‘সুযোগপ্রাপ্ত ও বঞ্চিতদের মধ্যে বৈষম্য বাড়ছেই’

প্রকাশিত: ৬:১৮ অপরাহ্ণ , আগস্ট ২৬, ২০২২

বাংলাদেশের মানুষ অধিকার সম্পর্কে কতটা সচেতন? মত প্রকাশের স্বাধীনতাই বা কতটুকু? অধিকার কী ক্ষমতার কাছে অসহায়? এসব বিষয় নিয়ে ডয়চে ভেলের সঙ্গে কথা বলেছেন ইমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী৷

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : অধিকার সম্পর্কে মানুষ ব্যক্তিগতভাবে সচেতন না৷ যখন মানুষ সমষ্টিগত হয় তখন তারা বেরিয়ে পড়ে, অধিকার সম্পর্কে কথা বলে৷ কিন্তু ব্যক্তি মানুষের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা নাই৷ একেবারে নাই বলা ঠিক হবে না, কম আরকি৷ যতটা থাকা দরকার ততটা নাই৷ এই জন্য নাই, কারণ ব্যবস্থাটা অনুকূলে নাই৷ মানুষকে অধিকার সচেতন করার ব্যাপারে ব্যবস্থাটা সমর্থন করে না৷ এই ব্যবস্থা মানুষের অধিকারের ধারণাটা ক্রমাগত সংকুচিত করে আনছে৷ সেজন্য মানুষ ব্যবস্থাটাকে মেনে নেয়৷ মনে করে যে, এটাই স্বাভাবিক৷ যেমন ধরা যাক বিচার৷ বিচার ব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা নেই৷ বিচার পাওয়া তো মানুষের অধিকার৷ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করার ক্ষেত্রে মানুষের মনে অনেক সংকোচ৷ অধিকাংশ মানুষই তো মত প্রকাশ করতে চায় না, কিন্তু যারা মত প্রকাশ করতে চায় তাদের মনের মধ্যে অনেক সংকোচ থাকে৷ যেমন ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের কারণে মানুষের মনের মধ্যে এক ধরনের সংকোচ ও শঙ্কা দেখা দেয়৷ কী কথা বলতে, কী কথা বলব তারপর আমি বিপদে পড়ব৷

অধিকার কি কেবল চলাফেরা আর কথা বলার স্বাধীনতা না কি অন্যকিছু?

অধিকার তো সবকিছুই৷ প্রাথমিকভাবে আমরা যে মৌলিক অধিকারগুলোর কথা বলি, অন্ন বস্ত্র বাসস্থান চিকিৎসা শিক্ষা- এগুলো তো সর্বজন স্বীকৃত মানবিক অধিকার৷ অধিকাংশ মানুষই তো এগুলো থেকে বঞ্চিত৷ যেমন ধরা যাক বাসস্থান৷ দেশের কত মানুষের বাসস্থান নেই৷ তারা কোথায় থাকে ঠিক নেই৷ এরপর চিকিৎসা সেটা তো এখন ব্যয়বহুল হয়েছে৷ রাষ্ট্রের তো মানুষের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার কথা৷ এটা তো অধিকার৷ এগুলো তো সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে৷সুস্থ মানুষ তো তাও কিছু অধিকার ভোগ করে৷ কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধী বা অসুস্থ মানুষ কী সেই অধিকারটুকু ভোগ করার সুযোগ পায়?

মোটেই না৷ অসুস্থ্য হওয়া বা প্রতিবন্ধী হওয়াটাকে আমাদের সমাজ অপরাধ মনে করে৷ এটার জন্য যে সে দায়ি না- বিষয়টা সেভাবে দেখা হয় না৷ মনোভাবটা এমন যে, সে একটা অপরাধী৷ ভাবটা এমন, সে অপরাধ করার কারণে বিকলাঙ্গ হয়েছে, অসুস্থ হয়েছে৷ এটা অত্যন্ত নির্দয় মনোভাব৷

অধিকার কি ক্ষমতার কাছে অসহায়?

অবশ্যই৷ অধিকার তো ক্ষমতার সঙ্গেই সম্পর্কিত৷ যার ক্ষমতা আছে সে অন্যের অধিকার কেড়ে নেয় বা অন্যের অধিকারের উপর আধিপত্য বিস্তার করে৷ এটা তো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যেই আছে৷ মানুষের অধিকারগুলো তো রাষ্ট্রেরই দেওয়ার কথা৷ রাষ্ট্র যে এগুলো দিচ্ছে না, সেটা আমাদের জন্য দুঃখজনক৷

আমরা দেখি যে রাজনৈতিক দলগুলো বিরোধীদলে যখন থাকে তখন তারা মানুষের অধিকারের কথা বলে৷ কিন্তু তারাই আবার সরকারে গেলে সেই অধিকার হরণের চেষ্টা করে, এই বৈপরিত্য কেন?

কেউ যখন বিরোধী দল থেকে সরকারে যায় তখন তারা ভুলে যায় আগে কি বলেছিল৷ গোটা ব্যবস্থাটাই পুঁজিবাদী আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা৷ রাষ্ট্র এই অধিকারগুলো দেবে না৷ ফলে যারা সরকারে যাচ্ছে তারা ওই ব্যবস্থার অধিনেই চলে যাচ্ছে৷ তখন তারা ওই ব্যবস্থাটাকে রক্ষা করতে চায়৷ সেজন্য অল্প লোক সুবিধা পায়, অধিকাংশ লোক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়৷ এটা আমাদের রাষ্ট্রীয় সামাজিক ব্যবস্থার বিধান৷ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় কে এল আর গেল তাতে অধিকারের সুরক্ষা হয় না৷ ফলে সরকার বদলে অধিকাংশ মানুষের জীবনে কোন পরিবর্তন ঘটে না৷ এই ধরুন চা শ্রমিকদের কথাই বলি৷ তারা দৈনিক ১২০ টাকা মজুরি পায়৷ তাদের কী একটু ভালভাবে জীবন-যাপন করার অধিকার নেই?

