কুরবানীর জানা অজানা অধ্যায়

প্রকাশিত: ১২:০৫ অপরাহ্ণ , জুলাই ২৮, ২০২০

মো. বাকী বিল্লাহ খান পলাশ

উর্দূ ও ফারসী ‘কুরবানী’ শব্দের আরবী প্রতিরুপ ‘কুরবান’। যার অর্থ ‘নৈকট্য’। পারিভাষিক অর্থে কুরবানী হচ্ছে এমন একটি মাধ্যম যা দ্বারা মহান আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জিত হয়। আর প্রচলিত অর্থে ঈদুল আযহার দিন আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের জন্য শরীয়তের নির্দেশনা মোতাবেক পশু যবহ করাই হচ্ছে কুরবানী। যা একজন সামর্থবান মুসলমানের জন্য অবশ্য পালনীয় ইবাদত। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ তাআলা পবিত্র কুরআন কারীমে বলেন, ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ছালাত আদায় কর এবং কুরবানী কর’ (সূরা কাওছার, ১০৮/২)। হাদীস শরীফে এসেছে, আবু হুরায়রা (রা.) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছা.) এরশাদ করেন, ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানী করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয় (ইবনু মাজাহ, আলবানী-ছহীহ ইবনু মাজাহ, হাদিস নং. : ২৫৩২)। কিন্তু কুরবানী ও কুরবানীর দিনটিকে ঘিরে আমরা এমন কিছু কাজ করি যার দলিল না কুরআনে খুঁজে পাওয়া যায়, না হাদীসে। এমন কিছু বিষয় নিয়েই নি¤েœ আলোচনা করা হলো।

ক. রাসূলুল্লাহ (ছা.) এর পক্ষ থেকে কুরবানী করা :
রাসূল (ছা.) এর পক্ষ থেকে কুরবানী দেয়া কি জায়েয? এ প্রশ্নটির উত্তরে অনেকেই শুধু জায়েযই বলেননি ববং উত্তম বলেছেন। এর স্বপক্ষে তারা একটি হাদীসও পেশ করেন তাহলো, হযরত হানাশ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আমি হযরত আলী (রা.) কে দেখলাম তিনি দু‘টি বকরী কুরবানী করলেন, আমি তাকে বললাম, এটি কি?। আপনার উপরতো একটি আবশ্যক ছিল কিন্তু আপনি দু’টি করলেন কেন? তিনি বললেন, নিশ্চয় রাসূল (ছা.) আমাকে অসিয়ত করেছেন তার পক্ষ থেকে করবানী করতে। এ কারণে আমি তার পক্ষ থেকে কুরবানী করছি’ (তিরমিযী)। মূলত এই হাদিসটিকে ইসলামী স্কলারগণ সহি নয় বলেছেন। এ সম্পর্কে মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব তার ‘মাসায়েলে কুরবানী ও আক্বীক্বা’ গ্রন্থের ২৩ পৃষ্ঠায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন ‘তিরমিযী শরীফের যে হাদীসটি মিশকাতে (হা/১৪৬২) এসেছে, তা নিতান্তই যঈফ। উপরন্তু হযরত আবু বকর (রা.), হযরত ওমর (রা.)সহ কোন সাহাবীই রাসূল (ছা.) এর পক্ষ থেকে কুরবানী দিয়েছেন মর্মে কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না।

খ. মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী দেয়া :
মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী দেয়া জায়েয বা ইসলাম সমর্থিত কিনা তারও জবাব দেয়া হয়েছে ‘মাসায়েলে কুরবানী ও আক্বীক্বা’ গ্রন্থের ২৪ পৃষ্ঠায়। সেখানে বলা হয়েছে, মৃত ব্যক্তিগণ পবিবারের সদস্য থাকেন না আর যেহেতু একজন মৃতের উপর কখনোই শরীয়তের নির্দেশনা প্রযোজ্য হয় না। সুতরাং কুরবানী হতে হবে জীবিত ব্যক্তি ও পরিবারের পক্ষ থেকে। তাছাড়া কোন ছাহাবীই মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী দিয়েছেন বলে জানা যায় না। এক্ষেত্রে যদি কেউ মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করেন, তবে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলেন, তাকে সবটুকুই ছাদাক্বা করে দিতে হবে (তিরমিযী, হাদীস নং. : ১৫২৮)।

