আইনের দৃষ্টিতে ১৫ আগস্টের আগে-পরের ঘটনা

প্রকাশিত: ১০:০৪ পূর্বাহ্ণ , আগস্ট ১৪, ২০২০

ড. শাহজাহান মন্ডল:

আগে-পরের ঘটনা বিবেচনা করে মাঝের ঘটনা কী ছিল তা আবিষ্কার করা যায়। বিএ পাস করা কোন ব্যক্তি গ্র্যাজুয়েশন সনদ দাখিল করলে আদালত অবশ্যই অনুমান করে যে, সে ব্যক্তি অতীতে এইচএসসি পাস করেছে। তৈলাক্ত মাথার ব্যক্তিকে ঘাড়ে লুঙ্গি-গামছা নিয়ে নদীর দিকে যেতে দেখে অবশ্যই অনুমান করা যায় যে, সে একটু পরেই নদীতে গোসল করবে। আইনে এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় occassion, cause, effect দেখে তথা আগে-পরের ঘটনা চিহ্নিত করে প্রকৃত ঘটনায় উপনীত হওয়া। ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের (Evidence Act) ৭ ধারায় এরকম বিধান রয়েছে। সাধারণ যৌক্তিক মানুষের মতো একজন বিচারকও অন্যান্য উপায়ের পাশাপাশি এ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ঘটনায় উপনীত হন এবং রায় দেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভোর রাতের এবং আগে-পরের ঘটনা বিশ্লেষণ করেও যে কোন সাধারণ যৌক্তিক মানুষ বুঝতে পারেন, মৃত্যুহীন বরপুত্র জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ড কারা এবং কী উদ্দেশ্যে ঘটিয়েছিল। তা ঐ ভোর রাতের যত আগের বা যত পরের ঘটনাই হোক না কেন সেগুলো।

সাক্ষ্য আইনের ১০ ধারা ও দণ্ডবিধির (Penal Code,1860) ৩৪ ধারার সমন্বয় করে বলা যায়, ‘কমন ইনটেনশন’ বা সম-অভিপ্রায়ের বশবর্তী হয়ে যারা ‘অপরাধ’ করে তাদের কাজের মধ্যে যত সময়ের দূরত্বই থাকুক না কেন, উক্ত ‘কমন ইনটেনশন’ তৈরি হবার পর তাদের যে কোন একজনের কথা, কর্ম বা লেখার দ্বারা অপরজনও সমভাবে দায়ী। ঠিক এ কারণেই বঙ্গবন্ধু হত্যার ‘কমন ইনটেনশনধারী’ মোস্তাক-ফারুক-ডালিম-রশীদ-জিয়া-নূর গং যত আগে বা যতো পরেই কোন কথা বলুক, কোন কাজ করুক বা কোন লেখা লেখুক না কেন এ জন্য তারা সমভাবে দায়ী। হতে পারে ঐ সমস্ত কাজে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কখনও দেখা-সাক্ষাত না-ও হতে পারে, তারা একে অপরকে না-ও চিনতে পারে। আইনে তাদের একই শাস্তি। এবার ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভোর রাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের আগে-পরের কয়েকটি ঘটনার যোগসূত্র মেলানোর চেষ্টা করা যাক।

প্রথমত- ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগের আত্মপ্রকাশ কালে দলের সভাপতি মাওলানা ভাসানী যখন যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের (তখনও ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাব পাননি) নাম ঘোষণা করেন, তখন ক্রোধান্বিত খন্দকার মোশতাক বলে ওঠেন, কেন তার নাম ঘোষণা হলো না। ক্ষমতা পাবার লোভ বা অপস্বার্থ তখনই তার প্রকাশিত হয়।

দ্বিতীয়ত- ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে যখন ঢাকায় পাকিস্তানী বাহিনী বোম্বিং ও গুলি শুরু করে তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ধানমণ্ডি ৩২-এর বাড়িতে উপস্থিত নেতৃবৃন্দের (তাজউদ্দীন আহমদ, ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলামের) সামনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং উক্ত ঘোষণা ইপিআরের মাধ্যমে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারের জন্য প্রেরণ করেন। কারণ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের ফ্রিকোয়েন্সি ছিল উচ্চ, যেখান থেকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের শুনতে পারার সুযোগ ছিল। ঘোষণাটি হাতে পেয়ে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ কমপক্ষে একজন মেজর র‌্যাঙ্কের কাউকে দিয়ে তা পাঠ করানোর চেষ্টা করেন, যাতে করে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি জনগণের নিকট অধিক গ্রহণযোগ্য মনে হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুল বোধ হয় এই একজন সেনা অফিসারের খোঁজ করা। এরকম খোঁজ না করে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ নিজেরাই এটি বেতারে প্রচার করলে আজকের বাংলাদেশ হয়তো অনেক কলুষমুক্ত থাকত। এদেশের ইতিহাস হতো অন্যরকম এবং ভাল। নেতারা মহা ভুলক্রমে সামনে যাকে পান তিনি আর কেউ নন, তিনি ছিলেন মহা সুযোগসন্ধানী, পাকিস্তানী জাহাজ ‘সোয়াত’ থেকে অস্ত্র-খালাস কর্মে নিযুক্ত, ভোল-পাল্টানো, বাই-চান্স মুক্তিযোদ্ধা, পাক সেনা অফিসার মেজর জিয়াউর রহমান। সুযোগের সদ্ব্যবহারে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বা সময়-ব্যয় করেননি তিনি। তখন টেলিভিশন দুষ্প্রাপ্য ছিল। রেডিও ছিল সহজলভ্য জনপ্রিয় যোগাযোগ মাধ্যম। ২৬ মার্চের সন্ধ্যায় রেডিওতে নিজেকে বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক-রাষ্ট্রপতি হিসেবে চিহ্নিত ও প্রচার করেন তিনি। যদিও পরের দিন ২৭ মার্চ উক্ত ভুল সংশোধন করে তিনি আবারও ঘোষণাটি পাঠ করেন ‘বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে’। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার জন্য জিয়াউর রহমানের লোভ বা অপস্বার্থ এখানে প্রকটভাবে প্রকাশিত হয়।

