৭ বছরে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ

প্রকাশিত: ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ , জুলাই ২, ২০২২

মাত্র ৭ বছরে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ। দুর্যোগজনিত ক্ষতির সাড়ে ৫৬ শতাংশই ঘটছে বন্যায়। প্রকৃতি ও মানবসৃষ্ট কারণে সামনে বন্যার প্রকোপ আরও বাড়ার শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। তবে কৃষির জন্য স্বাভাবিক বন্যা দরকার বলছেন তারা।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে বন্যা বেড়ে যাওয়ার যে শঙ্কার কথা বলা হচ্ছিল, ধীরে ধীরে তা দৃশ্যমান হচ্ছে। তবে মানবসৃষ্ট কারণেও বাড়ছে বন্যার প্রাদুর্ভাব; পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশের ক্ষয়ক্ষতি হয় ১৮ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। যারমধ্যে ৪ হাজার ২৮০ কোটি টাকা বা ২৩ দশমিক ২৩ শতাংশ ছিল বন্যাজনিত। তবে পরের ৭ বছরে ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ। ২০১৫ থেকে ২০২০ পর্যন্ত ১ লাখ ৭৯ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে ৫৬ দশমিক ৪১ শতাংশই হয় বন্যায়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ায় স্বল্পসময়ে অধিক বৃষ্টি হচ্ছে। ভারতের চেরাপুঞ্জির বৃষ্টির পানি ছয় ঘণ্টায় চলে আসছে সুনামগঞ্জে। আসামের বৃষ্টির পানি স্বাভাবিক প্রবাহে হাওর থেকে মেঘনা-যমুনা হয়ে দ্রুত সাগরে যেতে পারছে না।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভুঁইয়া বলেন, “রাস্তা-ঘাট, স্লউস গেটসহ বেশকিছু স্থাপনা যেগুলো আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা সে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে, কারণ এগুলোর কারণেও পনির গতি বাধা পাচ্ছে।“

তলদেশ ভরাট হওয়ায় নদ-নদীগুলোর পানিধারণ ক্ষমতা কমছে। হাওরাঞ্চলে নির্মাণ করা হচ্ছে অপরিকল্পিত বাঁধ, রাস্তা ও স্লুইসগেট। নির্বিচারে কাটা হচ্ছে পাহাড়-টিলা। এসবের সাথে যোগ হয়েছে উষ্ণজলবাহী মহাসাগরীয় বায়ু, লা-নিনার প্রভাব।

আবহাওয়াবিদ ড. মো. আব্দুল মান্নান বলেন, “সেন্ট্রাল পেসিফিকের একটা অংশ, যে অংশে এরকম দীর্ঘ সময় ধরে যদি উষ্ণ কন্ডিশনে থাকে অর্থাৎ স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে পয়েন্ট ফাইভ থেকে শুরু করে ৩ দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা দীর্ঘ সময় বিরাজ করলে তাকে বলে এলনিনো। একইভাবে একই এলাকা যদি দীর্ঘ সময় ধরে পয়েন্ট ফাইভ ডিগ্রি বা তার চেয়ে কম তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় বিরাজ করে তাকে বলে লানিনা।“

এবিষয়ে আবহাওয়া বিজ্ঞানী ড. রাশেদ চৌধুরী বলেন, “গত ১০০ বছরের ইতিহাসে এর আগে এরকম লানিনা হয়েছে দুবার মাত্র। একটা ১৯৯৮-১৯৯৯-২০০০ এই তিন বছর মেয়াদী, অপরটি ২০১০-২০১১-২০১২ এই তিন বছর মেয়াদী। এবারেরটা তৃতীয়বার। এর মূলত কারণ হল বাংলাদেশের ভেতরে ও বাইরে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এই লানিনার সময়।“

গত তিন দশকে দেশে প্রায় ২০০টি প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হারে। এরমধ্যে বন্যা অন্যতম। ১৯৭২, ’৭৩ ও ’৭৪ সালে বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়। এরপর ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যাও ছিল ভয়াবহ। মাঝে ছোট-বড় আরো বন্যা হয়েছে।

পরিবেশবিদ আব্দুস সোবহান বলেন, “কোথও হয়তো নদীতে দরকার ছিল ২০০ ফিট ব্রিজ, আমরা করেছি দেড়শ ফিট। এভাবে প্রতিটা পানি নামার পথ আমরা গলা টিপে হত্যা করে ফেলেছি।“

বন্যা-সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশের মানুষ অদম্য, সাহসী ও পরীক্ষিত। দুর্যোগের সাথে লড়াই করেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

বন্যায় লাফিয়ে বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতি

সময়কাল       দুর্যোগে মোট ক্ষতি           বন্যাজনিত ক্ষতি                মোট ক্ষতিতে বন্যা
২০১৫-২০     ১,৭৯,১৯৮ কোটি টাকা       ১,০১,০৫৮ কোটি টাকা        ৫৬.৪১%
২০০৯-১৪     ১৮,৪২৪ কোটি টাকা          ৪,২৮০ কোটি টাকা             ২৩.২৩% – ETV