কৃষি হোক উন্নয়নের পরম নির্ভরতা

প্রকাশিত: ১:১০ অপরাহ্ণ , জুন ২১, ২০২০

এবারের বাজেটে সরকার কৃষিখাতকে দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাধিকারমূলক খাত হিসেবে ঘোষণা করেছে। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুবিধায় বাড়তি সংস্থান এমনিতেই প্রথম প্রাধিকার। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি যে আরো গুরুত্বপূর্ণ তা বাজেটে বিবেচনায় এসেছে। সে কারণে কৃষি তার গুরুত্ব পেয়েছে।

আমাদের কৃষকগণ বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে তেমন জানেনা, কিন্তু কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে, কিংবা নতুন ফসলের  আবাদে তাদের কখনো ক্লান্তি নেই। তারা চায় তাদের পরিশ্রমের ফসল যেন তাদের জীবনযাত্রার মানকে উন্নত করে, তারা খেয়েপড়ে বাঁচতে পারে। ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাতে পারে, আর রোগ-শোকে সামান্য চিকিৎসা – এসব পূর্ণ হলে কৃষকের কোন খেদ থাকেনা। তারা সারা দিনই পরিশ্রম করতে পারে। আমরা যেমন বলি মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে পারে।

কিন্তু মহামারী কোভিড-১৯ এর ফলে কৃষকের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কিছুটা হোঁচট খেয়েছে। প্রথমত হঠাৎ করে সারাদেশে ছুটি ঘোষণা এবং পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে কৃষক তাদের মাঠের ফসল বিশেষ করে সবজি বিক্রি নিয়ে বিপাকে পড়ে যায়, কিভাবে এ ফসল মোকামে আড়তে পৌঁছানো যাবে, তদুপরি মোকামগুলিও বন্ধ, শহর থেকে আসছেনা সবজির মহাজনরা। কৃষকের ফসল হঠাৎ করে নাই হয়ে গেল, এত পরিশ্রম, যত্ন, সার, কীটনাশক,সেচ ইত্যাদিতে যে পরিমান অর্থ খরচ করতে হয়েছে তা আর খুব একটা পাওয়া গেলনা। কতদিন সবজি ধরে রাখা যাবে। শেষ পর্যন্ত এতে কৃষকের বড় লোকসান হয়ে গিয়েছে।

শহর হতে আত্মীয় স্বজনরা ফিরে আসছে দলে দলে। অনেক পরিবারে হয়তো দু একজন যারা শহরে থাকে, কোন চাকুরী করে, পরিবারে চাষাবাদের জন্য কিছু সহযোগিতা করে, সেখানে এখন আর টাকা পাবার জোগাড় নেই, উল্টো অন্নের সংস্থান করতে হচ্ছে শহরবাসী স্বজনের। অনেক পরিবারের কেউ আছেন মধ্যপ্রাচ্যে- বাড়িতে টাকা পাঠাতেন, সে টাকা সংসারে খরচ হত, কৃষি কাজেও ব্যয় হতো। এখনতো মধ্যপ্রাচ্যবাসী স্বজন নিজেই আছেন কষ্টে, হয়তো সেখানে কাজ নেই, বেতনও নেই- দেশে ফিরে আসতে হচ্ছে। স্বচ্ছল কৃষি পরিবারগুলোতেও এভাবে ধাক্কা দিচ্ছে কোভিড-১৯। নতুন করে কৃষকের স্বচ্ছলতার ভাবটিতে টান পড়ছে।

কিন্তু কৃষক কি বসে থাকছে? কৃষক তারপরও কাজ করছে, নতুন আবাদের কথা ভাবছে। সবচে’ বড় সমস্যা হচ্ছে তাঁর হাতে নগদ টাকা নেই, খাবার জোগাড়ে ও সমস্যা হচ্ছে। নগদ টাকার যে উৎসগুলো ছিল তা’তো বাধা পড়েছে কোভিড-১৯ এর কারনে। নিজেদের উৎপন্ন করা ফসলের দাম না পাওয়া, শহরে বা বিদেশে কাজ করা আত্মীয় স্বজনের কাজ হারানো ইত্যাদি ও কৃষককে পীড়া দিচ্ছে।