গ. ঈদের দিন কবর জিয়ারতকে অপরিহার্য করে নেয়া :
করব জিয়ারত করা শরীয়ত সমর্থিত। কিন্তু ঈদের দিনে কবর জিয়ারত করাকে অধিক ছোয়াবের মনে করা বা কবর জিয়ারতের জন্য ঈদের দিনকেই নির্দিষ্ট করে নেয়ার কোন সুযোগ ইসলামে নেই। কেননা ঈদের দিনের আমলগুলোর মধ্যে কবর জিয়ারত কথাটি উল্লেখ নেই। তাছাড়া এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, ‘তোমরা আমার কবরে ঈদ উদ্যাপন করবে না বা ঈদের স্থান বানাবে না (আবু দাউদ, হাদীস নং. : ২০৪২)।

ঘ. কুরবানীর বদলে তার মূল্য ছাদাক্বা করাকে অধিক ছোয়াবের মনে করা :
অনেকেই প্রাণী কুরবানী করার পরিবর্তে তার মূল্য ছাদাক্বা করাকে অধিক ছোয়াবের কাজ মনে করেন। যা মোটেও ঠিক নয়। কেননা আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে রক্ত প্রবাহিত করাই হচ্ছে এখানে মূল ইবাদত। সুতরাং কেউ যদি কুরবানীর বদলে তার মূল্য ছাদাক্বা করতে চান, তবে তিনি সুস্পষ্টভাবে মুহাম্মদী শরী‘আতের প্রকাশ্য বিরোধিতা করলেন (মাজমূ, ফাতাওয়া ইবনে তায়মিয়াহ, ২০/৩০৪)। এ সম্পর্কে ইমাম আহমাদ (রা.) বলেন, কুরবানী ছাদাক্বার চাইতে উত্তম, যেমন ঈদের ছালাত অন্য সকল নফল ছালাতের চাইতে উত্তম (তাফসীরে কুরতুবী-সূরা ছাফফাত, পৃষ্টা : ১০৮)।

ঙ. কুরবানীর সময় শরীকদের নাম অবশ্যই মুখে উচ্চারণ করা :
মা আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল (ছা.) বললেন, আল্লাহ্র নামে কুরবানী করছি, হে আল্লাহ্ তুমি এটি কবুল কর মুহাম্মাদের পক্ষ হ’তে, তার পরিবারের পক্ষ হ’তে ও তার উম্মতের পক্ষ হ’তে। এরপর উক্ত দুম্বা দ্বারা কুরবানী করলেন (মুসলিম, মিশকাত, হাদিস নং. : ১৪৫৪)। সুতরাং উপর্যুক্ত হাদিস থেকে এটা বুঝা যায় যে, কুরবানীর পশু জবাই করার পর তা কবুলের জন্য আল্লাহ্র দরবারে দু’আ করা মুস্তাহাব। কিন্তু কুরবানীর পরে এই মুস্তাহাব আমলটি করতে গিয়ে সাত শরীকদের নাম বিশেষকরে পুরুষ হলে তার পিতার নাম আর মহিলা হলে তার স্বামীর নামসহ হুজুরকে দিয়ে অপরিহার্যভাবে যেভাবে মুখে উচ্চারণ করে পড়ানো হয় অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় এটা যেন কুরবানীর একটি অপরিহার্য অংশ যা না করা হলে কুরবানীই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। অথচ তা মুখে উচ্চারণ না করা হলেও কুরবানী দাতা সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ তাআলা পূর্ণ জ্ঞাত আছেন।

চ. কুরবানীর দিন হাস, মুরগী যবহ না করা :
অনেকেই এ বিশ্বাস পোশন করেন এবং বলেন যে, কুরবানীর দিন হাস-মুরগী বা দো পায়া জীব যবহ করা যাবে না। কারণ হিসাবে তারা বলে থাকেন যে, হযরত ইসমাঈল (আ.) একজন মানুষ ছিলেন আর মানুষ হিসাবে তিনি ছিলেন দুপায়ের অধিকারী। সুতরাং হাস-মুরগী যবহ করলে তা ইসমাঈল (আ.) এর দিকেই ধাবিত হয়। যা কুসংস্কার ছাড়া আর কিছুই নয়।

ছ. এছাড়াও কুরবানীর ছোয়াব সম্পর্কে প্রচলিত জাল হাদীস:
১. কিয়ামতের দিন কুরবানীর জানোয়ার তার শিং, পশম ও খুরসহ অবশ্যই হাজির হবে (যয়ীফ, যয়ীফ তারগীব নং. : ৬৭১)।
২. কুরবানীর প্রথম বিন্দু রক্তের সাথে পূর্বেকার সমস্ত গোনাহ মাফ হয়ে যায়। কুরবানীর পশুটিকে তার রক্ত ও গোশতসহ দাঁড়িপাল্লায় ৭০ গুণ ভারী করে দেয়া হবে (হাদীসটি জাল, যয়ীফ তারগীব নং. : ৬৭৪, ৬৭৫)।
৩. কুরবানী পিতা ইবরাহীমের সুন্নত। তার প্রতিটি লোমের পরিবর্তে রয়েছে একটি করে নেকী (হাদীসটি জাল, যয়ীফ তারগীব নং. : ৬৭২)।
৪. তোমরা তোমাদের কুরবানীকে মোটা-তাজা কর। কারণ তা তোমাদের পুলসিরাত পারের সওয়ারী হবে (অতি দূর্বল, সিলসিলাহ যয়ীফাহ নং. : ১২৫৫)।

