বিশ্ব শিক্ষক দিবসে অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফা’র বিশেষ প্রবন্ধ

প্রকাশিত: 9:23 PM , October 5, 2026

বিশ্ব শিক্ষক দিবস ও আমার উপলব্ধি: কোভিড-পরবর্তী শিক্ষার সংকট

আজ ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। দিবসটি কোনো বাংলাদেশি আইনে নয়, আন্তর্জাতিক আইনে পালিত হয়। ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর ইউনেস্কো এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) প্যারিসে শিক্ষকদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় একটি ঐতিহাসিক দলিল স্বাক্ষর করে। নাম – Recommendation concerning the Status of Teachers, 1966। এই সুপারিশে ১৪৫টি ধারায় বলা আছে শিক্ষকের নিয়োগ, বেতন, প্রশিক্ষণ, চাকরির নিরাপত্তা কেমন হবে। ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম সাধারণ অধিবেশনে ৫ অক্টোবরকে World Teachers’ Day হিসেবে ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ এটি কোনো উৎসব নয়, এটি শিক্ষকের অধিকার আদায়ের আইনি দলিলের জন্মদিন।

শিক্ষক কারা?

সাধারণ অর্থে যিনি শিক্ষা দেন, তিনিই শিক্ষক। কিন্তু আইনি সংজ্ঞা ভিন্ন। ইউনেস্কোর মতে, “যিনি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাদান ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে নিযুক্ত।” বাংলাদেশ শিক্ষা নীতি ২০১০ অনুযায়ী, শিক্ষক হলেন জাতি গঠনের প্রধান কারিগর।

আমার ৩৪ বছরের অভিজ্ঞতায় শিক্ষক তিনি – ক) যিনি জানেন, খ) যিনি জানাতে জানেন, গ) যিনি মানুষ হতে শেখান।

শিক্ষকের যোগ্যতা: দক্ষ শিক্ষক হতে কী লাগে?

আমি দেখেছি সার্টিফিকেট দিয়ে শিক্ষক হওয়া যায়, কিন্তু দক্ষ শিক্ষক (Efficient Teacher) হতে ৪টি যোগ্যতা লাগে।

১. শারীরিক যোগ্যতা: ৫০ মিনিট একটানা কথা বলা, ৪০ জন শিক্ষার্থীর দৃষ্টি ধরে রাখার জন্য স্পষ্ট উচ্চারণ, সুস্থ কণ্ঠ, পরিচ্ছন্ন পোশাক ও প্রাণবন্ত উপস্থিতি লাগে।
২. একাডেমিক যোগ্যতা: বিষয় জ্ঞান না থাকলে শিক্ষার্থী ১০ মিনিটেই ধরে ফেলে আপনি কেমন শিক্ষক।
৩. জ্ঞানগত যোগ্যতা: কীভাবে পড়ালে শিক্ষার্থী বুঝবে, শিশু মনোবিজ্ঞান, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুকে বোঝা – এগুলো জানতে হয়।
৪. প্রয়োগমূলক যোগ্যতা (Applied Efficiency): এখানেই ৯০% শিক্ষক ব্যর্থ হন। শ্রেণি ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি প্রয়োগ, হাতে-কলমে শেখানো এবং শিক্ষার্থীর প্রতি সহানুভূতি (EQ) – এটাই আসল দক্ষতা।

শিক্ষকের দায়িত্বও আছে – শিক্ষার্থীর প্রতি মূল্যবোধ তৈরি করা, প্রতিষ্ঠানের প্রতি সময়ানুবর্তিতা, সমাজের প্রতি কুসংস্কার দূর করা এবং নিজের প্রতি আজীবন শেখা।

বর্তমান শিক্ষাদানের পরিবেশে কিছু সমস্যা

কোভিড-১৯ এর পর থেকে শিক্ষাদানের পরিবেশে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে, যা আমার ৩৪ বছরের শিক্ষকতা জীবনে দেখিনি।

