বাংলাদেশের মধ্যবিত্তরা আসলে কী চান?

প্রকাশিত: ৮:৫৯ পূর্বাহ্ণ , অক্টোবর ২৮, ২০২২

স্বপ্ন দেখা ও স্বপ্ন ভাঙার মিশেলে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের মধ্যবিত্তদের জীবন। একদিকে দারিদ্র্যের ভয়, অন্যদিকে উপরে ওঠার সিড়ি খোঁজাই তাদের প্রধান চরিত্র।

মধ্যবিত্তের সংজ্ঞায়ন এক লাইনে করা সম্ভব নয়। কিংবা অর্থনৈতিক প্যারামিটার দিয়েও এটাকে ভালোভাবে বোঝানো যাবে না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মধ্যবিত্ত শব্দটি যেমনি অর্থনৈতিক, একইভাবে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী ও লেখক রবার্ট কিয়োসাকি তার এক লেখায় বলেছেন, ধনীরা বাজারে নিজেদের অবস্থান জানান দেয় জেতার জন্য, মধ্যবিত্তরা সেখানে বাজারে অবস্থান করে যাতে তারা হারিয়ে না যায় অর্থাৎ টিকে থাকার জন্য।

বাংলাদেশে কারা মধ্যবিত্ত?

সোজাসাপ্টা পরিসংখ্যানমাফিক সংজ্ঞা দিতে গেলে, যাদের মাসিক আয় ৪০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকার মধ্যে, তাদের মধ্যবিত্ত হিসেবে গণ্য করা হয়। এ হিসাব ধরেই বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২১ সালের জরিপ থেকে জানা যায়, বর্তমানে দেশে ৪ কোটি মানুষ মধ্যবিত্ত, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ।

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) মতে, যাদের দৈনিক আয় ২ ডলার থেকে ২০ ডলারের মধ্যে তাদের মধ্যবিত্ত বলা হয়। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জি ও এসথার ডুফলো মধ্যবিত্তকে আবার দুভাগে ভাগ করেছেন। তাদের মতে, যাদের প্রতিদিনকার আয় ২ থেকে ৬ ডলার, তাদের নিম্নমধ্যবিত্ত ও যাদের ৬ থেকে ১০ ডলার তাদের উচ্চবিত্ত বলা যায়।

তবে মধ্যবিত্ত মানেই অর্থনীতির কাটখোট্টা হিসাব নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সামাজিক জীবনব্যবস্থার আলোকে দেখতে গেলে, যারা মূলত দরিদ্র হওয়ার ভয় ও উচ্চবিত্তদের জীবন পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে দোলাচলে ভোগে, তাদেরই মধ্যবিত্ত বলা যায়।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সের অধ্যাপক মহম্মদ মাইনুল ইসলাম সময় সংবাদকে বলেন, ‘মধ্যবিত্ত ধারণাটি অনেক ব্যাপক। একেক জায়গা থেকে এটিকে একেকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। আমরা পপুলেশন সায়েন্সে মধ্যবিত্ত শব্দটি ব্যবহার করি না। আমরা মূলত সমাজের মানুষকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করি আর এটা মূলত তাদের গৃহস্থালি সম্পদের ওপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে। এখানে মোটা দাগে কাদের মধ্যবিত্ত বলা যায়, তা আলোচনাসাপেক্ষ।’

মধ্যবিত্তরা কী চান?

এককথায় বলতে গেলে বাংলাদেশের মধ্যবিত্তরা সবদিক থেকে জীবনের নিরাপত্তা চান এবং তাদের জীবনের সিংহভাগ সময় কাটে এই নিরাপত্তা অর্জনের জন্য সংগ্রাম করে।

এ ব্যাপারে অর্থনীতির ভাষায় সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, আর্থিক ও জীবনগত নিরাপত্তা তাদের অগ্রাধিকারের সর্বাগ্রে।

বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা মঈনুল হাসান সময় সংবাদকে বলেন, ‘আমরা যারা মধ্যবিত্ত, তাদের বেশ কিছু স্বপ্ন থাকে। আমরা স্বপ্ন ও বাস্তবতার সঙ্গে সমান্তরালভাবে অবস্থান করি। যারা উচ্চ মধ্যবিত্ত, খোঁজ নিয়ে জানা যাবে, তার বাবা হয়তো নিম্নমধ্যবিত্ত ছিলেন। অনেক কষ্টে ছেলে-মেয়েকে পড়াশোনা শিখিয়ে চাকরির বাজারে প্রস্তুত করেছেন। এখানে সেই নিম্ন মধ্যবিত্ত বাবার স্বপ্ন ছিল তার ছেলে-মেয়ে যাতে বেটার লাইফ পায়। এটাই কিন্তু আসল উদ্দেশ্য। আমরা একটা বেটার লাইফের জন্য প্রতিদিন ছুটে বেড়াচ্ছি।’

এনজিও কর্মকর্তা তানিশা ইসলাম বলেন, ‘আমাদের জীবনটা একটি নির্দিষ্ট বাজেটকেন্দ্রিক। মাসের শুরুতে আমাদের হিসাব করতে হয় কোথায় কত টাকা খরচ করব। কিন্তু বাজারের অবস্থা খারাপ হলে বা হঠাৎ কোনো সমস্যায় পড়লে হিসাব করা বাজেটে ঘাটতি দেখা যায়। এটা মধ্যবিত্তদের একটা ভয় ও অস্বস্তির কারণ। আমরা চাই মাস শেষে আমাদের খরচটা যাতে বাজেটের মধ্যেই থাকে। যখন একজন মধ্যবিত্ত তার খরচ সামলিয়ে সঞ্চয় করতে শুরু করেন, তখন তিনি স্বপ্ন দেখার সাহস পান। অন্যদিকে সঞ্চয়ে টান পড়লে তার মধ্যে প্রতিনিয়ত একটি ভয় কাজ করে। আমি মনে করি, বাংলাদেশের মধ্যবিত্তদের মধ্যে আর্থিক নিরাপত্তা বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।’

মধ্যবিত্তদের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শাহ এহসান হাবিব সময় সংবাদকে বলেন, এ দেশের মধ্যবিত্তরা আর্থিক নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক অধিকার চান। যেকোনো সংকটে মধ্যবিত্তরাই অগ্রগামী থাকেন। অন্যদিকে অধিকারবঞ্চিতদের তালিকায়ও কিন্তু প্রথমেই আসে মধ্যবিত্তদের নাম।

Loading