নয় বছর যাবৎ শিকলে বাধাঁ বন্দি জীবন

প্রকাশিত: ৭:২০ অপরাহ্ণ , নভেম্বর ২১, ২০২০

ফিরোজ খান

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ডিঙ্গামানিক ইউনিয়নের রিতা আক্তার (২৫)। অর্থের অভাবে বিনা চিকিৎসায় কাটছে রিতা আক্তার এর শিকলে বাধাঁ বন্দি জীবন।

নড়িয়ার ডিঙ্গামানিক ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের ডিঙ্গামানিক গ্রামের আলাউদ্দিন দেওয়ান (৬০) এর ৫ মেয়ে ১ ছেলে মধ্যে রিতা ৪ নাম্বার সন্তান।
সংসারে একটি মাত্র ছেলে তাও আবার বেকার।

এতো বড় পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারি ব্যাক্তি আলাউদ্দিন দেওয়ান তিন বেলা সবার মুখে আহার যোগাতেই হিমশিম খায়।

তার উপর জেলায় সরকারি হাসপাতাল চিকিৎসক সংঙ্কট ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা ব্যবস্থার করণে দরিদ্র পিতার পক্ষে সম্ভব না রিতাকে চিকিৎসা করার।

২১ নভেম্বর শনিবার ডিঙ্গামানিক গ্রামের আলাউদ্দিন দেওয়ানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ঘরের পাশে একটি ছোট বাঁশের মাচালে শিকল বাঁধা অবস্থায় বসে আছে রিতা। বাঁশের মাঁচায় বসে সারাদিন কাটে তাঁর। একা একা নিজে নিজেই কথা বলতে থাকে রিতা।

বাঁশের মাচালের পাশেই একটি গাছের সাথে শিকল দিয়ে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে তাকে। বাড়ির লোকজন এবং পাড়া প্রতিবেশীরা বলছেন লেখাপড়ায় খুব ভালো ছিলো রিতা। এলাকার কার্তিকপুর স্কুল থেকে এসএসসি’র জন্য টেস্ট পরীক্ষাও দিয়েছিলো সে।

রিতার বাবা মা বলেন, আমার মেয়ের জ্বর হয়েছিল এরপর থেকেই ও এরকম হয়ে গেছে। অর্থের অভাবে রিতাকে চিকিৎসা করাতে পারিনি। যতটুকু সাধ্য ছিলো তা দিয়ে চিকিৎসা করিয়ে এখন আমরা সর্বশান্ত হয়ে গেছি।

রিতার মা মেহের বানু বলেন, আমার স্বামীর বয়স বাড়ার কারনে কোন কাজ করতে পারেন না। ঠিকমতো তিনবেলা খাবার জোগাতেই কস্ট হয়।
চিকিৎসা করাবেন কিভাবে। অভাব অনটনের সংসারে একটি মাত্র ছেলে সেও বেকার।

রিতাকে খাওয়া দাওয়া এবং দেখাশোনা আমাকেই করতে হয়। আমারও বয়স হয়েছে। কখন মরে যাই ঠিক নেই। তখন এই মেয়েকে কে দেখবে।

টাকার অভাবে চিকিৎসার না হওয়ায় মানসিক ভারসাম্য আরো অবনতি হয়েছে রিতার। যার কারনে ৯ বছর যাবৎ শিকলে বাধাঁ রয়েছে তার স্বপ্ন গুলো। যে বয়সে তার স্বামী সন্তান নিয়ে শশুরবাড়ি একটি সাজানো গুছানো সংসার থাকার কথা। সেখানে ভাগ্য তাকে শিকল বন্দী করে রেখেছে। তবে উন্নত চিকিৎসা ও সহযোগীতা পেলে রিতা আক্তার (২৫) আবারো সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে বলে দাবী স্থানীয়দের।

তাদের ঘরবাড়ি ঘুরে দেখা গেছে সহায় সম্পত্তি যা আছে এতে একটি ভাঙ্গা ঘর ছাড়া আর কিছুই নেই। অর্থের অভাবে বিনা চিকিৎসায় কাটছে রিতা আক্তার এর শিকলে বাধাঁ বন্দি জীবন।

তার স্বজনরা জানান,আমরা গরীব,দিন এনে দিন খাই, অতিরিক্ত কোন ভালো কিছু খাবার এনে ওকে কোনদিন খাওয়াতে পারি না।
এতে স্থানীয় মেম্বারও কিছু দেয় না। ওর খাওয়া দাওয়ায় তো কম লাগে না,অনেক কস্ট করে চলতে হয়। সরকারীভাবে প্রতিবন্ধী ভাতাও নেই তার বলে জানান তার পরিবার।

এ বিষয়ে রিতার চাচা মোঃ সোহরাব দেওয়ান (৪৫) বলেন,ওরা অনেক অসহায়। টাকার অভাবে অনেক কিছুই করা যায় না,ভালো চিকিৎসা দিতে পারলে হয়তো সে ভালো হয়ে যেত।
ওর খাওয়া দাওয়া জামা কাপড় এ গুলোতেও কম খরচ লাগে না,তাই সমাজের বিত্তবানরা যদি ওর জন্য কিছু করতো তাহলে হয়তো ওদের কস্ট থাকতো না।

শিকলে বেধে রাখার কারন জানতে চাইলে তার ভাই অন্তর (২১) জানান,শিকলে বেধে না রাখলে মানুষ কে মারধর করে।

এছাড়াও বিভিন্ন দিকে চলে যেতে চায়। তাই তাকে শিকলে বেধেঁ রাখি। নাহলে সে পালিয়ে যায় এবং বিভিন্ন সমস্যা করে।

রিতার ভাই বলেন, যদি টাকা জোগাড় করতে পারি বা কোন আর্থিক সাহায্য সহযোগিতা পেতাম তাহলে আমার বোনের ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা করতাম। বোনের খাওয়া দাওয়া নিয়েও কোন সমস্যা হতোনা। এমন অবস্থায় তিনি সমাজের বৃত্তবানদের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

এবিষয়ে জেলা সমাজ সেবা অধিদপ্তরের উপ পরিচালক কামাল হোসেন বলেন, অভিভাবক যদি মেয়েটিকে শিকলে বন্দি করে রাখে, তাহলে আমাদের কিছু করার নেই। অভিভাবক যদি রিতাকে চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে। তাহলে আমরা হাসপাতাল সমাজ সেবা থেকে যাবতীয় ঔষধ সহ চিকিৎসা করাতে পারবো। সেই সাথে একটা একাউন্ট খুলে ভাতার ব্যবস্থাও করবো। এর আগে রোকেয়া নামের এক প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে প্রতিবেদন হওয়ার পর আমরা এসকল ব্যবস্থা করে দিয়েছি।