তৃতীয়ত- ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে, যখন বঙ্গবন্ধু-কর্তৃক আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণার প্রায় ছয় মাস হয়ে গেছে, যখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যখন বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ চলমান, যখন থেকে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন মাত্র মাস তিনেক বাকি, যখন সরকারের মন্ত্রীগণ কলকাতায় অবস্থানপূর্বক যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন, ঠিক তখনই তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক ও প্রভাবশালী নেতা তাহের উদ্দিন ঠাকুর গং পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশকে পুনরায় একত্রিত করে ‘কনফেডারেশন’ গঠনের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে দেন। বাংলাদেশ তখন স্বাধীন হলেও রাষ্ট্রকে ব্যর্থ করে দেয়ার অপচেষ্টা ও অপরাধ তারা তখন থেকেই শুরু করেন।

এগুলো হলো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু হত্যার আগের ঘটনা। পরের কয়েকটি ঘটনা নিম্নরূপ-

এক : যখন ১৫ আগস্টের রক্তঝরা ভোর রাতে ধর্মপ্রাণ বাঙালী মুসলমানরা ‘হাইয়া আলাস্ সালাহ্’ এবং বাঙালী হিন্দুরা কাঁস-বাজানো নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা তখন ঐ খন্দকার মোশতাক আহমেদ ঐ ভোরেই ডালিম-রশীদ-জিয়া-নূরদের সহায়তায় রাজধানী ঢাকাস্থ বাংলাদেশ বেতার দখল করে নিজেকে রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করে এবং বারংবার বলতে থাকে, স্বৈরাচার সরকারকে উৎখাত করা হয়েছে। উক্ত তারিখ থেকে সামরিক শাসন জারি করা হয় এবং সেই শাসনের প্রধান শাসক হন প্রেসিডেন্ট মোশতাক নিজে।

দুই : এর মাত্র পাঁচ সপ্তাহ পর ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর খন্দকার মোশতাক প্রেসিডেন্ট হিসেবে ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’ নামক একটি আইন (অধ্যাদেশ নং ৫০) জারি করেন। এতে বলা হয়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সম্পাদিত সামরিক অভ্যুত্থানের (Military Insurrection) পরিকল্পনা, প্রস্তুতি, বাস্তবায়নসহ যে কোন কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের ক্ষমা করা হলো। জড়িতদের এ ভূমিকার জন্য (তথা প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ নিহত অন্যদের হত্যাকাণ্ডের জন্য) কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল, মার্শাল ল’ কোর্ট বা কোন কর্তৃপক্ষের নিকট/মাধ্যমে অভিযোগ তোলা যাবে না বলেও ব্যবস্থা নেয়া হয়।

তিন : ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল যখন দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন সেনাশাসক জিয়াউর রহমান, তখন পার্লামেন্টে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের ৫ম সংশোধনী সাধন করা হয়। এর দ্বারা উক্ত ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’কে সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও বৈধতা দেয়া হয়। অর্থাৎ, অর্ডিন্যান্সটি পার্লামেন্টে সর্বোচ্চ আইন দ্বারা সমর্থিত এবং অনুমোদিত হলো। এর ফল কী দাঁড়াল? ফল হলো এই যে, খন্দকার মোশতাক যে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ১৬ জনকে নির্বিচারে হত্যার বৈধতা দেন, সেটিকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিলেন সেনাশাসক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। খামের ওপর পোস্ট অফিসের সীল দেয়ার মতো আর কি!

চার : ঐ যে ফারুক-ডালিম-রশীদ-নূর গংয়ের সদস্যরা, এদের প্রত্যেকে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর প্রেসিডেন্ট মোশতাক ও প্রেসিডেন্ট জিয়া-কর্তৃক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূত/এম্বাসাডর বা ঐ জাতীয় উচ্চ পদে চাকরি পান। আনন্দ চিত্তে তাঁরা দেশ ছাড়ার সুযোগ পান। বিদেশে সুখে থাকার নিশ্চয়তা পান।

পাঁচ : খালেদা জিয়াকে আমি ১৯৮১ সাল থেকে জানি। কখনই তার জন্মদিন পালনের সংবাদ শুনিনি। এমনকি যখন তিনি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হিসেবে দেশের ‘ফার্স্ট লেডি’, তখনও না। তিনি প্রধানমন্ত্রী হবার পর হঠাৎ করেই ১৫ আগস্ট তার জন্মদিন ঘোষিত হয়। তিনি ও তার দলের লোকেরা নির্লজ্জের মতো মানুষের রক্তে ভেজানো কেক কেটে ও খেয়ে ‘শুভ জন্মদিন’ পালন করতে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে তার জন্মদিন ওটা নয়। তার পরীক্ষা পাশের সনদ ও পাসপোর্ট তা-ই বলে।

যাঁরা ধৈর্য সহকারে কথাগুলো পড়লেন বা জানলেন তাদের নিকট বিনীত নিবেদন, ভাবুন তো, রক্ত-স্নাত শোকাবহ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের, আগের ও পরের এ ঘটনাগুলো দিয়ে কি কি বিষয় অনুমিত, প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়।

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ ও সাবেক ডিন, আইন অনুষদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া

সৌজন্যেঃ দৈনিক জনকণ্ঠ