ফসল ফলানোর জন্য বিভিন্ন এনজিও থেকে যে ধার নিয়েছে তাঁর সাপ্তাহিক কিস্তি প্রদান ও একটি বড় সমস্যা। ব্যাংকের কৃষি লোন – তার ও সুদ বাড়ছে। এসবের মাঝে ও কৃষি কাজের একান্ত ইচ্ছে কৃষি ও কৃষককে বাঁচিয়ে রাখে। এরকম সময় সরকার এবং সকল উন্নয়নধর্মী সংগঠন যদি কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে যান ন্যূনতম আর্থিক সুবিধা নিয়ে তা’হলে আমাদের কৃষি এতকিছুর মাঝে ও এগিয়ে যাবে। আমাদের কৃষকের সৃজনশীলতায় আমাদের ফসল উৎপাদনে এসেছে বৈচিত্র- শুধূমাত্র ধান, সবজির আবাদ ছাড়াও কৃষক এখন আবাদ করছে নানা ফলের এবং এই সব ফলের চাষকে করছে লাভজনক ব্যবসায় রুপান্তর। আমাদের কৃষকের কাছে সামান্য নগদ প্রবাহ পৌছুলেই কৃষক তাকে সদ্ব্যবহার করতে পারবে এবং প্রয়োজনীয় ফসল উৎপাদন করে ইতোমধ্যে সংগঠিত ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে।

কৃষিকে বাজেটে সর্বোচ্চ দ্বিতীয় প্রাধিকার প্রদান তাই অত্যন্ত দায়িত্বশীল বলেই বিবেচিত হচ্ছে। এই মূহুর্তে দরিদ্র জনগনের মধ্যে খাদ্য শস্য বিতরণের যে কার্যক্রম সরকার হাতে নিয়েছে তাকে আরো জোরদার করা উচিত এবং কোভিড-১৯ এর অভিঘাতে কৃষকদের মাঝে যে নতুন দরিদ্র পরিবার সৃষ্টি হয়েছে তাদের সনাক্ত করে তাদের কাছে ও প্রয়োজনীয় খাদ্য শস্য পৌঁছানো খুব জরুরি। ১০ টাকা কেজি তে চাল বিক্রির প্রক্রিয়াকে গ্রামীণ অঞ্চলে ও সম্পৃক্ত করা দরকার। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় যে ২হাজার৫০০ টাকা প্রদান করা হচ্ছে হতদরিদ্র পরিবার, হঠাৎ চাকুরীচ্যুত মানুষজনকে তাও প্রকারান্তরে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে, পরোক্ষভাবে কৃষিও লাভবান হবে। তবে ৫ হাজার কোটি টাকার কৃষি ঋণের বিষয়টি দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক বাছাই করা, তাদের ন্যূনতম প্রয়োজন নির্মোহভাবে নিরুপন করে টাকা দ্রুত সত্যিকারের কৃষকের কাছে সময়মত পৌঁছুলে কৃষির অনেক সমস্যাই মিটে যাবে। কৃষকের হাতে টাকা থাকলে কৃষক বুদ্ধি বিবেচনা করে কৃষির জন্য যা প্রয়োজন তা জোগাড় করে নিবে। শুধুমাত্র ইতোমধ্যে যারা কৃষি ঋণ নিয়েছে তারা ছাড়াও অনেক কৃষক আছেন যাদের কৃষি ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন কখনো ছিলনা। কিন্তু এবার তাদেরও কৃষি ঋণ খুব দরকার। এদেরকে সনাক্ত করে কৃষি ঋণ বিতরণ করা গেলে তা হবে আমাদের কৃষির জন্য সমূহ উপকারী। এ কাজটি করার জন্য আমাদের ব্যাংক খাত কতটা উদ্যমী তাঁর উপর ও কৃষির সফলতা অনেকখানি  নির্ভর করবে।