শিক্ষার্থীর হার কমে যাচ্ছে, বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতির হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে শিক্ষার্থীদের আচরণে। শ্রেণিকক্ষে সহপাঠীদের সাথে বন্ধুত্ব নেই, বন্ধুত্ব এখন প্রতিষ্ঠানের বাইরে সমবয়সী বা বড়দের সাথে, মোবাইল ফোনে, ফেসবুকে আসক্ত। ফলে শিক্ষার্থীরা কিশোর গ্যাং, মাদকাসক্তি, ইভটিজিং, হত্যা এবং ধর্ষণের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অসৎ আচরণ বাড়ছে। বড়দের মান্য করা এবং ছোটদের স্নেহ করা – আমাদের এই প্রাচীন রীতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের সাথে মিথ্যে কথা বলে, অনেক সময় অভিভাবকরাই এতে উৎসাহিত করেন।

কোভিড-১৯ এর কারণে দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দুই বছরের মেধা শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই মেধা শূন্যতার কারণে শিক্ষার্থীরা শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। তারা এখন শিখতে চায় না, পরিশ্রম করতে চায় না। তারা নকল করতে চায়, শর্ট সিলেবাস চায়, অটো পাস চায়, সহজ প্রশ্ন চায়। শিক্ষার প্রতি এই অনাগ্রহ একটি প্রজন্মের জন্য অশনি সংকেত।

কোভিড-১৯ এ কতদিন বন্ধ ছিল?

আমাদের দেশে কোভিড মহামারির সময় টানা ৫৪৩ দিন (প্রায় ১৮ মাস) শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই বন্ধ পর্যায়ক্রমে বাড়িয়ে ২০২১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বহাল রাখা হয়। মূলত সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ এবং ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের তীব্র প্রকোপের কারণে সরকার বারবার ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়।

দ্বিতীয় দফায় ২০২২ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আরও ৩২ দিন বন্ধ ছিল। সব মিলিয়ে প্রায় ৫৭৫ দিন।

ইউনেস্কো ও ইউনিসেফের বৈশ্বিক তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় স্কুল বন্ধ রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। যেখানে বিশ্ব গড় ছিল ২২ সপ্তাহ, সেখানে বাংলাদেশে পূর্ণ বন্ধ ছিল ৬৩ সপ্তাহ। এই সময়ে ৩ কোটি ৯০ লাখ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্বব্যাংকের মতে, গড়ে ১.৫ বছরের শিখন ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

আমি ২০২১ সালের ১৭ মে ফেসবুকে লিখেছিলাম, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ক্ষতি প্রজন্মকে বহন করতে হবে” – যা পরে অনলাইন ৭১ পত্রিকায় ছাপা হয়। আজ তার প্রমাণ দেখছি।

বাংলাদেশের শিক্ষকদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

১৯৯৩ সালে আমি যখন শিক্ষকতা শুরু করি, বেতন ছিল ১২০০ টাকা। আজ ১২ লাখ MPO ভুক্ত শিক্ষক ১২,৫০০-৩৫,০০০ টাকায় চাকরি করেন। ফলে ৩টি সংকট – অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পেশাগত। NTRCA, MPO, বদলি, অবসর বোর্ড – ফাইলের পেছনে ৪০% সময় নষ্ট।

তবুও ভবিষ্যৎ আছে। আগামীতে যে শিক্ষক দক্ষতা ভিত্তিক শিক্ষা ও প্রযুক্তি জানবেন, তার চাহিদা দেশে ও বিদেশে সবচেয়ে বেশি হবে। বিশেষ করে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের শিক্ষক হিসেবে। ইউনেস্কোর ২০২৪ সালের বৈশ্বিক শিক্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্বে আরো প্রায় চার কোটি ৪০ লক্ষ শিক্ষক প্রয়োজন। তার জন্য কি আমরা প্রস্তুত?

ফিনল্যান্ডে সবচেয়ে মেধাবীরা শিক্ষক হয়, আমাদের দেশে বাধ্য হয়ে হয়। এই ধারা না বদলালে স্মার্ট বাংলাদেশ সম্ভব নয়।

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমার একটাই চাওয়া – শিক্ষককে ফুল নয়, তার প্রাপ্য সম্মান ও নিরাপত্তা দিন। শিক্ষক বাঁচলে, শিক্ষা বাঁচবে। শিক্ষা বাঁচলে, দেশ বাঁচবে।

লেখক
মোঃ গোলাম মোস্তফা
অধ্যক্ষ, রাজুর বাজার কলেজিয়েট স্কুল, নেত্রকোণা
ইমেইল: [email protected]

Loading