ভারতে গণপিটুনিতে ৩ বাংলাদেশি নিহত

‘কিছু চাই না, শুধু ভাইয়ের লাশটা দেখতে চাই’

প্রকাশিত: ৫:৪৪ অপরাহ্ণ , জুলাই ২১, ২০২০

নানু মিয়ার কান্না থামছেই না। ভাইয়ের ছেলেকে কোলে নিয়ে তিনি কথা বলছেন, আর কাঁদছেন। রক্তের বাঁধন ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদে বুকের ভেতর উথলে ওঠা এ কান্না থামানোর যে কোনো পথ নেই। পিকনিকে যাওয়ার কথা বলে পূর্বপরিচিত কয়েকজন ভাই ও ভাতিজাকে গত শনিবার (১৮ জুলাই) দুপুরে বাড়ি থেকে নিয়ে যান। রাতেই ফেরার কথা ছিল। তাঁরা ফেরেননি। ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। না ফেরায় খোঁজাখুঁজি করেন সম্ভাব্য সব স্থানে। গতকাল সোমবার দুপুরের দিকে খবর আসে- গত শনিবার মধ্যরাতে ভারতের করিমগঞ্জের পাথরকান্দি অঞ্চলের বগরিজান চা বাগান এলাকায় স্থানীয় নাগরিকদের হাতে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন তিন বাংলাদেশি। নিহত এই তিন বাংলাদেশির তালিকার মধ্যে রয়েছে নানু মিয়ার ভাই মো. নুনু মিয়া (২৮) ও ভাতিজা জুয়েল আহমদ (২৭)। বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পাওয়ার পর ছবি দেখে তাঁদের শনাক্ত করেন পরিবারের সদস্যরা।

মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার তালিমপুর ইউনিয়নের কাঞ্চনপুর গ্রামে তাঁদের বাড়ি। ভারতে গণপিটুনিতে নিহত দুজনই পেশায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক ছিলেন। আজ মঙ্গলবার নিহত নুনু মিয়ার ভাই নানু মিয়ার সঙ্গে তাঁদের বাড়িতে কথা হয়। তিনি গুছিয়ে কোনো কথাই বলতে পারছিলেন না। নানু মিয়া বলেন, আমি ভাইয়ের বাচ্চাইন তরে কিলা জবাব দিতাম। গাড়ি দেখলেউ তারা দৌড়াইয়া বারইত। আব্বা আইছন (বাড়ি চলে আসছে)। মজা লাইয়া (বাচ্চাদের মিষ্টিজাতীয় খাবার) আইছন। এখন তো আর তারা আব্বারে পাইতা নায়। আর কিছু চাই না, ভাইয়ের লাশটা দেখতে চাই। ভাই-ভাতিজার লাশটা যেন আমরা পাই।

নিহতদের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার দুপুরে পিকনিকের কথা বলে জুড়ী উপজেলার পূর্বপরিচিত তিন যুবক ছবুর, কামরুল, ডালিম নুনু মিয়া ও জুয়েল আহমদকে জুড়ী উপজেলায় তাঁদের বাড়িতে নিয়ে যান। যাওয়ার সময় চার্জ না থাকায় জুয়েল তাঁর মুঠোফোন বাড়িতে রেখে যান। এরপর এঁরা বাড়িতে আসেননি। শনিবার রাতে ফেরার কথা ছিল। ফোন বন্ধ পাওয়ায় সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করা হয়। পাওয়া যায়নি। রবিবার সকালে হঠাৎ ছবুর তাঁদের বাড়িতে এসে জানান, জুয়েল ও নুনু মিয়া তাঁদের ওখানে আছেন। জুয়েল বলেছেন তাঁর মোবইল দিতে। ছবুরের কথায় মোবাইল দেওয়া হয়। গতকাল সোমবার সকালে আরো একজন এসে জুয়েলের কথা বলে তাঁর কাপড় নিয়ে যান। তখনো জানান যে তাঁরা তাঁদের ওখানে আছেন। এরপর তিনি চলে যান। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে খবর আসে- জুয়েল ও নুনু মিয়া ভারতে স্থানীয়দের হাতে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। ছবি দেখে পরিবারের লোকজন নুনু মিয়া ও জুয়েল আহমদকে শনাক্ত করেন।

নিহত নুনু মিয়া ও জুয়েল মিয়া

নিহত জুয়েল মিয়ার ভাই রুবেল মিয়া বলেন, গত শনিবার পূর্বপরিচিত কয়েকজন তাদের বাড়ি থেকে জুড়ীতে নিয়ে যান। এর পর থেকে তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। সোমবার সকালে জানতে পেরেছি যে, তারা ভারতে গিয়ে খুন হয়েছে। তবে তারা কেন বা কী কারণে ভারতে গেছে কিছুই বলতে পারছি না।

স্থানীয় তালিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিদ্যুৎ কান্তি দাস তাদের পরিচয় নিশ্চিত করে বলেন, নিহত তিনজনের মধ্যে দুজনের বাড়ি তালিমপুর ইউপির কাঞ্চনপুর এলাকায়।

বড়লেখা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রতন দেবনাথ বিকেলে বলেন, ভারতে নিহত তিনজনের মধ্যে দুজনের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছি আমরা। তাদের বাড়ি বড়লেখায়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আমরা প্রতিবেদন আকারে বিষয়টি অবগত করেছি।

এ বিষয়ে বিয়ানীবাজার বিজিবি ৫২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল গাজী শহীদুল্লাহ বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে তিনজন মারা যাওয়ার খবর পেয়েছি। এর মধ্যে বড়লেখার তালিমপুর ইউনিয়নের দুজনের কথা শনেছি। আমরা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানাব। সেখান থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে, সে অনুযায়ী আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।