এটা তো অমানবিক৷ আমার জ্ঞানের মধ্যেই আসে না যে, একটা লোক ১২০ টাকা দিয়ে একটা দিন কীভাবে পার করবে? যারা একটু অবস্থা সম্পন্ন তাদের তো নাস্তা খেতেই ১২০ টাকা লাগে৷ তাহলে কি দাঁড়াল ব্যাপারটা৷ তারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, দূরে থাকে৷ ফলে তাদের খবর আমরা মধ্যবিত্তরা জানি না, চিন্তাও করি না৷ এটা তো ভয়াবহ পরিস্থিতি৷

এ তো গেল, মানুষের অধিকারের কথা৷ প্রাণীদের অধিকারের ব্যাপারে আমরা কতটা সচেতন?

যেখানে মানুষের অধিকার নেই বা সংকুচিত, সেখানে প্রাণীদের অধিকারও সংকুচিত হবে সেটাই তো স্বাভাবিক৷ গোটা ব্যবস্থাটাই অমানবিক ব্যবস্থা৷ অধিকার বঞ্চিত মানুষ প্রকৃতির উপর অত্যাচার করে, অন্য প্রাণীদের উপর অত্যাচার করে৷ এটা সেই ব্যবস্থা যেখানে মানুষও অধিকার পাই না, প্রাণীরাও পাই না৷ এখানে বঞ্চনাটা খুব একটা স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গেছে৷ প্রাণীদের উপর অত্যাচার এখন চরম আকার ধারণ করেছে৷

সরকারি প্রতিষ্ঠান বা আদালতে মানুষ কতটা অধিকার ভোগ করতে পারে?

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তো আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান৷ এটা পুরানো আমলাতন্ত্র৷ এটা বদলায়নি৷ বরং আরও কঠিন হয়েছে৷ এখানে মানবিক আচরণ পাওয়া যায় না৷ আদালতে যে বিচারের জন্য কেউ যাবে সেখানে যেতে অনেক টাকা লাগে৷ আদালতে গেলে যে বিচার পাওয়া যাবে তার নিশ্চয়তা তো পরের ব্যাপারে৷ আদালতে যাওয়াটাই তো অনেক ব্যয়বহুল৷ সেখানে গেলে যে ঝামেলায় পড়বে সে কারণে অনেকেই বলে বিচার চাই না৷ বিচার কার কাছে চাইব৷ পরিস্থিতি এখন এমন৷

মানুষের অধিকার হরণ না করে কি ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না?

সেটাই তো উচিত৷ কিন্তু আমাদের যে ব্যবস্থা সেটা তো বৈষম্যমূলক৷ এখানে কিছু লোক সুবিধা পাবে এবং অধিকাংশ লোক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে৷ সেজন্য দেখা যায়, ক্ষমতায় যারা যায় তারা সুবিধাপ্রাপ্ত৷ সেই সুবিধাগুলো তারা ভোগ করতে চায়৷ সেজন্যই অধিকাংশ মানুষ বঞ্চিত হয়৷ এটা কোন ব্যক্তিগত ব্যাপার না বা আমাদের ইচ্ছা বা অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে না৷ গোটা ব্যবস্থাটাই এমন৷ সুযোগ প্রাপ্ত ও সুযোগ বঞ্চিতদের মধ্যে বৈষম্য বাড়ছেই৷

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের অধিকার সচেতন করতে কতোটা ভূমিকা পালন করছে?

তারা করে৷ তারাই তো তুলে ধরে৷ মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ নানা ইস্যুতে তারাই সোচ্চার হয়৷ কিন্তু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সীমাবদ্ধতা হল, তারা সংস্কারমূলক৷ তারা সংস্কার চায় কিন্তু ব্যবস্থাটা এমন নেই৷ এই ব্যবস্থার একটা মৌলিক পরিবর্তন দরকার৷ সেটা তারা বলে না৷ তারা এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখেই এর মধ্যে কতটা বাড়ানো যায় সেই চেষ্টা করে৷ তারা মনে করে, এই ব্যবস্থাটা টিকিয়ে রাখার জন্য সংস্কার দরকার৷ একটা গণতান্ত্রিক সমাজ এবং রাষ্ট্র গঠন করা দরকার৷ যে রাষ্ট্রে মানুষে মানুষে অধিকারে কোন বৈষম্য থাকবে না৷ যেখানে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটবে৷ যেখানে জনপ্রতিনিধিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্টিত হবে৷ সত্যিকারের জনপ্রতিনিধিদের৷ ওই জায়গাটাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের যাবার কথা না বা তারা যেতেও পারে না৷

মানুষকে কীভাবে আরও বেশি অধিকার সচেতন করা যায়?

যাদের আমরা বিবেকবান বা বুদ্ধিমান মনে করি তারা যতটা সোচ্চার হবে, আর সোচ্চার হতে গেলে আন্দোলন করতে হবে৷ তারা যদি আন্দোলন করে তাহলে পরিবর্তন হবে৷ কিন্তু এই আন্দোলনের আগে একটা সাংস্কৃতিক প্রস্তুতিও দরকার৷ আগে মানুষের সাংস্কৃতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার৷ আন্দোলন ছাড়া ভরসার কোন জায়গা নেই৷ – ডয়চে ভেলে

Loading