ইসলামে ভিন্ন মতের মানুষের সম্মান

প্রকাশিত: ১:১২ অপরাহ্ণ , অক্টোবর ১৬, ২০২২

আহনাফ আবদুল কাদির

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে নানা শ্রেণিপেশার মানুষ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে নানা পথ ও মতের মানুষ। বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষ মিলে একই সমাজ ও রাষ্ট্রে বসবাস করে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী।

এভাবে কোনো অমুসলিম ও ইসলামবিরোধী ব্যক্তিও হতে পারে মুসলমানদের নিকটতম প্রতিবেশী। ধর্ম-বর্ণ-পথ ও মত ছাপিয়ে সবার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। এমনকি যারা ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি বিরোধী মনোভাব রাখে, তাদের প্রতিও ইসলাম স্বভাবসুলভ সুন্দর আচরণের দাবি করে যাতে সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি বিরাজ করে। হোক সে ভিন্ন ধর্ম কিংবা মতের, মানুষ হিসাবে সবাইকে সম্মান ও মর্যাদা দেওয়াই ইসলামের নির্দেশনা।

সহিহ বুখারির ১৩১১নং হাদিসে এসেছে, ‘সাহাবি জাবের (রা.) বলেন, ‘একদিন আমাদের পাশ দিয়ে একটি লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। নবিজি দাঁড়ালেন। তা দেখে আমরাও দাঁড়ালাম। আমরা তাকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল। এটি তো ইহুদির লাশ। রাসূল (সা.) বললেন, যখন কোনো লাশ নিতে দেখবে, তখন দাঁড়াবে’।

নবিজি (সা.) তার চরম শত্রুর জন্যও হেদায়াতের দোয়া করতেন। তিনি মনের গহিন থেকে চাইতেন, তারা যাতে হেদায়াতের আলোয় আলোকিত হয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের শিবিরে শামিল হতে পারে। তিনি তার দোয়ায় বলতেন, ‘হে আল্লাহ, উমর ও আবু জাহেলের মধ্যে যে আপনার অধিকতর পছন্দনীয় তাকে ইসলামের জন্য কবুল করুন’। নবিজির দোয়া কবুল হয়। মহান আল্লাহ ওমর (রা.)কে ইসলামের জন্য কবুল করেন।

রাসূল (সা.) ছিলেন দয়া ও ভালোবাসার মূর্ত প্রতীক। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য ছিল তার বুকভরা দরদ। তার চরিত্রের অতি বিস্ময়কর একটি দিক ছিল যে, যারা তাকে বেশি ঘৃণা করত, তাদের তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াতেন। দুঃখ ও কষ্টের কথা যে কেউ তার কাছে প্রাণ খুলে বলতে পারত। তিনি শুনতেন মানুষের দুর্দিন ও দুঃসময়ের কথা। পাশে দাঁড়াতেন একান্ত আপন মানুষ হয়ে। সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া ছিলেন কুরাইশ কাফেরদের শীর্ষ নেতার একজন।

অথচ রাসূল (সা.) তাকে তিন তিনবার একশ একশ করে তিনশ উট দান করেন। সহিহ মুসলিমের ২৩১৩নং হাদিসে বিষয়টি এভাবে এসেছে, সাফওয়ান বলেন, ‘আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন কেউ কখনো আমাকে এত পরিমাণে দেয়নি। অথচ আমি তাকে সবচেয়ে ঘৃণা করতাম। আর তিনি আমাকে সবচেয়ে বেশি দান করতেন। এভাবে এক সময় তিনি আমার প্রিয় মানুষে পরিণত হলেন’।

নবিজি (সা.) শত্রু-মিত্র সবার সঙ্গেই পরিপূর্ণ আগ্রহ ও মনোযোগসহকারে হাসিমুখে কথা বলতেন। তার কথায় ভালোবাসা ও আন্তরিকতা পূর্ণরূপে প্রকাশ পেত। আমর ইবনুল আস (রা.) বলেন, ‘নবিজি (সা.) সমাজের নিকৃষ্টতম মানুষের সঙ্গেও কথা বলার সময় তার দিকে ফিরতেন ও পূর্ণ মনোযোগ দিতেন। এভাবে তিনি সহজেই ব্যক্তির হৃদয় জয় করে নিতেন। তিনি আমার সঙ্গেও কথা বলতেন পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে এবং আমার দিকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে। এমনকি তখন আমার মনে হতো আমিই বুঝি সমাজের শ্রেষ্ঠ মানুষ’ (শামায়েলে তিরমিজি : ২৯৫)।

শত্রুদের কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা ও আঘাতে রক্তাক্ত হয়েও তিনি তাদের জন্য পরম দয়া দেখাতে ভুলতেন না। সহিহ বুখারি ও মুসলিমের হাদিস থেকে জানা যায়, মুশরিকদের পাথরের আঘাতে রাসূল (সা.) রক্তাক্ত হয়ে পড়ে থাকেন। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে দুজন ফেরেশতা তার কাছে এসে বলেন যে, আল্লাহ সবকিছু শুনেছেন এবং দেখেছেন। আপনি যদি চান মক্কার এই পাহাড়দ্বয়কে জাতির ওপর ধসিয়ে দিতে, তবে আমরা তাই করব। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমরা এমনটাই আদেশ পেয়েছি। রাসূল (সা.) তাদের বললেন, আমি আশা করি এদের পরবর্তী প্রজন্ম এক আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করবে (বুখারি : ৩২৩১, মুসলিম : ১৭৯৫)।

