পরিবেশকর্মীকে ফাঁসাতে ‘বোমা মারার মামলা

প্রকাশিত: ১১:৪৫ পূর্বাহ্ণ , জানুয়ারি ৩১, ২০২১

যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদারের সঙ্গে কেশবপুর থানার ওসি জসিম উদ্দিনের একটি কথিত অডিও কথোপকথন ফাঁস হয়েছে৷ সেখানে এমপিকে থানায় বোমা মেরে একজনকে ফাঁসানোর নির্দেশ দিতে শোনা যায়৷ কথোপকথনটির বিষয়ে জানতে এমপির মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তার মালিকানাধীন হোটেলের পরিচালক পরিচয় দেয়া মো. শাকিল ফোন ধরেন৷ তিনি অডিওটি টেম্পার করা বলে দাবি করেন৷

অন্যদিকে, কেশবপুর থানার ওসি জসিম উদ্দিন সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন এই বিষয়ে তার কিছু মনে নেই৷ অডিওতে শেখ সাইফুল্লাহ নামে যে পরিবেশকর্মীকে ফাঁসানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) একজন নেটওয়ার্ক সদস্য৷ কিছুদিন আগে স্থানীয় একটি ইটভাটা উচ্ছেদের ঘটনায় আলোচনায় আসেন তিনি৷ বেলার আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্টের নির্দেশে ইটভাটাটি উচ্ছেদ করে প্রশাসন৷

ঢাকার কয়েকটি গণমাধ্যমে শুক্রবার ওসি জসিম উদ্দিনের সঙ্গে এমপি শাহীন চাকলাদারের কথোপকথোনের কথিত অডিওটি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা হয়৷ দুই মিনিট ৫৬ সেকেন্ডের ওই অডিও ক্লিপটি ডয়চে ভেলের হাতেও এসেছে৷ তবে সেটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি৷ঘটনার অনুসন্ধানে জানা গেছে, যশোরের কেশবপুর উপজেলার উত্তর সাতবাড়িয়া গ্রামের মধ্যেই দুই বছর আগে ‘মেসার্স সুপার ব্রিকস’ নামের ইটভাটা তৈরি হয়৷ সেসময় গ্রামের মধ্যে এই ইটভাটা তৈরির বিরোধিতা করে গ্রামবাসী বিভিন্ন জায়গায় লিখিত আবেদন করেন৷ এই আবেদনকারীদের একজন শেখ সাইফুল্লাহ৷ ২০১৮ সালে বেলার পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে ইটভাটার বিরুদ্ধে রিট করা হয়৷ আদালত ইটভাটার কার্যক্রমকে অবৈধ ঘোষণা করে ছয় মাসের স্থগিতাদেশ দেন৷

সর্বশেষ উচ্চ আদালতের নির্দেশে গত ডিসেম্বরে ইটভাটাটি গুড়িয়ে দেয় প্রশাসন৷ এই বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ সাইফুল্লাহ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘শুধু আমি একা নই, গ্রামের অনেক মানুষই এই আবেদন করেছে৷ এটা নিয়ে আমাকে অনেকদিন ধরেই হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে৷ আমি কেশবপুর থানায় একাধিক জিডিও করেছি৷ কিন্তু সর্বশেষ গত ডিসেম্বর থেকেই স্থানীয় এমপি শাহীন চাকলাদারের লোকজন আমাকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে৷ আমাকে ডেকে নিয়েও হুমকি দিয়েছে৷ এখন আমি প্রাণভয়ে আছি৷ তবে আমি সত্যের পক্ষে আছি, সত্যের জয় হয়ই৷’’

অডিওটি ফাঁস হওয়ার পর জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে শনিবার কেশবপুর থানায় আরেকটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন শেখ সাইফুল্লাহ৷

ওসিকে থানায় বোমা মারার অডিও আলাপ নিয়ে জানতে শাহীন চাকলাদারের মোবাইলে ফোন করা হয়৷ তবে, ফোনটি ধরেন মো. শাকিল হোসেন নামে একজন৷ তিনি নিজেকে প্রকৌশলী দাবি করে বলেন, শাহীন চাকলাদারের সঙ্গেই তিনি থাকেন৷ পাশাপাশি তিনি শাহীন চাকলাদারের মালিকানাধীন জাবির হোটেল ইন্টারন্যাশনালের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর৷ ফোনালাপের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘এটা কেউ টেম্পারিং করে বানিয়েছে৷’’কথোপকথনের বিষয়ে জানতে কেশবপুর থানার ওসি জসিম উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকেও পাওয়া যায়নি৷ তবে স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে ওসি বলেছেন, ‘‘আমি এমপি সাহেবের সঙ্গে প্রতিদিনই কথা বলি৷ কত কথাই তো হয়৷ সব কথাতো ওইভাবে স্মরণ থাকে না৷’’ তবে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক যশোর জেলার একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘‘ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশে বিষয়টি নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে৷’’

বেলার নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সাইফুল্লাহ আমাদের নেটওয়ার্ক মেম্বার৷ একজন ইটভাটার মালিকের পক্ষ হয়ে একজন সাংসদের এমন অবস্থান প্রমাণ করে, পরিবেশ নিয়ে যারা কাজ করেন, তারা কতটা নাজুক অবস্থার মধ্যে আছেন৷ আগামীকাল (রবিবার) অফিস খুললেই আমরা বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতির কাছে লিখিত অভিযোগ জানাব৷ এছাড়া স্পিকার ও সংসদ নেতার কাছেও আমরা অভিযোগ জানাব৷ তিনি সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় আমরা তো নিরাপদ থাকতে পারি না৷’’ উল্লেখ্য, গত বছর যশোর-৬ আসনে উপ-নির্বাচন বিজয়ী হন যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার৷ এর আগে ২০০৯ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত যশোর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি৷## DW