আমার দেখা বঙ্গবন্ধু ও ৭০ এর নির্বাচন

সুস্থির সরকার সুস্থির সরকার

বিভাগীয় প্রধান ময়মনসিংহ

প্রকাশিত: ১২:২৩ অপরাহ্ণ , সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এঁর জন্মশত বার্ষিকী স্মরণে

রফিকুল ইসলাম খান আপেল

 

মানুষের জীবন ধারন ও নিজেদের সমৃদ্ধ সমাজ গঠনের জন্য ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের প্রতি স্বভাবজাত আগ্রহ থেকেই প্রগতিকে ধারন করে সুন্দর আগামী নির্মাণ করাই মানব ধর্ম । যে জাতি তার ইতিহাস জানে না, সে জাতি আগামীকেও সুন্দরভাবে নির্মাণ করতে পারে না। তাই এ বিশ্বে নিজেদের সংগ্রামের ইতিহাস অঞ্চল ভিত্তিক খন্ড খন্ড আকারে একত্রিত করে একটি সমন্বিত ইতিহাস তুলে ধরার প্রয়াসে আজকের এই নিবন্দন।

বাঙ্গালি জাতির হাজার বছর চর্চিত ও প্রত্যাশিত মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি খন্ডিত জাতিকে সমন্বিত করে বিশ্ব মানচিত্রে বাঙ্গালি জাতিসত্ত্বার পরিচয় গৌরবের সাথে উস্থাপনের জন্য প্রত্যয়ী ছিলেন। তাঁর ডাকে ১৯৬৬ সনে বাঙ্গালীর মুক্তির সনদ ৬ দফা ও ১৯৬৮ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকা ১১ দফা আন্দোলনে তখন সমগ্র পূর্ব বাংলা উত্ত্বাল। এই আন্দোলনের তীব্রতায় আইয়ূব সরকার বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামী করে ৩৪ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। গণআন্দোলনের চাপে আইয়ুব খান সকল বিরোধী দল সমূহকে নিয়ে লাহোরে গোল-টেবিল বৈঠকের আহ্বান জানায়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু একজন জেলবন্দি হিসেবে উক্ত বৈঠকে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, ৬ দফার আলোচনা ও সকল রাজবন্দীদের নিঃশর্ত মুক্তি দিলে তবেই তিনি গোল-টেবিল বৈঠকে বসার বিবেচনা করবেন। আইয়ূব খান উক্ত শর্ত মেনে নিয়ে ২২ ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯ সনে সকল রাজবন্দিদের মুক্তি দেয়।
১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী পল্টন-ময়দানে লক্ষ ছাত্রÑজনতার উপস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে গণসংবর্ধনা দেন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। সেই গণসংবর্ধনায় ১১ দফা আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও ডাকসু’র ভিপি তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
বঙ্গবন্ধু একজন মুক্ত স্বাধীন নাগরিক হিসেবে সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ একদল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ নিয়ে লাহোরে আহুত গোল-টেবিল বৈঠকে যোগ দেন। তিনি জানতেন আলোচনায় কোন ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত হবে না। তাই বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্র-জনতার আন্দোলন অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন।
শুরু থেকে এই আন্দোলনের ঢেউ নেত্রকোণাতেও প্রচন্ডভাবে অব্যাহত ছিল। আমরা যারা আঞ্জুমান ¯ু‹লে উপরের ক্লাসে পড়াশুনা করতামÑ খন্দকার আনিছুর রহমান, জাহাঙ্গীর, জহীরুল হক হীরা, আব্দুল হাকিম, আনোয়ার(কালীবাড়ী), খলিলুর রহমান, মোঃ কামাল পাশা, ইকবাল, কফিল, হায়দার আহম্দ খান (জল্লি),সেলিম খান, মোনেম, মঞ্জু, আব্দুর রব(বড় বাজার), গিয়াস, আবু আক্কাছ, আশরাফ, রব্বানী (কলমাকান্দা), কাইয়ূম লস্কর সহ আরও অনেকে তৎকালীন জেলা ছাত্রলীগের কর্মী ও বর্তমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় সমাজকল্যান প্রতিমন্ত্রী জনাব আশরাফ আলী খান খসরু এবং হায়দার জাহান চৌধুরীর হাত ধরে ১৯৬৭ সনে ছাত্রলীগে যোগদান করি।
