আন্তর্জাতিক দিবস আজ

দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হলেও পিছিয়ে আদিবাসীরা

প্রকাশিত: ১২:০৩ অপরাহ্ণ , আগস্ট ৯, ২০২২

শরীফুল ইসলাম

গত একযুগে সর্বক্ষেত্রে দেশের ব্যাপক উন্নয়ন হলেও আদিবাসীরা এখনও পিছিয়ে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তেমন অগ্রসর হতে না পরায় সুবিধাবঞ্চিত এই জনগোষ্ঠীর শিক্ষার হার খুবই কম, দারিদ্র্যের হারও বেশি। অর্থনৈতিকভাবে তারা রয়েছে চরম সঙ্কটে। তাই ভাল নেই অধিবাসীরা। এরকম পরিস্থিতিতে আজ ৯ আগস্ট পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। এবার দিবস পালনের প্রতিপাদ্য হচ্ছে-‘ঐতিহ্যগত বিদ্যা সংরক্ষণ ও বিকাশে আদিবাসী নারী সমাজের ভূমিকা’।

আদিবাসী নিয়ে কাজ করেন এমন বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছেন, সহজ সরল প্রকৃতির মানুষ আদিবাসীরা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে। তাদের ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ নানামুখী সমস্যা রয়েছে। তাদের আয়-রোজগারেরও তেমন সুযোগ সুযোগ-সুবিধা নেই। সুবিধাবঞ্চিত এই জনগোষ্ঠী এখন চরম আর্থিক সঙ্কটে রয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রেও তারা পিছিয়ে।

এছাড়া তাদের জায়গা-জমি কৌশলে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। তাদের বনজসম্পদও বেহাত হয়ে যাচ্ছে। এসব কারণে আদিবাসীরা ভাল নেই। তাই তারা চায় আদিবাসীদের উন্নয়নে সরকার সুদৃষ্টি দিয়ে বিশেষ উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করুক।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফেরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং জনকণ্ঠকে জানান, সার্বিকভাবে আদিবাসীরা ভাল নেই। চরম অর্থনৈতিক সঙ্কট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে আদিবাসীরা। এখনও তাদের ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আদিবাসীদের জন্য সরকারের বিশেষ উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ নেয়া উচিত। আদিবাসীরা আগে থেকেই গরিব ও সুবিধাবঞ্চিত। এখনও তারা চরম অর্থনৈতিক সঙ্কটে।

তিনি বলেন, আমাদের হিসেব মতে দেশে আদিবাসী জনসংখ্যা হওয়ার কথা প্রায় ৩০ লাখ, কিন্তু সরকারের সর্বশেষ শুমারিতে দেখা গেছে প্রায় সাড়ে ১৬ লাখ, যা ২০১১ সালের শুমারিতে যা ছিল তার কাছাকাছি। এই হিসেবে গড়মিল রয়েছে।

আদিবাসী দিবস পালনের লক্ষ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের সমস্যাগুলোর ওপর মনোযোগ আকর্ষণ ও তাদের অধিকার রক্ষা ও উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করা। তাই এ দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অধিকারবঞ্চিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকেরা অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে নামে। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনধারা, মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার ও তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি তথা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করে।

বিশ্বের ৯০টি দেশে বসবাসরত ৫ সহস্রাধিক আদিবাসী জনজাতি মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৫ কোটি। এদের পরিচয় বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী ও রংপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা ও বগুড়া জেলায় সাঁওতাল, শিং, ওঁরাও, মুন্ডারি, বেদিয়া মাহাতো, রাজোয়ার, কর্মকার, তেলী, তুরী, ভুইমালী, কোল, কড়া, রাজবংশী, মাল পাহাড়িয়া, মাহালী ইত্যাদি জাতিগোষ্ঠী বসবাস করছে। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে (খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান) চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, মুরং, খিয়াং, লুসাই, পাংখোয়া,বম, খুমী ও চাক জনগোষ্ঠী বসবাস করে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক মিহির বিশ্বাস জনকণ্ঠকে জানান, আদিবাসীরা প্রকৃতির বন্ধু। তারা বিভিন্নভাবে প্রকৃতি সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করে। তারা প্রকৃতির কোন ক্ষতি না করে কৃষি কাজ করে এবং বনজ সম্পদের উন্ননে অবদান রাখে। কিন্তু এক শ্রেণীর মানুষ তাদের জায়গা-জমিন কৌশলে দখল করে নিয়ে যাচ্ছে। শতবর্ষী গাছসহ তাদের বনজসম্পদ কেটে কেটে নিয়ে যাচ্ছে।

