মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লালের কাছে খোলা চিঠি

ওষুধ কোম্পানির ঘুষ বাণিজ্য, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি

প্রকাশিত: ১১:২০ পূর্বাহ্ণ , ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২৪

সাধারণ মানুষের কিছু দুর্ভোগ আপনার সদয় বিবেচনার জন্য এখানে তুলে ধরতে এ নিবেদন। দেশের সাধারণ মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে কতিপয় লোভী মানুষের ষড়যন্ত্রে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। তাদের অসহায়ত্বের কথা বলার জন্য এ নিবেদন।

আপনি অতি সম্প্রতি মন্ত্রী হয়ে নেয়া উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। আপনার কথায় মানুষ আশান্বিত হয়ে উঠেছে। ব্যবস্থাপত্রে সম্প্রতি ল্যাবএইড ফার্মার ওষুধ না লেখায় হামলার শিকার চিকিৎসককে দেখতে যাওয়ার ঘটনা ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। ওষুধ কোম্পানির উৎপাদিত বিভিন্ন ওষুধ নিয়ে চিকিৎসকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ান মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ। অর্থাৎ চিকিৎসকে বুঝিয়ে সন্তুষ্ট করে নিজ কোম্পানির ওষুধ বিক্রিতে প্রলুব্ধ করেন তিনি। এটা খুবই সাধারণ বিষয় যে, কোম্পানির ওষুধ লিখতে চিকিৎসকদের বিশেষ উপহার দেয়া হয়। কোম্পানির এই উপহার শ্বশুর বাড়ীর উপহারের চেয়েও আকর্ষনীয় লোভনীয়। আবার চিকিৎসক উপহার নিয়ে ওষুধ না লিখলে অন্য সংকট তৈরী হয়। একদিকে ঐ রিপ্রেজেন্টিভ কোম্পানির কাছে ওষুধ না লেখার যথাযথ কারণ বলতে না পারলে চাকরি থাকবে না। তখনি অসন্তোষ তৈরী হয়। এভাবে ছোট থেকে অনেক বড় ঘটনা ঘটে যায়, যা কখনো কখনো গণমাধ্যমের সংবাদ শিরনাম হয়ে আসে। যেটা এখন আমরা দেখছি।

তবে এরকম বেশিরভাগ ঘটনা রয়ে যায় অন্তরালে। হাসপাতাল বা চিকিৎসকের চেম্বারে এই বিক্রয় প্রতিনিধিদের ব্যবহারে সাধারণ মানুষ অনেক ভোগান্তির মুখে পড়েন কিন্তু বলার কোন সুযোগ নেই।

দেশে এখন সাধারণ মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাস্থ্যঝুঁকি তথা চিকিৎসক ও ওষুধ সংকট। অর্থাৎ দেশের বেশির ভাগ মানুষ কোন না কোনভাবে এ সমস্যার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। প্রতিদিন সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্য নিয়ে নানা রকম ভোগান্তিতে পড়ছেন। যার খুব কম সংখ্যক গণমাধ্যমে উঠে অসে। দেশের বেশির ভাগ মানুষের সংকট কেন যেন সেরকমভাবে গণমাধ্যমে ঠাঁই পায়না সেটা বোধগম্য নয়। কেউ ভেজাল খাদ্য খেয়ে মরণব্যাধি রোগ তৈরি করেছেন, আবার মরণ ব্যাধির জন্য কেউ চিকিৎসা করাতে পারছেন না অর্থসংকটে। আবার বেশি দামের বা ভেজাল ওষুধে অনেকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

ওষুধ কোম্পানিগুলোর বাজার দখলের তৎপরতা নিয়ে আপনি নিশ্চয় সম্যক আবগত আছেন। বাংলাদেশে চিকিৎসা ক্ষেত্রে সফলতা, ব্যর্থতা, সমস্যা, সংকট অর্জন সবকিছু সম্পর্কে আপনি নিরবে কাজ করেছেন। অর্থাৎ আপনি সারাজীবন কাজ করেছেন, অসহায় সাধারণ মানুষের জন্য চিন্তা করেছেন এবং সমাধানের পথ করে দিয়েছেন। আপনার কাজ আমরা যারা গণমাধ্যমে কাজ করি তারা অবগত আছি। এসব বিষয় নয় আজকের বিষয় ওষুধ কোম্পানিরগুলোকে একটা শৃংখলার মধ্যে আনা যায় কিনা সেটা বিবেচনা করা।