আরেকটি হাদিসে এসেছে, নজদে জাতুর রিকায় অভিযানের সময় রাসূল (সা.) ও তার সাহাবিরা বিভিন্ন বন-জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলেন। এটি ছিল খুব কষ্টকর একটি পথ। পথিমধ্যে রাসূল (সা.) ও তার সাহাবিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে গাছের নিচে বিশ্রাম নেন। ইতোমধ্যে রাসূল (সা.) ঘুমিয়ে পড়েন।

এক ব্যক্তি এসে রাসূল (সা.)-এর তলোয়ারটি হাতে নিয়ে নেয় এবং কোষমুক্ত তরবারি দিয়ে তার মাথার ওপর আঘাত করতে চেষ্টা করে। রাসূল (সা.) তাকিয়ে দেখেন লোকটি তাকে হত্যার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। তারপর লোকটি রাসূল (সা.) কে বলে, আমার হাত থেকে কে তোমাকে বাঁচাবে? রাসূল (সা.) দৃঢ়তার সঙ্গে জবাব দেন, আল্লাহ। এভাবে লোকটি তিনবার রাসূল (সা.)কে জিজ্ঞেস করেন। রাসূল (সা.) একই উত্তর প্রদান করেন। অতঃপর লোকটির হাত কেঁপে ওঠে এবং তরবারি নিয়ে সে মাটিতে বসে পড়ে। অথচ রাসূল (সা.) তাকে কিছুই বললেন না (বুখারি : ২৯১০, আহমদ : ৩/৩১১)। এভাবে হত্যার জন্য উদ্যত ব্যক্তিকে হাতের কাছে পেয়েও তিনি ছেড়ে দিলেন। রাসূল (সা.)-এর এই মমতা ও দয়া তার জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। পরে লোকটি মুসলমান হয়েছে এবং তার দ্বারা অনেক মানুষ উপকৃত হয়েছে (ফাতহুল বারী : ৭/ ৪২৮)।

হজরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, নবিজি (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ ক্ষমাশীল। তিনি সহনশীলতা পছন্দ করেন। সহনশীল অবস্থায় তিনি যা দান করেন, কঠোর বা অন্য কোনো অবস্থায় তিনি কখনোই তা দান করেন না’ (মুসলিম : ২৫৯৩, ইবনে হিব্বান : ৫৫২)।

প্রতিশোধ গ্রহণের শক্তি ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি ক্ষমা করতে পছন্দ করতেন। শত্রুকে হাতের কাছে পেয়েও তার প্রতি মমতা দেখাতেন। রূঢ় আচরণকারীদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করতেন।

মন্দের জবাবে ধৈর্যের নজির স্থাপন করতেন। যার ফলে তার চরম শত্রুরাও এক সময় তার পরম বন্ধুতে পরিণত হতো। আরেকবার এক ইহুদি ধর্মের পণ্ডিত পাওনা টাকা চেয়ে এসে রাসূল (সা.)কে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে এবং তার চাদর ও জামা ধরে সজোরে টান মারে। সাহাবি ওমর (রা.) এই দৃশ্য দেখে সহ্যের ক্ষমতা হারালেন এবং রাসূল (সা.)-এর কাছে তার মাথা উড়িয়ে দেওয়ার অনুমতি চাইলেন। রাসূল (সা.) ওমর (রা.)কে থামিয়ে দিয়ে বললেন, তোমার কাছে এমন আচরণ আশা করিনি। তারপর তিনি লোকটির পাওনা পরিশোধ করে অতিরিক্ত আরও বিশ ‘সা’ (বিশেষ ওজন) খেজুর দিয়ে দিলেন।

লোকটি রাসূল (সা.)-এর এমন আচরণে মুগ্ধ হয়ে তখনই কালিমা পড়ে নেয়। (আল ইসাবা : ১/৫৬৬)। রাসূল (সা.)-এর এমন অভূতপূর্ব আচরণের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, আমি যেন এখনো নবিজির দিকে তাকিয়ে আছি। তিনি একজন নবির ঘটনা বর্ণনা করছেন। যার স্বজাতি তাকে রক্তাক্ত করে ফেলেছে আর সেই রক্ত মুচছেন আর বলছেন, হে আল্লাহ আমার জাতিকে ক্ষমা করে দিন। তারা জানে না। (বুখারি : ৩৪৭৭, মুসলিম : ১৭৯২)।

এভাবে অসংখ্য ব্যক্তি তার চরিত্র মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং শত্রু থেকে বন্ধুতে পরিণত হয়েছেন। হজরত সুমামা বিন উসাল তার মধ্যে অন্যতম। ইসলাম গ্রহণ করে তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! হে রাসূল (সা.)! এই পৃথিবীতে আপনার চেহারা ছিল আমার কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয়। আর এখন আপনার চেহারাই সমধিক প্রিয়। আপনার ধর্মের চেয়ে অপছন্দনীয় ধর্ম আসমার কাছে আর ছিল না। আর এখন আপনার ধর্মই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। আপনার দেশ ছিল আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত। আর এখন সব দেশ থেকে আপনার দেশই আমার কাছে অধিক প্রিয়। (বুখারি : ৪৩৭২, মুসলিম : ১৭৬৪)।

এভাবে রাসূল (সা.) জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য ভালোবাসা পোষণ করতেন। সবার জন্য হেদায়াত কামনা করতেন। নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। চরম শত্রুকেও আশ্রয় দিতেন, বিপদে-আপদে পাশে থাকতেন। এভাবে তিনি বিরোধীদের মনে জায়গা করে নিতেন। তাদের মনোজগতের বিপ্লব সাধনে সক্ষম হতেন। বিশ্ব মুসলিম আজও তার আদর্শে আদর্শিত হতে পারলে বিশ্ব মানবতা একই ছায়ার নিছে আশ্রয় নেবে। শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে সর্বত্র।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

[email protected]