মোঃ সামছুজ্জোহা ভাই (১৯৬৭ ও ১৯৬৯) দু-বার ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। ১৯৬৭ সনে ছাত্রলীগ হতে সামছুজ্জোহা ভাই ভিপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মোঃ নূরুলহুদা জি এস পদে নেত্রকোণা কলেজ ছাত্রসংসদে নির্বাচিত হন। ১৯৬৮ সনে সাফায়াত আহম্দ খান জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও নেত্রকোণা কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) এবং মতিয়র রহমান খান জেলা ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক ও কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারন সম্পাদক (জি এস) ছিলেন।
১৯৬৯ সনে আশরাফ খান খসরু জেলা ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন, তখন দেশে ছাত্র আন্দোলন তুঙ্গে থাকায় নেত্রকোণা কলেজে ১৯৬৯-৭০ সনে নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচন না-হওয়ায় কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসার তসাদ্দক আহম্দ স্যারের উপরুধে মতিয়র রহমান খান ১৯৬৯-৭০ ছাত্র সংসদের কার্যক্রম চালিয়ে যান। ১৯৭০ সনে গোলাম এরশাদুর রহমান ছাত্রলীগের সভাপতি ও হায়দার জাহান চৌধুরী সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন। ৭০-এর জাতিয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে হায়দার জাহান চৌধুরী ও বাদল মজুমদারের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের মাঠ পর্য্যায়ের নেতাকর্মীরা দেয়াল লিখন, মাইকিং, পোষ্টার, লিফলেট বিতরণসহ, নির্বাচনী প্রচার প্রচারনার সমস্ত কাজ করে।
সেই সময় দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রায় এগারশত ছাত্র ছিল, তারাও কলেজের ছাত্রদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে চলমান আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখত। এতে তৃষিত বিশ্বাস, মাহাবুব খান বাবুল, মোঃ নজরুল ইসলাম খান, নির্মল কুমার দাস, জ্ঞানেশ চন্দ্র সরকার, ননী সরকার, পরিমল, বিদ্যুৎ, আবুল কাসেমসেলু, আনোয়ার হোসেন ভূঞা, ছাত্তার, উজ্জ্বল বিকাশ দত্ত, অনিল সরকার,উৎপল, কাদির, হেলাল, উৎপলসরকার, আর চন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র আব্দুর রহিম, মন্টুসহ আরো কয়েকজন ছাত্র ছিল। সবাই ছিল ছাত্রলীগের স্বক্রীয় সদস্য। আমরা প্রায় কাছাকাছি বয়সী।
মুশফিকুর রহমান এসডিও থাকাকালীন সময়ে ছাত্র-আন্দোলন তুঙ্গে, তৎসময়ের দত্ত স্কুলের প্রধান শিক্ষক স্কুলের উন্নয়ন তহবিল প্রাপ্তির জন্য এসডিও সাহেবের প্রলোভনে ছাত্রদের আন্দোলনে যোগ নাÑদেয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু বয়োজৈষ্ঠ্য ছাত্ররা প্রধান শিক্ষকের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখান নাÑকরে চলে যান, পূর্বে থেকেই দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের চারিপাশে স্কুলের প্রবেশ দ¦ারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রাখেন বয়োজষ্ঠ্যৈ ছাত্ররা, যেন