দুই বছরে ১৪৪ কথিত বন্দুকযুদ্ধে খুন ২০৪

টেকনাফ পুলিশের হাতে মানুষ হত্যার লাইসেন্স!

প্রকাশিত: ১০:৩০ অপরাহ্ণ , আগস্ট ৩, ২০২০

মাদক নির্মূলের নামে যেন টেকনাফ পুলিশের হাতে দেয়া হয়েছে মানুষ হত্যার লাইসেন্স! গত দুই বছরে শুধু টেকনাফে ১৪৪ টি কথিত বন্দুকযুদ্ধের সাজানো ঘটনা ঘটেছে। আর এসব বন্দুকযুদ্ধের নামে ওসি প্রদীপ কুমার ২০৪ জন মানুষ গুলি করে হত্যা করেছে।

সর্বশেষ ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফে পুলিশের বেপরোয়া গুলিতে নিহত হয়েছেন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এই ঘটনায় দেশজুড়ে এখন তোলপাড় চলছে।

এ ঘটনা নিয়ে গঠিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি এবং সেনা বাহিনীর নিজস্ব তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে বলে জানা গেছে ।

তদন্ত চলা অবস্থায় রবিবার রাতে সেনা কর্মকর্তাকে সরাসরি গুলি বর্ষনকারী সেই এসআই লিয়াকত সহ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ২০ জন পুলিশকে প্রত্যাহার করা হলেও অভিযোগ উঠেছে হত্যার নির্দেশদাতা টেকনাফ থানার আলোচিত ও বির্তর্কিত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ এখনো বহাল তবিয়তে স্বপদে বহাল রয়েছে।

এছাড়া প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) একটি টিম মাঠ পর্যায়ে তদন্ত শেষে সদর দপ্তরে একটি রিপোর্ট জমা দিয়েছে বলেও জানা গেছে। ইতোমধ্যে সেই রিপোর্ট দেশ বিদেশ থেকে প্রচারিত কয়েকটি অনলাইনে প্রকাশ হয়েছে।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে জানাগেছে, থানার ওসির নির্দেশ ছাড়া কোন অফিসার গুলি চালাতে পারে না। ঘটনার প্রতক্ষ্যদর্শী বিবরণ থেকে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন। গুলি করার আগে এসআই লিয়াকত তার মোবাইল ফোন থেকে ওসি প্রদীপের সাথে কথা বলে তার নির্দেশেই সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খাঁনকে গাড়ি থেকে নামিয়ে কোন কথা বলতে না দিয়েই সরাসরি বুকে পর পর তিনটি গুলি করেন।

এদিকে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) গোপন তদন্ত প্রতিবেদনে স্থানীয় টেকনাফ থানা পুলিশের বিরুদ্ধে সন্দেহভাজন অপরাধীদের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, “হত্যার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকা পুলিশ একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যায়ও কোনরূপ দ্বিধা করেনি।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও স্থানীয়দের ভাষ্যমতে টেকনাফের বির্তর্কিত ওসি প্রদীপের কথিত ক্রসফায়ারের নামে বিচার বর্হিভূত গণহত্যার কারণে পুলিশ যে কাউকে হত্যা করতে দ্বিধাবোধ করছে না। যার শেষ পরিণতি মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খাঁন।

অভিযোগ রয়েছে ২০১৮ সালের ১৯ অক্টোবর ওসি প্রদীপ টেকনাফে যোগদান করেন। এর পর থেকে গত দুই বছরে শুধু টেকনাফে ১৪৪টি কথিত বন্দুক যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে। আর এসব বন্দুকযুদ্ধের নামে ওসি প্রদীপ কুমার ২০৪জনকে গুলি করে হত্যা করেছে।

মূলত ইয়াবা ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীর ট্যাগ লাগিয়ে নিরীহ এবং অনেক ধনাঢ্য লোকজনকে থানায় ধরে নিয়ে মোটা অংকে অর্থের জন্য চাপ প্রয়োগ করে। যারা টাকা দিতে পারে না তারাই ভাগে জুটে ক্রসফায়ারের নামে নির্মম মৃত্যু। অভিযোগ আছে অনেকের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নিয়ে খুশী হতে না পেরে তাদের বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে তাদেকে খুন করেছে ওসি প্রদীপ।

জানাগেছে মাদকের বিরুদ্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জিরো টলারেন্সকে অপব্যবহার করে টেকনাফের ওসি প্রদীপ কুমার দাশ মেতে উঠেছেন বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্যে। বিএনপির আমলে প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর আশির্বাদে চাকুরীতে যোগ দিয়ে নিজের কুকীর্তি আড়াল করতে তিনি এখন রূপ পাল্টিয়ে হয়েছেন মহা আওয়ামী লীগ।

এদিকে মেজর (অবঃ) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খাঁন হত্যার ঘটনায় কক্সবাজার পুলিশ যেই বিবৃতি দিয়েছে, সেটির সঙ্গে ডিজিএফআইর করা মাঠ প্রতিবেদনটি সাংঘর্ষিক। পুলিশ দাবি করেছে, পুলিশের একটি বহর মেজর (অবঃ) সিনহার গাড়ি তল্লাশি করতে চাইলে তিনি নিজের ব্যক্তিগত অস্ত্র বের করেন। এ সময় আত্মরক্ষার জন্য পুলিশ গুলি করে। এটি অনেকটা পুলিশের ওই বেপরোয়া খুনকে আড়াল করারই শামিল।

তবে প্রত্যক্ষদর্শী ও ভিডিও ফুটেজের বরাত দিয়ে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, মেজর (অবঃ) সিনহা তার অস্ত্র বের করেননি। যখন তাকে গাড়ি থেকে বের হতে বলা হয়, তখন তিনি হাত উঁচু করে বের হন। এরপর কোনো বাতচিত ব্যতিরেকেই তাকে গুলি করে হত্যা করেন পুলিশবহর প্রধান এসআই লিয়াকত। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও ৪৫ মিনিট ধরে মেজর (অবঃ) সিনহাকে হাসপাতালে না নিয়ে ঘটনাস্থলেই ফেলে রাখে পুলিশ, “পুলিশ কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করে মৃত্যু নিশ্চিত করে মৃতদেহ হাসপাতালে আনা একটি পৈশাচিক আচরণের বহিঃপ্রকাশ।”

এর আগে শনিবার রাতে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলে তদন্ত শেষে একটি প্রেসবিজ্ঞপ্তি দেয়া হয় সংবাদ মাধ্যমকে। ঘটনার ব্যাপারে সেনাবাহিনীর বিবরণের সাথে গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদনের মিল পাওয়া গেছে।

ডিজিএফআই’র প্রতিবেদনের “মন্তব্য” বিভাগে বলা হয় যে, টেকনাফ পুলিশের মধ্যে মাদক নির্মূলের নামে এক ধরণের “হত্যার প্রতিযোগিতা” বিদ্যমান। এতে বলা হয়, “এই প্রতিযোগিতা অনেক অনাকাঙ্খিত ঘটনার জন্ম দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও আরও দিবে বলে ধারণা করা যায়।” ইনকিলাব