মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকতে চাই

প্রকাশিত: ২:৪২ অপরাহ্ণ , মে ২৯, ২০২০

রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে

ইয়ার্কি, ফাজলামি আর মশকরা শব্দগুলোর সঙ্গে কি সবাই পরিচিত? হ্যাঁ, এগুলো এখন করা হচ্ছে দেদারছে। অনেকের ধারণা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট মিস্টার ট্রাম্প মশকরা করেন, যখন তিনি কিছু বলেন। আমি মনে করি তিনিই একমাত্র বিশ্বনেতা যিনি ইয়ার্কি, ঠাট্টা, ফাজলামি বা মশকরা করেন না।

এই কারণে তাকে অনেকে পছন্দ করে না। তবে পৃথিবীর অনেক দেশের নেতারা ইয়ার্কি, ঠাট্টা, ফাজলামি বা মশকরা করে থাকেন, এমনকি বেশ ভালো মতোই করেন। যাই হোক আমার আজকের লিখা শুধু ইয়ার্কি, ঠাট্টা, ফাজলামি বা মশকরা নিয়ে নয় তবে তার উৎস নিয়ে।

যেমন গোটা বিশ্বকে লকডাউন করা হয়েছে এটা একটি উৎস যার কারণে ইয়ার্কি, ঠাট্টা, ফাজলামি বা মশকরার পরিমাণ বেড়েছে। আসুন কিছু তথ্য এবং যুক্তি দিয়ে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হই। সুইডেনে লকডাউন করা হয়নি কারণ সরকার জানে সুইডিশ জাতি এ নির্দেশ মানবে না। লকডাউনের যে অর্থ তা মেনে চলা ভীষণ কঠিন।

এর কারণ আমরা সমাজে একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমরা জড়িত। যেমন গতকাল রাতে বার্গারকিং-এ ঢুকে দুটো চিজ বার্গার অর্ডার দিয়েছিলাম। যে ছেলেটি বার্গার রেডি করলো তার হাতে গ্লাভস নেই, মুখে মাস্ক নেই, সে দিব্যি তার কলিগের সঙ্গে মনের আনন্দে কথা বলছে আর বার্গার প্যাকেট করছে।

এখন যদি তার কোভিড-১৯ পজিটিভ হয় তবে খাবারের সঙ্গে সেটা আমার কাছে সহজেই চলে এসেছে। যদিও আমি দূরত্ব মেনে চলেছি, কারও সঙ্গে হাত মিলাইনি বা লাইনের ফাঁকা জায়গাটি দেখে হুট করে ঢুকে পড়িনি। তারপরও কোভিড-১৯ যেহেতু ছোঁয়াচে রোগ সেক্ষেত্রে আমার দেহে প্রবেশ করতেই পারে।

সুইডেনে বারবার যেটা বলা হচ্ছে সেটা হলো অসুস্থ হলে যেন ঘর থেকে না বের হই এবং সতর্ক থাকি যেন আমার কারণে অন্য কারো ক্ষতি না হয়। যে বা যারা এ সময় অসুস্থতার কারণে কাজ থেকে বিরত থাকবে তাদের যাতে করে অর্থনৈতিক সংকট না হয় তার দায়ভার সরকার নিয়েছে। এরপরেও যদি কেউ নিয়ম অমান্য করে বা ভঙ্গ করে তাহলে কীভাবে সম্ভব তাকে প্রতিরোধ করা?

এক্ষেত্রে লকডাউন করা আর না করার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকতে পারে কি? সুইডেনে প্রথম দিকে অনেক ইয়াং বয়সের ছেলে-মেয়ে বুঝতেই পারেনি যে তাদের শরীরে ভাইরাস ঢুকেছে। তখন পরীক্ষা করার মত তেমন গ্রহণযোগ্য কোনো কিটও ছিল না, তাই রোগটি শনাক্ত করা কঠিন ছিল। এর ফলে অনেক বৃদ্ধ মানুষের মাঝে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে।

না জেনে ভুল করা আর জেনেশুনে ভুল করা কি এক কথা? এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ঘটনা জানার পরও আমরা যদি লকডাউনের নিয়ম কানুন মেনে না চলি তাহলে বুঝতে হবে আমাদের মনুষ্যত্বের অধঃপতন ঘটেছে। বাংলাদেশের লকডাউন বলতে কী বোঝানো হয়েছে তা আমি জানি না।

তবে ত্রাণ দিতে, ব্যাংক বা দোকানের সামনে লাইনে বা ধান কাটতে গিয়ে সেলফি তোলার জন্য যেভাবে উঠে পড়ে লেগেছে গোটা বিশ্বকে দেখানোর জন্য; কী মনে হয় তা দেখে? মনে হয় আমরা নিজেরা নিজেদের জীবন নাশের জন্য দায়ী।

সুইডেনে লকডাউন নেই তারপরও বাংলাদেশের মতো এমন আচরণ এখনও চোখে পড়েনি। সরকার বলছে ঈদে কাউকে বাড়ি যেতে দেওয়া যাবে না। এ খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই শহর ছেড়ে গ্রামের পথে রওনা দিয়েছে।

আমার উপরের ছবি দেখলে কী মনে হয়? আসল যে উদ্দেশ্য লকডাউনের তা কেউ মেনে চলছে না। তাহলে শুধু শুধু দেশের মানুষকে কর্ম থেকে বিরত রেখে, না খাইয়ে এবং নানা সমস্যায় ফেলে নতুন রোগ-ব্যাধি তৈরি করতে সাহায্য করার পেছনে কী যুক্তি থাকতে পারে, যদি একে ইয়ার্কি, ঠাট্টা, ফাজলামি বা মশকরা করা না বলা হয়?

যাইহোক না কেন, সব শেষে এটাই বলতে চাই তা হলো, কারও মনে কষ্ট না দিয়ে বা স্বার্থপর না হয়ে চিন্তাশীল এবং সহায়ক হিসাবে আমরা যেন সমাজের সব কাজই করতে পারি। অতীতের ভুল ত্রুটির পুনরাবৃত্তি না করে আমরা যেন একে অপরের পাশে থাকতে পারি।

আমাদের চিন্তা চেতনা অন্যের সঙ্গে যখন না মেলে তখন আমরা যেন নম্রতার সঙ্গে তা মেনে নিতে পারি (agree to disagree)। আমরা যেন ভুলে না যাই বিপদ জীবনে একবার নয় বারবার আসবে এবং সকলে মিলে তার মোকাবিলা করার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। আমরা মানুষ হতে চাই, মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকতে চাই। আমাদের জ্ঞান আমাদেরকে মানুষ হতে সাহায্য করুক।

রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে, [email protected]