ঈদ নিয়ে কিছু কথা :
‘ঈদ মোবারক’ বলা :
ঈদ উপলক্ষে শুভেচ্ছা বিনিময় করা জায়েয। সাধারণত আমরা এক্ষেত্রে ‘ঈদ মোবারক’ বলি। কিন্তু সাহাবিগণ পরস্পর সাক্ষাতে ‘তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’ (অর্থ : আল্লাহ্ আমাদের ও আপনার ভালো কাজগুলো কবুল করুন (আল-মুগনী ২/২৫৯ পৃষ্ঠা, ফিক্বহুস সুন্নাহ, ১/৩১৫ পৃষ্টা) বলতেন। সুতরাং ‘ঈদ মোবারক’ বললেও সাথে সাথে উপরি-উক্ত দু’আটি পড়া উচিত।

মুসাফাহা মুআনাকা করা :
আমরা ঈদের দিন মুসাফাহা মুআনাকা করি। সাহাবীগণ পরস্পর সাক্ষাতে মুসাফাহা এবং সফর থেকে ফিরে এলে মুআনাকা করতেন। তবে ঈদগাহে বা ঈদের দিন সাক্ষাত হলে মুসাফাহা ও মুআনাকা করতেই হবে এটা মনে করার কোন কারণ নেই । ঈদের দিন সুন্নত মনে না করে বা কোন প্রকারের সওয়াবের আশা না করে এটা করা যেতে পারে। কেননা কুরআন হাদিসে ঈদের দিন মুসাফাহা মুআনাকা করার কোন দলীল খুঁজে পাওয়া যায় না।

ঈদ ও আক্বীক্বা :
ঈদ ও আক্বীক্বা একই দিনে হলে সম্ভব হলে দু’টিই করবে। আর দ’ুটি করা সম্ভব না হলে আক্বীক্বা প্রাধান্য পাবে কেননা জন্মের সাত দিনে আক্বীক্বা করাই হাদীস দ্বারা প্রমানিত এবং যা জীবনে কেবলমাত্র একবারই পাওয়া যায় (তিরমিযী, আবু দাউদ, মিশকাত, হাদীস নং. : ৪১৫৩)।

ঈদ ও জুমু‘আ :
জুমু‘আ ও ঈদ একই দিন হ’লে ঈদের ছালাত আদায় করার পর জুমু‘আর ছালাত আদায় করা ইচ্ছাধীন বিষয়। তবে জুমু‘আর ছালাত আদায় না করা হলে যোহরের ছালাত আদায় করতে হবে। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) এর যুগে ঈদ ও জুমু‘আ একই দিন হ’লে তিনি সকলকে নিয়ে ঈদের ছালাত আদায় করতেন। অতঃপর বলতেন, এক্ষণে জুমু‘আ পড়তে আসা বা না আসা তোমাদের ইচ্ছাধীন বিষয়। তবে আমরা জুমু‘আ পড়ব’ (আবু দাউদ, হাদীস নং. : ১০৭৩)।

আল্লাহ্ তাআলা আমাদের সঠিক ও সত্যটি জানার ও আমল করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

সহায়ক গ্রন্থ ও উৎস সমূহ :
১. মাসায়েলে কুরবানী ও আক্বীক্বা – মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
২. ‘আত-তাহরীক’ ফৎওয়া সংকলন ১৮ তম বর্ষ
৩. আলোচিত রাত-দিন – শাইখ আবদুর রহমান বিন মুবারক আলী
৪. কুরবানীর বিধান – আব্দুল হামীদ ফাইযী আল-মাদানী
৫. কুরবানী সম্পর্কিত ৫২টি অতি গুরুপ্তপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর, (লিংক : যঃঃঢ়ং://িি.িুড়ঁঃঁনব.পড়স/ধিঃপয?া=রকযমঘডুুটখ৪)
৬. নবী (ছা.) এর নামে কুরবানী দেয়ার হাদীসটির অবস্থা কেমন (লিংক : যঃঃঢ়ং://িি.িুড়ঁঃঁনব.পড়স/ধিঃপয?া=২৩৪ু৭কডণওথ)ি

: ঢ়ধষধংযশযধহ৬৫@মসধরষ.পড়স., :চধষধংযশযধহ