এছাড়া ভূমি অফিসগুলোও কাগজপত্রের ত্রুটি দেখিয়ে আদিবাসীদের জায়গা-জমি রক্ষা করা থেকে বঞ্চিত করছে। এই সুযোগ নিয়ে প্রতারক চক্র তাদের বাস্তুচ্যুত করছে। এসব কারণে আদিবাসীরা এখন আতঙ্কে আছে। তারা ভাল নেই।

প্রতি বছর ৯ আগস্ট পালন করা হয় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। আদিবাসীদের অধিকার, মানবাধিকার ও স্বাধীনতাসংক্রান্ত বিষয়সমূহ নিয়ে ১৯৮২ সালের ৯ আগস্ট জাতিসংঘের আদিবাসী জনগোষ্ঠীবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। দিনটিকে স্মরণ করার জন্য জাতিসংঘ ১৯৯৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর ৯ আগস্টকে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এর পর থেকে বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালন করা শুরু হয়। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হয়ে আসছে ২০০৪ সাল থেকে।

এদিকে দেশে আদিবাসী জনসংখ্যা নিয়ে এই জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। তাদের মতে এবার জনশুমারিতে আদিবাসী জনসংখ্যা অনেক কম দেখানো হয়েছে। জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২২ অনুসারে দেশে ৫০টি জাতিসত্তার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর (আদিবাসী) জনসংখ্যা ১৬ লাখ ৫০ হাজার ১৫৯ জন। এর মধ্যে নারী ৮ লাখ ২৫ হাজার ৪০৮জন। আর পুরুষের সংখ্যা ৮ লাখ ২৪ হাজার ৭৫১ জন।

পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা কিছুটা বেশি। আর ৫০টি জাতিসত্তার মধ্যে চাকমাদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২২ এর প্রতিবেদন অনুসারে বিভাগ অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি আদিবাসী চট্টগ্রাম বিভাগে ৯ লাখ ৯০ হাজার ৮৬০ জন। এ ছাড়া রাজশাহী বিভাগে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৯২ জন, সিলেট বিভাগে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৪ জন, রংপুর বিভাগে ৯১ হাজার ৭০ জন, ঢাকা বিভাগে ৮২ হাজার ৩১১ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৬১ হাজার ৫৫৯ জন, খুলনা বিভাগে ৩৮ হাজার ৯৯২ জন এবং বরিশাল বিভাগে ৪ হাজার ১৮১ জন আদিবাসী রয়েছে।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক দীপায়ন খীসা জনকণ্ঠকে জানান, এবারের শুমারিতে যে আদিবাসী জনসংখ্যা দেখানো হয়েছে তা বিভ্রান্তিকর। কারণ, দেশে আদিবাসী জনসংখ্যা আরও বেশি। শুধু রাজশাহীর আদিবাসী সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সংখ্যাই ৩ থেকে ৪ লাখ। মনে হয় যারা শুমারি করেছে তারা মনোযোগী ছিলেন না। তিনি আরও জানান, বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি।

অথচ অধিবাসীরা অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় সমস্যাবহুল জীবনযাপন করছে। এ সমস্যা উত্তরণে সরকারের দৃশ্যমান ভূমিকা নেই। অবশ্য শুধু বর্তমান সরকার কেন, কোন সরকারের আমলেই আদিবাসীরা ভাল ছিল না।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মতো বাংলাদেশের আদিবাসীরাও প্রতিবছর যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন করে। এবারও এ দিবস পালন উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে। এ উপলক্ষে সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, এএলআরডি, ও কাপেং ফাউন্ডেশনসহ দেশের জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের ১৫টি সংগঠন ‘ঐতিহ্যগত জ্ঞান, ভূমি, বন ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে আদিবাসী নারীর ভূমিকা : চ্যালেঞ্জ ও আমাদের দায়িত্ব’ শীর্ষক এক সেমিনারের আয়োজন করে। সেমিনারে আদিবাসীদের সমস্যা ও সঙ্কট উত্তরণে করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।

খাগড়াছড়ির বাসিন্দা অধ্যাপক কম্প্রমিস চাকমা জানান, অধিবাসীরা জাতীয় উন্নয়নে অনেক অবদান রাখছে। সরকার সুদৃষ্টি দিলে আদিবাসীরা জাতীয় উন্নয়নে আরও বেশি অবদান রাখতে পারবে।- জনক্ন্ঠ