এখন ওষুধ কোম্পানির উপহার বাণিজ্য নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে অনেক যুক্তিতর্ক থাকতে পারে, আমি সেখানে যাবো না। একটা কথা সহজেই বলা যায়, বড় বড় চিকিৎসকেরা উপহার না নিলেই তো সংকট কেটে যায়। যতো সহজে বলা যায় কাজটা অত সহজ নয়। শোনা যায়, চিকিৎসক উপহার না নিলেও কায়দা কানুন বা কৌশলে চাপ প্রয়োগ করেও এসব উপহার খাওয়ানো হয়। আবার সুবিধাভোগী দালাল গোষ্ঠী ও তৎপর চিকিৎসক মেনেজ করার জন্য। একথা আমরা সবাই জানি প্রেসক্রিপশনে ওষুধের নাম লেখার জন্য চিকিৎসকে দেওয়া উপহারের টাকা ওই ওষধের দামের সঙ্গে যোগ করা হয়। অর্থাৎ উপহারের বাড়তি টাকা সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়। এর ফলে ওষুধের উৎপাদন ব্যয় সামান্য হলেও বাজার মূল্য অস্বাভাবিক হয়ে কোম্পানিগুলোর অনৈতিক বিপনন নীতির কারণে। এটা আমাদের দেশে এখন স্পষ্ট সব খরচ বাদে ওষুধ কোম্পানিগুলোর নিট মুনাফা ৪০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশের বেশি। যার ফলে কোনভাবে একটা ওষুধ কারখানা করতে পারলেই কয়েক বছরে ঐ কোম্পানি গ্রুপ অব কোম্পানিতে রূপ লাভ করে।

আপনি জানেন বা সচেতন সবাই জানেন ওষুধ কোম্পানিগুলো রোগীর প্রেসক্রিপশনে তাদের তৈরি ওষুধের নাম লেখানোর জন্য চিকিৎসকদের ব্যাংক একাউন্টের চেক, নগদ টাকা, বিদেশ ভ্রমণ, দামী উপহার, মাসোহারা, ফ্রিজ, টিভি, এসি, ফ্ল্যাট, গাড়ি বা গোপন উপহার দিয়ে চলেছে। এখন এসব দেয়া-নেয়া পক্ষকে আইনের আওতায় আনা যায়না কেন? আমরা জানি, এই দুই পক্ষ যে শুধু নীতি নৈতিকতা বিসর্জন দিচ্ছে তা-ই না, অনেক ঘৃণ্য অমানবিক কাজেও শামিল হচ্ছে।

জাতীয় ওষুধ নীতি ২০১৬-এর ৪.৯ (ক) ধারায় উল্লেখ আছে, ‘ঔষধ উৎপাদনকারী ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক অনুমোদিত ‘‘কোড অব ফার্মাসিউটিক্যালস মার্কেটিং প্র্যাকটিসেস’’ অনুযায়ী তাদের বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করবে।’

এ বিধিমালার ১৯.১ ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, ‘কোনো পণ্যের বিক্রি প্রসারের উদ্দেশ্যে চিকিৎসাপেশার সঙ্গে জড়িত কাউকে কোনো ধরনের উপহার বা আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া বা তার প্রস্তাবও দেওয়া যাবে না।’

বিধিমালার ১৯.২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ঔষধপণ্যের বিক্রি প্রসারের উদ্দেশ্যে চিকিৎসাসেবায় জড়িতদের চিকিৎসার কাজে সহায়তা করে- এমন কিছু উপহার দেওয়া যাবে, তবে সেটা অযৌক্তিক রকমের দামি হতে পারবে না।’

অথচ ওষুধ কোম্পানি ও চিকিৎসকরা দামি উপহার দেওয়া-নেওয়ার মাধ্যমে সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অপরাধও অবলীলায় করে চলেছে। এটা একদিকে অনৈতিক ও অবৈধ বলা যায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য, দেশে নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা ১ লাখ ৮ হাজার। দেশে এখন বিএমডিসির নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা হবে ১ লাখ ২০ হাজার। দেশে ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানির সংখ্যা প্রায় ২৯৫টি; এর মধ্যে চালু আছে ২২০টি। এদের মধ্যে প্রতিদিনে, প্রতিমাসে বা প্রতিবছরে কী পরিমাণ ঘুষ লেনদেন হচ্ছে, তা বের করা যেমন অসম্ভব। তেমনি ওষুধের দামের সঙ্গে সেটা যুক্ত হয়ে ঠিক কতটা দাম বেড়ে যাচ্ছে, সেটা বের করাও প্রায় দুঃসাধ্য কাজ। তবুও বলা যায় এই অংক হাজার কোটি টাকার কম নয়। কোম্পানি ‘উপহার’ বললেও অন্যরা অবশ্য এটিকে ঘুষ হিসেবেই মনে করেন।

কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে ওষুধের দামের ১০ শতাংশ ডাক্তারদের দেওয়া এই ঘুষের অংশ বলে দাবি করা হয়। আর সব খরচ বাদ দিয়ে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কোম্পানির নিট মুনাফা থাকে বলা হচ্ছে। অর্থাৎ তাদের দাবি মতেই, ওষুধের দামের অর্ধেক চলে যাচ্ছে ডাক্তার আর কোম্পানি মালিকের পকেটে; আর বাকি অর্ধেক নানা খাতের খরচে। কিন্তু আমরা জানি, বাস্তবে ডাক্তারের ঘুষের অংশ আরও বেশি এবং ওষুধের উৎপাদন খরচের অংশ আরও কম। এভাবে আরও দেখা যায়, ডাক্তারদের লোভ আর কোম্পানি মালিকদের অতিমুনাফার লিপ্সা- এই দুটি না থাকলে অসহায় রোগীরা ওষুধ কিনতে পারতেন প্রায় অর্ধেক দামে।

– সাইফুল ইসলাম

Loading