে মুসলিম লীগ সরকার ১৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুসহ অন্যদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। তারপর থেকে মুসলিম লীগ সরকার এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার ও আটক একটি রুটিন কাজে পরিণত করে, যার পরিসমাপ্তি ঘটে স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের লায়ালপুর কারাগার থেকে মুক্তিলাভের মাধ্যমে।

বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী ছিলেন মাত্র কয়েকদিন। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রে যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়া হয় মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এবং বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয় ডাকাতি ও খুন করার চেষ্টা, লুটতরাজ ও সরকারি সম্পত্তি বিনষ্ট করা সংক্রান্ত একটি মামলায়। ঘটনাটি ঘটেছিল বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায় যোগদানের আগে, যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা গঠনের পরপরই। চকবাজার এলাকায় জেল সিপাহিদের সঙ্গে স্থানীয় জনগণের কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে জেল সিপাহিরা গুলি করে। একজন মারা যায়, আহত হয় অনেকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বঙ্গবন্ধু ওই এলাকায় বসবাসরত আতাউর রহমান খানকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। পরবর্তীকালে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী সৈয়দ আজিজুল হক নান্না মিয়াও ঘটনাস্থলে আসেন। স্থানীয় জনগণের অভিযোগ ছিল ঢাকা জেলের অ্যাংলো ইন্ডিয়ান সার্জেন্ট মি. গজ নিজেই গুলি চালিয়েছিলেন এবং তারা মি. গজের বিচার দাবি করেন। এক পর্যায়ে উত্তেজিত জনতা চকবাজার এলাকায় মি. গজের বাড়ি আক্রমণ করে। বঙ্গবন্ধু উপস্থিত মন্ত্রী, অন্যান্য নেতা ও সরকারি কর্মচারীদের অনুরোধে মি. গজের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে সবাইকে শান্ত ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর পুলিশের তৎকালীন আইজি দোহা কয়েকজন পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে এসে বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে ফেলে বলেন, ‘আপনি গ্রেপ্তার’। বঙ্গবন্ধু উত্তর দেন, ‘খুব ভালো’। জনতার চিৎকারে ও প্রতিবাদে আইজিপি বঙ্গবন্ধুকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। পরবর্তীকালে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধুকে ওই ঘটনার মামলায় গ্রেপ্তার ও বিচারের সম্মুখীন করা হয়।

বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন- ‘১৯৫৫ সাল পর্যন্ত এই মামলা চলে। জনাব ফজলে রাব্বী, প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে বিচার হয়। অনেক মিথ্যা সাক্ষী যোগাড় করেছিল। এমনকি মিষ্টার গজের মেয়েও আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছিলেন। পাবলিক সাক্ষী যোগাড় করতে পারে নাই। জেল ওয়ার্ডের মধ্য থেকেও কয়েকজন সাক্ষী এনেছিল। তার মধ্যে দুইজন ওয়ার্ডার সত্য কথা বলে ফেলল যে, তারা আমাকে দেখেছে গাড়ির উপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করতে এবং লোকদের চলে যেতেও আমি বলেছিলাম, তাও বলল। জেল সুপারিনটেনডেন্ট মিষ্টার নাজিরউদ্দিন সরকার কিন্তু সত্য কথা বললেন না, পুলিশ যা শিখিয়ে দিয়েছিল তাই বললেন। এক একজন সাক্ষী এক এক কথা বলল এবং কিছু কিছু সরকারী সাক্ষী একথাও স্বীকার করল যে, আমি জনতাকে শান্তি রক্ষা করতে অনুরোধ করেছিলাম। তাতে ম্যাজিষ্ট্রেট আমার বিরুদ্ধে কোন কিছু না থাকায় আমাকে বেকসুর খালাস দিলেন এবং রায়ে বলেছিলেন যে, আমাকে শান্তিভঙ্গকারী না বলে শান্তিরক্ষকই বলা যেতে পারে।’ (পৃষ্ঠা-২৭৭)।

আমাদের বিচার ব্যবস্থায় ‘টেলিফোনের’ একটা প্রভাব আছে মর্মে জনশ্রুতি আছে। বঙ্গবন্ধু এ বিষয়ে নিজ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন এভাবে- ‘কোর্ট তো জেলগেটেই বসবে। মাত্র ছয়দিন আছে, কখন কাগজপত্র নিবে, নকল নিতে সময় লাগবে কোর্ট থেকে। কোন কোন এডভোকেট আসবে? এরা বিচারের নামে প্রহসন করতে চায়। মার্শাল ল’ যখন চলছিল তখনও বিচার পেয়েছিলাম, আজকাল জামিনের কথা উঠলেই টেলিফোন বেজে উঠে।’ (রোজনামচা, পৃষ্ঠা-১৮৫)।

মোবাইল কোর্টের অপব্যবহারের বিষয়েও বঙ্গবন্ধু অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। ঐতিহাসিক ৬ জুন ১৯৬৬। ছয় দফার সমর্থনে হরতালকে কেন্দ্র করে নিরীহ জনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ, গণগ্রেপ্তার এবং সামারি কোর্ট করে সাজা দিয়ে শত শত নিরীহ ব্যক্তি এমনকি শিশুদেরও সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তখন কারাগারে। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- ‘বিকালে আরও বহু লোক গ্রেফতার হয়ে এল। প্রত্যেককে সামারী কোর্ট করে সাজা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাহাকেও এক মাস, কাহাকেও দুই মাস। বেশির ভাগ লোকই রাস্তা থেকে ধরে এনেছে শুনলাম। অনেকে নাকি বলে রাস্তা দিয়া যাইতেছিলাম ধরে নিয়ে এল। আবার জেলও দিয়ে দিল। সমস্ত দিনটা পাগলের মতোই কাটলো আমার।’ (রোজনামচা, পৃষ্ঠা-৭০-৭১)

বঙ্গবন্ধু দীর্ঘদিন বিভিন্ন পর্যায়ে কারাগারে থেকে আটক বিভিন্ন শ্রেণির বন্দিদের (হাজতি-কয়েদি ও নিরাপত্তা আইনে আটক) খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তাদের দুঃখ-কষ্ট, হয়রানি, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, বন্দিদের সংসার ভেঙে যাওয়া, কারাগারের অভ্যন্তরের ঘুষ-দুর্নীতি, আইন-আদালত ও বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতায় প্রভূত সমৃদ্ধ হয়েছিলেন। সে কারণে স্বাধীনতার পর তাঁর প্রত্যয় ছিল আইন-আদালত ও বিচার ব্যবস্থার সংস্কার করে এটাকে সহজতর করা, যাতে বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত ও সহজে বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

বিচারের দীর্ঘসূত্রতা বঙ্গবন্ধুকে সব সময় পীড়া দিত এবং বিষয়টি নিয়ে তিনি ছিলেন উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠিত। বঙ্গবন্ধু তাঁর উপলব্ধি বর্ণনা করেছেন এভাবে- ‘যদি কেহ অন্যায় করে থাকে, বিচার করো তাড়াতাড়ি। এই জেলে অনেক লোক আছে যারা দুই তিন বৎসর হাজতে পড়ে আছে সামান্য কোন অপরাধের জন্য। যদি বিচার হয় তবে ৬ মাসের বেশি সেই ধারায় জেল হতে পারে না। বিচারের নামে একি অবিচার। আমার মনের অবস্থা আপনারা যারা বাইরে আছেন বুঝতে পারবেন না। কারাগারে এই ইঁটের ঘরে গেলে বুঝতে পারতেন।’ (রোজনামচা, পৃষ্ঠা-১৩৬)

বিচারের দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ জাতীয় সংসদে প্রদত্ত ভাষণে বলেছিলেন, ‘একটা কোর্টে বিচার গেলে একটা যদি সিভিল মামলা হয়; আপনি তো উকিল, স্পীকার সাহেব। আল্লাহর মর্জি যদি একটা মামলা সিভিল কোর্টে হয়, ২০ বছরেও সে মামলা শেষ হয় বলতে পারেন আমার কাছে? বাপ মরে যাবার সময় বাপ দিয়ে যায় ছেলের কাছে। আর উকিল দিয়ে যায় তার জামাইর কাছে সেই মামলা। আর ক্রিমিনাল কেস হলে এই লোয়ার কোর্ট, জর্জ কোর্ট- বিচার নাই। জাসটিস ডিলেড জাসটিস ডিনাইড- উ হ্যাভ টু মেইক এ কমপ্লিট চেইঞ্জ এবং সিস্টেমের মধ্যে পরিবর্তন করতে হবে। মানুষ যাতে সহজে বিচার পায় এবং সাথে সাথে বিচার পায়। ব্যাপক পরিবর্তন দরকার।’ বঙ্গবন্ধু একই দিন সংসদের অপর অধিবেশনে বলেছিলেন- ‘নতুন স্বাধীন দেশ। স্বাধীন মতবাদ, স্বাধীনভাবে দেশ শাসন করতে হবে। সেখানে জুডিশিয়াল সিস্টেমের অনেক পরিবর্তন দরকার।’

২৬ মার্চ ১৯৭৫ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত জনসভায় বঙ্গবন্ধু উপরোক্ত বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে বিচার বিভাগকে নতুন করে গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে ঘোষণা দিয়েছিলেন- ইংরেজ আমলের বিচার ব্যবস্থা পরিবর্তন করে মানুষ যাতে এক বছর, দেড় বছরের মধ্যে বিচার পায়, তার বন্দোবস্ত করার। একক জাতীয় দল ‘বাকশাল’ করার পর ২১ জুলাই ১৯৭৫ নবনিযুক্ত জেলা গভর্নরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ‘আর, বিচার ব্যবস্থা তাড়াতাড়ি বদলে ফেলা দরকার। বিচারের নামে অবিচার আর চলে না। এবার নতুন একটা কাঠামো করুন। সোজাসুজি বিচার হয়ে যাক।… জীবনভর আমি জেল খেটেছি, কয়েদিদের সাথে জীবন কাটিয়েছি। আমি জানি তাদের কী দুঃখ, কী কষ্ট। বিচার হোক, জেল খাটুক। বিচার হয় না, হাজতে থাকে। ফিফটি ফোর-এর এক বছর দু-বছর হাজত খেটে এক মাস জেল হয়। আর, এই যে এক বছর এগার মাস গেল, তার ক্ষতিপূরণটা কে দেয়? আবার অনেক সময় খালাস হয়ে যায়।’

‘৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন- ‘শাসনতন্ত্রের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা বিধান করা হবে। শাসনতন্ত্রে প্রশাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের সম্পূর্ণ পৃথক্‌করণের নিশ্চয়তা থাকবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বজায় রাখার মতো চরিত্রবান, জ্ঞানবান এবং ন্যায়বান ব্যক্তিরাই যাতে বিচার বিভাগের সদস্য হতে পারেন শাসনতন্ত্রে সেইরূপ বিধান রাখা হবে।’

বঙ্গবন্ধু ঘোষণাপত্রে বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণ ও এর স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিচারকদের যোগ্যতার বিষয়টিও উল্লেখ করেছিলেন। ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭২-এ গৃহীত নতুন সংবিধানের অধীনে সুপ্রিম কোর্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর সুস্পষ্ট ঘোষণা ছিল- ‘আদালতের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হবে না’ এবং ‘দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবেই’।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রণীত সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫(৩)-এ মৌলিক অধিকার হিসেবে ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারের অধিকার নিশ্চিতের বিধান করা হয়েছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২২-এ রাষ্ট্রকে রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ থেকে বিচার বিভাগের পৃথক্‌করণ নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংবিধানে অনুচ্ছেদ ১১৬ক সংযোজন করে বিচার-কর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদেরকে বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।

কারাগার, আইন-আদালত ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অভিজ্ঞতা, মূল্যায়ন, ভাবনা ও প্রত্যয় বর্তমান সময় থেকে ৬০/৭০ বছর আগের। কিন্তু তাঁর ওইসব মূল্যবান অভিজ্ঞতা, মূল্যায়ন, দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রত্যয়গুলোকে যদি বর্তমান সময়ের আইন-আদালত-বিচারব্যবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করা হয়- তবে বলতে দ্বিধা হওয়ার কথা নয় যে, বঙ্গবন্ধু যেন বর্তমান সময়ের বাস্তবতাকেই লিখে গেছেন। বলতে দ্বিধা নেই যে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও বিচারপ্রার্থীর ন্যায়বিচার-স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে নিশ্চিত করার জন্য ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অঙ্গীকার’ পূরণে এখনও অনেক করণীয় রয়েছে, যার দায়ভার মূলত রাষ্ট্রের নির্বাহী ও বিচার বিভাগের। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে সংশ্নিষ্ট সবাইকে বিষয়টি গভীর আন্তরিকতা ও অঙ্গীকার নিয়ে ভাবতে হবে। প্রণয়ন করতে হবে যথাযথ কর্মকৌশল- জাতির পিতার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানাতে এবং তাঁর রক্তঋণ পরিশোধের জন্য।

লেখক: বিচারপতি, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ এবং সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, বাংলাদেশ

সৌজন্যেঃ দৈনিক সমকাল