সাধারণ ছাত্ররা স্কুলের ভিতরে প্রবেশ করতে না পারে। আঞ্জুমান,চন্দ্রনাথস্কুল ও কলেজ হতে মিছিল এসে শহীদ মিনারে জড়ো হলো। তখন পুলিশ এসে মিছিল ছত্রভঙ্গ করে দেয়ার জন্য ছাত্রদের উপর লাঠিচার্জ শুরু করে। বিক্ষোভরত ছাত্ররা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে বেশ কয়েজন ছাত্রসহ পুলিশও আহত হয়। এ সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা এসডিও সাহেবের জীপের গ্লাস ইটের আঘাতে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। সময়ের সাথে পরিস্থিতি শান্ত হলেও চলমান বিক্ষোভ মহকুমার প্রতিটি থানায় থানায় অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৬৯ সনের নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে (সঠিক তারিখ মনে নেই) বঙ্গুবন্ধু নেত্রকোণায় আসেন। ছাত্রলীগ নেতা হায়দার জাহান চৌধুরীর নেতৃত্বে তাঁকে শ্যামগঞ্জ হতে আব্দুল্লাহ্-আল মামুন বুলবুল. বাদল মজুমদার, গাজী দেলোয়ার হোসেন, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, জাহাঙ্গীর, মজিবুর রহমানসহ অন্যান্য নেতাকর্মীরা মটর সাইকেল ও ট্রাক মিছিল সহকারে নেত্রকোণার জেলা পরিষদ ডাক বাংলায় নিয়ে আসি। বেলা ৩টায় বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক মোক্তার পাড়ার মাঠে এক বিশাল জনসভায় হাজারো জনতার উদ্দ্যেশে ভাষন দেন। বিভিন্ন থানা থেকে আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা সশস্ত্র জঙ্গী মিছিল নিয়ে জনসভায় যোগ দেয়। বিপুল সংখ্যক জনতার উপস্থিতি দেখে বঙ্গবন্ধু উত্তেজক ভাষন দিয়ে জনতাকে বিমোহিত করেন। এমনি ভাবে বঙ্গবন্ধু সাড়া পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি থানা, মহকুমা, জেলায় জেলায় জনসভা করে আওয়ামীলীগ ও পূর্ব বংলার জনগনকে ৬ দফার পক্ষে একত্রিত করেন। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে, ন্যাপ নেতা ওয়ালী খান, পাকিস্তান পিপলস্ পাটির নেতা জুলফিকার আলী ভূট্টো ও অন্যান্য বিরোধী দলীয় নেতারা নিজস্ব রাজনৈতিক প্রস্তাবনা নিয়ে আন্দোলন করে আসছিল। ছাত্র জনতার এই আন্দোলন জেনারেল আইয়ূব খানের ক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দেয়। এমনি অবস্থায় ১৯৬৯ সনের মার্চ মাসের ২৩ তারিখে পাক সেনা প্রধান জেনারল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা গ্রহণ করে উদ্ভুত পরিস্থিতি নিরসনের জন্য প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটাধিকার দিয়ে জনসংখ্যার ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষনা দেন।
বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে নির্বাচনকে আন্দোলনের অংশ হিসেবে গ্রহন করেন। একমাত্র ভাসানী (ন্যাপ) ব্যতিত অন্যান্য রাজনৈতিক দল উক্ত ঘোঘনাকে স্বাগত জানায় এবং নির্বাচনে অংশ নেয়।