কৃষি খাতকে প্রাধিকার বিবেচনার বিষয়টি যদি কৃষি কাজে সহায়তা  প্রদানকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও মনে রাখে এবং সে মোতাবেক দায়িত্বপূর্ণভাবে কর্ম সম্পাদন করে তা হলে কোভিড-১৯ এর অনেক ক্ষত আমরা সারিয়ে তুলতে পারব।

কৃষিখাতকে চাঙ্গা করার জন্য সরকারের স্বদিচ্ছা যথেষ্ট সহায়ক। সরকার করছেও তাই। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে সরকারের ২০০ শত কোটি টাকার প্রণোদনায় বোরো মৌসুমে ধানকাটার কম্বাইন হারভেষ্টারের মালিক হয়েছে এবার অনেক কৃষক। এবং বোরো মৌসুমে কৃষি শ্রমিকের স্বল্পতা সত্বেও ও কৃষক ধান তুলতে পেরেছে কম খরচে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের প্রণোদনাকে সরকার বাজেটে ৯ হাজার৫০০ কোটি টাকার একটি নতুন পরিকল্পনায় উন্নীত করেছে। এতে কৃষিতে আরও নতুন নতুন প্রয়োজনীয় যন্ত্রের ব্যবহার বাড়বে। কৃষি আরো উন্নত হবে, বাণিজ্যিকভাবেও সফল হবে। প্রান্তিক কৃষক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্যও বাজেটে ৩ হাজার কোটি টাকার একটি বরাদ্দের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, এটিও কৃষির উন্নয়নকে সরাসরি সাহয্য করবে।

সরকারের সকল উদ্যোগে কৃষি ও কৃষক লাভবান হবে যদি এই সব উদ্যোগ সফলভাবে কাজে লাগানো যায়- তার জন্য যেমন যুক্ত স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিবৃন্দ, উপজেলা ও কৃষি কর্মকর্তাবৃন্দ তেমনি ব্যাংক সমূহও এই কার্যক্রমে যুক্ত। কৃষকের কাছে এই মূহুর্তে প্রয়োজন নগদ প্রবাহ এবং তাদের দু’বেলা খাবারের সংস্থান। সবাই আন্তরিকতার সঙ্গে যদি কৃষকের পাশে থাকার কথা বিবেচনায় রাখি তাহলে আমাদের কৃষি বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ফসল উৎপাদন করতে পারবে। সামনেই আমন মৌসুম, কৃষককে এখন জমি তৈরি করতে হবে, বীজ কিনতে হবে এবং প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ জোগাড় করতে হবে। আমাদের কৃষকের উদ্যমের কোন অভাব নেই, সকল প্রতিকূলতার মধ্যে কাজ করে তারা দেশের জন্য প্রয়োজনীয় ফসল ফলাতে পারে, এমনকি বাম্পার ফসলও তারা ফলায়। এই সময়ে কোভিড-১৯ এর বিপর্যয়ের পর আমাদের সকলেরই আমাদের কৃষির প্রতি বাড়তি নজর দিতে হবে। আমাদের উৎপাদিত কৃষি পণ্যসমূহে যদি আমাদের নিজেদের চাহিদা আমরা মিটাতে পারি তাহলে দেশের অর্থনীতিতে তা বড় রকমের সাহায্য করতে পারে- খাদ্যের জন্য পরনির্ভরতা তো কমানো যায়ই- একইসঙ্গে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় করা যায়। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিবেগকে ধরে রাখতে হলে কৃষির প্রতি আমাদের সমর্থন কে বাড়াতে হবেই ।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক।