আজ প্রধানমন্ত্রী বেইজিং যাচ্ছেন

প্রকাশিত: ২:৩৬ পূর্বাহ্ণ , জুলাই ৮, ২০২৪
ফাইল ফটো

চীনের প্রিমিয়ার অব দ্য স্টেট কাউন্সিল লি শিয়াংয়ের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চার দিনের সরকারি সফরে আজ সোমবার বেইজিং যাচ্ছেন। দ্বিপক্ষীয় এ সফরে কোনো চুক্তি সই হবে না। তবে ২০টি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর উপলক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সময় মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দু’দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হবে, কোনো চুক্তি হচ্ছে না। চীন আমাদের বড় উন্নয়ন সহযোগী। প্রচুর চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশে রয়েছে। গত কয়েক দশকে চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছে। আমাদের উন্নয়নের বিষয়টি মূল অগ্রাধিকার পাবে। সেই সঙ্গে গুরুত্ব পাবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা। বাংলাদেশ কৌশলগত সম্পর্ক আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে চায় কিনা– এ প্রশ্নে হাছান মাহমুদ বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তবে সেটি নিবিড় না কম নিবিড়, তা বলতে চাই না। দু’দেশের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। অবশ্যই এ সফরে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।

চীনের কৌশলগত অংশীদারিত্ব সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া নিয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দেখুন, এটি কে বলেছে কৌশলগত? আপনি বলছেন? ২০১৬ সালের পরে আমাদের সম্পর্ক আরও উন্নত…, আমাদের সম্পর্ক দ্বিতীয় পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে আমরা বলতে পারি ২০১৬ সালের পরে। এইটুকু বলতে পারি।’ চীনের সঙ্গে কী ধরনের ঋণ সহায়তা বা চুক্তি হবে– জানতে চাইলে তিনি বলেন, সমঝোতার তালিকায় কোনো ঋণ সহায়তা নেই। অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে দুই দেশের সমঝোতা স্মারক সই হবে। সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব বলা যাচ্ছে না, কারণ কোনো চুক্তি হচ্ছে না। যেহেতু অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে সমঝোতা হবে, তাই ভবিষ্যতে চাহিদার ভিত্তিতে বাংলাদেশের প্রয়োজনের নিরিখে সহযোগিতা হতে পারে। দেশের রিজার্ভ নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রিজার্ভ এখন ভালোর দিকে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে বাড়ছে।
বাজেট সহায়তার জন্য বাংলাদেশের প্রস্তাব নিয়ে ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূতের মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, প্রয়োজনের নিরিখে বাংলাদেশের শর্তগুলো পূরণ হলেই সহযোগিতা গ্রহণ করা হয়। সমঝোতার তালিকায় এ ধরনের কোনো প্রস্তাব নেই। এটি নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হতে পারে। চীনকে এ ধরনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে তাঁর জানা নেই।

ড. হাছান মাহমুদ বলেন, যে কোনো বিদেশি ব্যাংক বা রাষ্ট্র বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অর্থ রাখতে পারে। তবে এখানে দেখার বিষয় রয়েছে বাংলাদেশ সম্পর্ক বিবেচনায় কাকে তা রাখতে দেবে। চীনের তিব্বত ও তাইওয়ান নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান কী– জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ যে কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতায় বিশ্বাস করে।
সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও), চীনের বৈশ্বিক উন্নয়ন সহযোগিতা (জিডিআই) নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান জানতে চাইলে তিনি বলেন, বহুপক্ষীয় ফোরামগুলো নিয়ে এ মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। বহুপক্ষীয় ফোরামগুলোতে অংশ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে চীনসহ বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে।

