পেগাসাস ক্রয়

বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে বিদ্ধ মোদি

প্রকাশিত: ১:০৯ অপরাহ্ণ , জানুয়ারি ৩০, ২০২২

২০১৭ সালের জুলাই। সমুদ্রসৈকতে ট্রাউজার গুটিয়ে পানিতে পা ডুবিয়ে গল্প করছেন ভারত ও ইসরাইলের দুই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ওই ছবি ও ভিডিও সংবাদমাধ্যমে সকলেই দেখেছেন। উত্তর ইসরাইলের ওলঘা সমুদ্রতীরে ছিল দুই রাষ্ট্রনায়কের অবকাশযাপনের সেই ফোটোসেশন। তিন দিনের এই সরকারি সফরে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল বেশ কয়েকটি সমঝোতা। তার সিংহভাগই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং অস্ত্র-সংক্রান্ত।

সাড়ে চার বছর পর ফাঁস হলো আসল তথ্য। ২০০ কোটি ডলার বা ১৫ হাজার কোটি ভারতীয় রুপির ওই প্রতিরক্ষা চুক্তির অন্যতম ছিল পেগাসাস স্পাইওয়্যার। অর্থাৎ ইসরাইলের সাথে চুক্তি করে এনএসও সংস্থার তৈরি স্মার্টফোনে আড়ি পাতার বিশেষ সফটওয়্যার কিনেছিল আর কেউ নয়, খোদ মোদি সরকার। আর তা ব্যবহার করে ভারতের বিরোধী নেতা থেকে সাংবাদিক, বিচারপতি থেকে মন্ত্রী, অন্তত ৩০০ নাগরিকের ফোনে চলছিল চরবৃত্তি। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী ছিলেন তালিকায়। সংসদ, সুপ্রিম কোর্ট, সাংবাদিকদের লাগাতার প্রশ্নের মুখেও এবিষয়ে স্পষ্ট কোনো জবাব দেয়নি মোদি সরকার। বরং নানাবিধ দায় এড়ানো বিবৃতি দিয়ে সন্দেহ বাড়ায়। শেষপর্যন্ত খোদ সুপ্রিম কোর্ট এই ইস্যুতে তদন্ত কমিটি গঠন করে। যাবতীয় অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই শনিবার বোমা ফাটিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’। পেগাসাস নিয়ে এক দীর্ঘ তদন্তশেষে তারা জানতে পেরেছে, ২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইসরাইল সফরেই চূড়ান্ত হয়েছিল ‘ডিল’।

জানা যাচ্ছে, পেগাসাস কিনতে ৩০০ কোটি রুপিরও বেশি খরচ করেছিল মোদি সরকার। কাকতালীয়ভাবে ২০১৭ সালে ভারতের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল সেক্রেটারিয়েটের বাজেট আচমকা ৩৩ কোটি থেকে বেড়ে পৌঁছে যায় প্রায় ৩৩৩ কোটি রুপিতে। এই কাউন্সিল সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দফতরের অধীনে। হঠাৎ এক ধাক্কায় প্রায় ৩০০ কোটি রুপি বাজেট বৃদ্ধি নিয়ে তখন প্রশ্ন তুলেছিল বিরোধীরা।

শনিবার তারা বলছে, এতদিনে বোঝা গেল ওই টাকা কোথায়! ইসরাইলের এনএসও কোম্পানির কাছে। এই বিস্ফোরক তথ্য ফাঁস হতেই চরম অস্বস্তিতে মোদি সরকার। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন মোদি। এর মধ্যে এদিনই ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক আরো দৃঢ় করার বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। দু’দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ভিডিও বক্তৃতায় তিনি একথা জানান।

গত বছর জুলাই মাসে প্রথম সামনে আসে পেগাসাস স্পাইওয়্যারের মাধ্যমে ফোনে আড়ি পাতার ঘটনা। মেক্সিকো থেকে ভারত, সৌদি আরব থেকে ফ্রান্স, হাঙ্গেরি কিংবা পোলান্ড- সর্বত্র এই চরবৃত্তির অভিযোগ আছড়ে পড়ে। দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করে একের পর এক দেশ। কিন্তু মোদি সরকার প্রথম থেকেই এব্যাপারে নীরব।
এমনকি সংসদে প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী সাফ জানান, যাবতীয় অভিযোগ ভুয়া। একমাত্র রাজ্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। তা নিয়েও প্রবল আপত্তি তোলে কেন্দ্র। শেষপর্যন্ত বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়ায় নড়েচড়ে বসে শীর্ষ আদালত। সুপ্রিম কোর্ট বারংবার পেগাসাস নিয়ে জবাবদিহি ও হলফনামা চাইলেও জাতীয় নিরাপত্তার ‘অজুহাত’ দিয়ে এড়িয়ে যায় মোদি সরকার। ফলে কেন্দ্রকে তীব্র ভর্ৎসনা করে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বি আর রবীন্দ্রনের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ। সাফ জানানো হয়, জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বিষয়টি এড়ানো যাবে না। সুপ্রিম কোর্ট গঠিত ওই কমিটির তদন্ত চলছে। তার মধ্যেই পাঁচ রাজ্যের ভোটের প্রাক্কালে মোদি সরকারের কাছে জোরদার ধাক্কা শনিবারের পেগাসাস-রিপোর্ট।
সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা

Loading