ঈমান বাঁচাতে তাজিকিস্তানের মুসলমানদের ত্যাগ

প্রকাশিত: ১১:১৩ পূর্বাহ্ণ , জুলাই ১৭, ২০২০

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
তাজিকিস্তানের বেশির ভাগ জনগণ তাজিক জাতির লোক। তাই এটি ‘তাজিকিস্তান’ অর্থাৎ তাজিক জাতির আবাসস্থান হিসেবে পরিচিত। এখানকার লোকেরা তাজিক নামের ফারসি ভাষায় কথা বলে। জনসংখ্যা ৭৭,৬৮,৩৮৫ জন। ২০০৯ সালের মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের হিসাব মতে, দেশটির জনসংখ্যার ৯৮ শতাংশ মুসলমান, যাদের ৯৫ শতাংশ সুন্নি ও ৩ শতাংশ শিয়া। এ ছাড়া রয়েছে কিছু সুফি মনোভাবের লোক। সুন্নিদের বেশির ভাগই হানাফি মাজহাবের অনুসারী। তবে শিয়া মতাবলম্বীদের দাবি অনুযায়ী ২০১০ সালের পর এক থেকে দুই বছরের ব্যবধানে বিস্ময়করভাবে শিয়া মতাবলম্বীদের হার ১১ থেকে বেড়ে ৩৩.৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। নিরপেক্ষ কোনো সূত্রে এ তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

তাজিকিস্তান দক্ষিণ-পূর্ব-মধ্য এশিয়ার একটি স্থলবেষ্টিত প্রজাতন্ত্র। এর উত্তরে রয়েছে কিরগিজস্তান, উত্তরে ও পশ্চিমে উজবেকিস্তান, পূর্বে গণচীন ও দক্ষিণে আফগানিস্তান। এখানকার রাজধানী দেশের বৃহত্তম শহর দুশানবে এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর হলো খুজন্দ। যেখানে অনেক বড় বড় আলেম ও ওলীদের জন্ম হয়েছে। আল্লামা রুমির (রহ.)-এর শায়েখ খাজা শামছুদ্দীন তিবরিজের আধ্যাত্মিক গুরু কামালুদ্দীন খুজন্দি (রহ.) এখানকার সন্তান বলে ধারণা করা হয়। এটি ‘মা-ওয়ারাউন নহর’-এর বিস্তীর্ণ এলাকার অংশ ছিল। একসময় উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তানের পুরো এলাকা একসঙ্গে ছিল। হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীতে মুসলমানরা এই অঞ্চল জয় করে নেয়। পরবর্তী সময়ে ১৮৬৮ সালে রুশ বাহিনী বুখারা আমিরাতকে পরাস্ত করার মাধ্যমে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এর ফলে তাত্ত্বিক দর্শনের ভিত্তিতে প্রথম বাস্তব সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের সৃষ্টি হয় ১৯১৮ সালে। যার প্রতিবাদে বুখারার ইব্রাহিম বেগের নেতৃত্বে মুসলমানরা ১৯৩১ সাল পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যায়; কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। ১৯৩১ সালে তাজিকিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি অংশে পরিণত হয়।

সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। সব মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া হয়, নামাজ পড়া নিষিদ্ধ করা হয়। দ্বিনি শিক্ষা তো দূরের কথা, কোরআন শরিফ নিজের কাছে রাখাও সে যুগে অপরাধ বলে সাব্যস্ত করা হতো। কোনো আলেম প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেই তাঁকে অত্যন্ত ভয়ংকর মৃত্যুর মুখে পড়তে হতো। প্রায় ৭৪ বছর মুসলমানরা এই কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে পার করেছে; কিন্তু সেখানকার ওলামায়ে কেরাম এত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও ইসলামকে টিকিয়ে রাখার জন্য নজীরবিহীন ত্যাগ করেছেন। তাঁরা লুকিয়ে লুকিয়ে নামাজ আদায় করতেন, দ্বিনি শিক্ষা দিতেন। গভীর রাতে যখন মানুষ স্বপ্নের রাজ্যে বিচরণ করত, তাঁদের কামরা তখন দ্বিনি ইলমের আলোয় আলোকিত হয়ে থাকত। তাঁরা আরামের ঘুমকে বিসর্জন দিয়ে ছাত্রদের ইলম শিক্ষা দিতেন। যার ফলে ৭৪ বছর নির্যাতনের চাকায় পিষ্ট হয়েও তাঁরা নিজেদের ঈমান-আমল ঠিক রেখেছিলেন।

অবশেষে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে এটি স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার ঠিক পর পরই দেশটিতে সাম্যবাদী সরকার ও ইসলামপন্থীবিরোধী দলগুলোর মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ১৯৯৭ সালের জুন মাসে দুই পক্ষ একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে।

বর্তমান অবস্থা : তাজিকিস্তানের জনগণ ধর্মভীরু। তারা নিজেদের মতো করে ধর্মচর্চা করে থাকে। বিশেষ করে পাশে আফগানিস্তান থাকায় সেখানকার ভাবধারায় প্রভাবান্বিত হয়ে ধর্মচর্চার প্রভাব অত্যধিক। বহু পবিবারের শিশুরা বিদেশে, বিশেষ করে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে গিয়ে মাদরাসায় শিক্ষা গ্রহণ করে। কিন্তু সে দেশের সরকার কট্টর সেক্যুলার। ২০০৫ সালে দেশটির সেক্যুলার স্কুলগুলোয় মেয়েদের হিজাব পরিধানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু দেশটির নারীরা নিজেদের ঐতিহ্য হিসেবেই হিজাব পরে থাকেন। কিছু ক্ষেত্রে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও তাজিকিস্তান সরকারের কিছু উদ্যোগ বিশ্বের মুসলিমদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, তাজিক সরকার ২০০৯ সালকে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বর্ষ হিসেবে পালন করেছে। সে বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আলেম-ইসলামী চিন্তাবিদদের আমন্ত্রণ জানানো হয় একটি আন্তর্জাতিক সিম্পোজিয়ামে।

২০১০ সালে বিশ্ব ইসলামী সংস্থা ওআইসির একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় তাজিকিস্তানের রাজধানী দুশানবেতে। এতে বিশ্বের ৫৬টি মুসলিম দেশের প্রতিনিধিরা যোগদান করেন। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে রাজধানী দুশানবেতে। সব মিলিয়ে তাজিকিস্তানের মুসলমানরা এগিয়ে যাচ্ছে।