তিস্তা নিয়ে চীনের প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে হাছান মাহমুদ বলেন, তিস্তা বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের যৌথ নদী। তিস্তার যৌথ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে ভারত একটি প্রস্তাব দিয়েছে। তারা একটি কারিগরি দল পাঠাবে বলে আমাদের জানিয়েছে। বাংলাদেশে এসে ওই কারিগরি দল যৌথভাবে সমীক্ষা করে কী করা উচিত, সে ব্যাপারে পরামর্শ দেবে। যেহেতু দুই দেশের যৌথ নদী এবং যাদের সঙ্গে যৌথ নদী তাদের প্রস্তাব আছে, সুতরাং আমাদের সেই প্রস্তাবটি প্রথমে বিবেচনা করতে হবে স্বাভাবিকভাবেই। চীনও এ ক্ষেত্রে প্রস্তাব দিয়েছে, সেটি ভালো। যেহেতু ভারত প্রস্তাব দিয়েছে, আমরা মনে করি সেটি ভালো দিক। তারা (চীন) যদি আলোচনায় আনে, তাহলে তো আলোচনা হবে।

বাণিজ্য বৈষম্য নিয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বৈষম্য অনেক। বাংলাদেশি পণ্য আরও বেশি করে নিতে শুল্ক ও অশুল্ক বাধাগুলো যেন দূর করা হয় এবং চীনের আমদানিকারকদের যাতে এখান থেকে পণ্য সংগ্রহে আরও উৎসাহী করা হয়, সে বিষয়ে অনেক গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। ব্যবসা ও অর্থনৈতিক খাতে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সহযোগিতার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে।

সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ১০ জুলাই বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলসহ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। এর পর দুই দেশের সরকারপ্রধানের উপস্থিতিতে প্রায় ২০টির মতো সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে এবং কিছু প্রকল্প উদ্বোধনের ঘোষণা দেওয়া হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং খাত, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, ডিজিটাল ইকোনমি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি খাতে সহায়তা, ষষ্ঠ ও নবম বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ নির্মাণ, বাংলাদেশ থেকে কৃষিপণ্য রপ্তানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ প্রভৃতি বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা আছে। ৮ থেকে ১১ জুলাই সফরকালে প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রেসিডেন্ট, প্রিমিয়ার অব দ্য স্টেট কাউন্সিল, সিপিপিসিসির জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা, বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র সচিবসহ উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হবেন।

তিনি জানান, মঙ্গলবার সকালে প্রধানমন্ত্রী এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিন লিকুনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। এর পর তিনি সাংগ্রিলা সার্কেলে অনুষ্ঠেয় ‘সামিট অন ট্রেড, বিজনেস অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট অপরচুনিটিজ বিটুইন বাংলাদেশ অ্যান্ড চীন’ শীর্ষক সম্মেলনে অংশ নেবেন। বাংলাদেশের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল সম্মেলনে যোগ দেবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সেদিন দুপুরে প্রধানমন্ত্রী চায়নিজ পিপলস পলিটিক্যাল কনসাল্টেটিভ কনফারেন্সের (সিপিপিসিসি) ১৪তম জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান ওয়াং হুনিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং বিকেলে ঐতিহ্যবাহী তিয়েনআনমেন স্কয়ারে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করবেন। রাতে তিনি বেইজিংয়ের বাংলাদেশ দূতাবাস আয়োজিত নৈশভোজে অংশগ্রহণ করবেন।

সফরের তৃতীয় দিনে ১০ জুলাই প্রধানমন্ত্রী গ্রেট হল অব দ্য পিপলে তাঁর সম্মানে আয়োজিত অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান শেষে চীনের প্রিমিয়ার অব দ্য স্টেট কাউন্সিল লি শিয়াংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলসহ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। এর পর দুই দেশের সরকারপ্রধানের উপস্থিতিতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং কয়েকটি প্রকল্প উদ্বোধনের ঘোষণা হবে। বুধবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর উপলক্ষে দুই দেশ যৌথ বিবৃতি দেবে। ১১ জুলাই বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রীর চীন ত্যাগ করে দুপুরে ঢাকায় পৌঁছার কথা।

Loading