১৯৭০ সালে ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ এর নির্বাচনকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামীলীগকে শক্তিশালী এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর জন্য সকল শক্তি নিয়োগ করেন। নির্বাচনী তফসীল ঘোষনার সাথে সাথে কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের প্রচার সম্পাদক নেত্রকোণার কৃতি সন্তান আব্দুল মমিন কর্তৃক পশ্চিম পাকিস্তানীদের দ্বারা পূর্ব পাকিস্তানের সাথে বৈষম্যমূলক আচরনের চিত্র পোস্টারের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে দেন। আর বঙ্গবন্ধু ৬ দফা নির্বাচনী ইশ্তেহার নিয়ে বিভিন্ন স্থানে জনসভা করতে শুরু করেন। এরই অংশ হিসেবে তিনি সিলেট, সুনামগঞ্জে জনসভা শেষ করে নৌ পথে লঞ্চ যোগে ধর্মপাশা থানায় আসেন। সেখানে জনসভা করে ১০ অক্টোবর সকালে মোহনগঞ্জে জনসভায় বক্তব্য রাখেন। এরপর ট্রেন যোগে দুপুরের দিকে তিনি নেত্রকোণা কোর্ট ষ্টেশনে পৌঁছেন। সেখানে জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের মনোনীত প্রার্থী সর্বজনাব ১.এডভোকেট এম জুবেদ আলী ২.এডভোকেট সাদির উদ্দিন আহমেদ ৩.আব্দুল খালেক ৪.আব্বাছ আলী খান ৫.আব্দুল মজিদ তাঁরা মিয়া ৬.হাদিস চৌধুরী ৭.নাজমুল হুদা উপস্থিত ছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর আগমন উপলক্ষ্যে আমি, বাদল মজুমদার, তৃষিত বিশ্বাস, ফেরদৌস, হাকিম, আনোয়ার, ননী, অনীল, হামদু, নাসির, হীরাসহ আরো অনেকেই বড় ষ্টেশনের পূর্ব দিকে মাল গোদামের সামনে কলেজ হতে চৌকি এনে মঞ্চ তৈরী করি। তখন জোহা ভাই, মতি ভাই, মেহের ভাই, জামাল ভাই, মানিক ভাই (মঈনপুর), জব্বার ভাই, মান্নান ভাই, বজলু রহমান ফকির, সন্জু ভাই,আব্দুস সহিদ(জয়সিদ)ভাই, বিপ্লব দা, কেনু ভাই, হীতেন চৌধুরী, জালাল ভাই, নজরুল ভাই (আত্কা পাড়া), বুলবুল ভাই, হাবিব ভাই, গিয়াস ভাই, ওয়ারেছ ভাই, কাদির ভাই (ধারিয়া), মোঃ ছাত্তার ভাই (কেন্দুয়া), এস এম কামাল ভাই (বালুয়াখালী), সিদ্দিক ভাই (নাড়িয়াপাড়া), মোঃইসমাইল, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, মানিক সেন. মালেক ভাই (তেলিগাতী), শহিদ ভাই, ওয়াহেদ ভাই. আলাউদ্দিন ভাই, গুলজার ভাই,ফুলুভাই, শ্যামল দা, মোঃ ইসলাম উদ্দিন কালা ভাই. রুমালী ভাই, আমার চাচা গাজী দেলোয়ার হোসেনসহ আরো অনেক আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন। মোহনগঞ্জ জনসভা করে বঙ্গবন্ধুর সাথে মোঃ আব্দুল মমিন, ডাঃ আখলাকুল হোসাইন আহম্দসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহের সাধারন সম্পাদক মোঃ রফিক উদ্দিন ভূঞা, কোষাধ্যক্ষ এডভোকেট আনিসুর রহমান খান ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দসহ নেত্রকোণা কোর্ট স্টেশনে পৌঁছেন। অপেক্ষমান নেতৃবৃন্দ বঙ্গবন্ধুকে ফুলের মালা দিয়ে অভ্যর্থনা জানান। বঙ্গবন্ধু হাত মাইকে অপেক্ষারত জনতার উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিয়ে ট্রেন ছাড়ার নির্দেশ দেন। আওয়ামীলীগ নেতা আব্বাছ আলী খান সাহেব তার বাড়ীতে বঙ্গবন্ধু ও তার সফর সঙ্গীদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে দুপুরের খাবারের অনুরোধ জানালে বঙ্গবন্ধু বলেন, খাবার ট্রেনে তুলে দাও, পথে খেয়ে নেব। তখন আব্বাছ আলী খানের নির্দেশে তাৎক্ষনিক ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হায়দার জাহান চৌধুরী, আব্দুল ওয়াহেদ, আশরাফ উদ্দিন খান, মদনপুরের আব্দুর রহিম, মোঃ নজরুল ইসলাম খান, বাবুলসহ অন্যান্যরা খাবার নিয়ে এসে মোহনগঞ্জ হতে আগত নেতৃবৃন্দের পাশের ট্রেনের বগিতে উঠে পরেন। কোর্ট স্টেশন হতে ট্রেন ছাড়ার হুইসেল শুনে বড় ষ্টেশনে অপেক্ষারত জনগন স্লোগান ধরেন, তোমার নেতা, আমার নেতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবÑশেখ মুজিব, মাইক ছিল তৃষিত বিশ্বাসের হাতে কখন-যে তার হাত থেকে অন্যের হাতে চলে গেল সে বুঝতে পরেনি। ইতিমধ্যে পুরো ট্রেনটি আমাদের দৃষ্টির মধ্যে চলে আসে, ষ্টেশনটি লোকে লোকারন্য, ঠাই ধরার জায়গা নেই, কেÑযেন মাইকে স্লোগান দিচ্ছেন সবাই তা- ধরছে, আমরা গোদামের ছাদের তলায় কোন রকমে দাঁড়ালাম। ট্রেন এসে স্টেশনে থামল, উপস্থিত নেতৃবৃন্দ একটি কামরার দিকে ছুটছেন, চেয়ে দেখি বঙ্গবন্ধু ট্রেন থেকে হাত নেড়ে অভিনন্দনের জবাব দিচ্ছেন।
বঙ্গবন্ধু ট্রেন থেকে নেমে দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জনতার সাথে হাত মিলাচ্ছেন আর মঞ্চের দিকে এগিয়ে আসছেন. আমরা স্লোগানরত ছিলাম, বঙ্গবন্ধু আমাদের থমিয়ে তিনি জনতার উদ্দেশ্যে স্বভাব সুলভ বক্তব্য শুরু করেন। ভাইসব পশ্চিম পাকিস্তানীরা ২৩ বছর ধরে আমাদের শোষন করছে। আমাদের উৎপাদিত পন্য পাকিস্তানী পেটুয়া গোষ্ঠীর নিকট থেকে দ্বি-গুন দামে কিনতে হয়। আমাদের উপার্জিত অর্থ দিয়ে ইসলামাবাদে নতুন রাজধানী বানিয়েছে। এদের শোষন-বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে হলে নৌকা প্রতিকে আপনারা সবাই ভোট দিবেন। ইত্যাদি বলে ১০-১২ মিনিটে ভাষন শেষ করে ট্রেনের দিকে এগুতে থাকেন, পূর্বের ন্যায় জনতার সাথে হাত মেলাতে মেলাতে ট্রেনের নিজ কামরার দরজায় দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। আমি ট্রেনের কাছাকাছি যেতে চেয়েও জনতার ভীড়ের জন্য বিফল হলাম। বঙ্গবন্ধু পশ্চিম দিকে তাকিয়ে এক আঙ্গুল উপর-নীচ করচ্ছেন। উৎসুক জনতা বঙ্গবন্ধুর আঙ্গুলের ঈশারা বুঝার চেষ্টা করছে। আমি চেয়ে দেখি স্টেশন লাগুয়া পশ্চিম দিকের রেইনট্রি গাছের দুই ডালে নেত্রকোণার বিখ্যাত দুই রশিক ছাত্রলীগ কর্মী সিরাজ ভাই ও মতি ভাই। বঙ্গবন্ধু তাদের নিয়ে রশিকতা করছেন ।
ইতোমধ্যে ট্রেন হুইসেল দিয়ে ধীরে-ধীরে পশ্চিম দিকে এগুতে থাকে। ট্রেনের গতি বাড়তে থাকে, জনতার জয়-বঙ্গবন্ধু স্লোগানের আওয়াজও বাড়তে থাকে। এক সময় ট্রেনটি আমাদের দৃষ্টির বাহিরে চলে যায়। আমাদেরও শ্লোগান থেমে যায়।
বাঙালী জীবন ধারন ও নিজেদের সমৃদ্ধ জাতি গঠনের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ১৯৭০ সালে ১ ডিসেম্বর রেডিওতে ভাষনে জনগনের নিকট ৬ দফা পূণঃব্যক্ত করে নৌকার পক্ষে ভোট চান। এই লক্ষে নেত্রকোণার আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা জনগণনের নিকট নৌকাকে জয়ী করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। নেত্রকোনার ৬টি প্রাদেশিক ও ৩টি জাতীয় পরিষদের সব কয়টি নির্বাচনী আসনে স্থানীয় জনগন নৌকার প্রার্থীদেরকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করেন।

 

তথ্যঃ  লাহোর প্রস্তাব পাকিস্তান অতপর ঃ বাংলাদেশ (এডভোকেট আনিসুর রহমান খান)
প্রবন্ধঃ নেত্রকোনায় বঙ্গবন্ধু (হায়দার জাহান চৌধুরী)

সাক্ষাৎকারঃ মোঃ সামছুজ্জোহা, (প্রাক্তন সভাপতি, জেলা ছাত্রলীগ).
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মোঃ আশরাফ আলী খান খসরু (প্রাক্তন সাধারন সম্পাদক, জেলা ছাত্রলীগ) ।

মোঃ মতিয়র রহমান খান (প্রাক্তন সাধারন সম্পাদক জেলা ছাত্রলীগ), মোঃ আঃ ওয়াহেদ, মোঃ নজরুল ইসলাম খান, মোঃ আব্দুর রহিম, খন্দকার আনিসুর রহমান ও মোঃ সিরাজ উদ্দিন।
লেখকঃ সভাপতি, শিকড় উন্নয়ন কর্মসূচী ও যুগ্ম সম্পাদক, জেলা প্রেসক্লাব নেত্রকোনা।