এলো খুশির ঈদ

প্রকাশিত: ১:২৫ অপরাহ্ণ , এপ্রিল ২৯, ২০২২

মাহমুদ আহমদ

একমাস সিয়াম সাধনার পর আসে মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর। অনাবিল আনন্দ ও উল্লাসের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় এ ঈদুল ফিতর। বিশ্ববাসীর মাঝে যে আনন্দ বারবার ফিরে আসে তাকেই ঈদ বলা হয়।

মুসলিম জাহান সিয়াম-সাধনা এবং ত্যাগের মধ্য দিয়ে সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে অতীতের ভুল-ভ্রান্তির ক্ষমা চেয়ে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে চলার অঙ্গীকারে প্রত্যয়ী হওয়ার এক সফল অনুষ্ঠান এ পবিত্র ঈদ। বর্তমান ঈদকে কেবল ধর্মীয় কিংবা সামাজিক উৎসব হিসাবে বিবেচনা করা হয় না বরং ঈদ আজ সার্বজনীন আনন্দের নাম। সামাজিক উৎসবগুলোয় আমরা যেমন আনন্দে মাতি, তেমনি প্রত্যেক ধর্মেই রয়েছে বিশেষ কিছু উৎসবমুখর দিন। সে উৎসবগুলোও আমাদের আনন্দে ভাসায়। ব্যবধান ঘুচিয়ে এক করে। আমাদের বাংলাদেশেও রয়েছে নানা ধর্ম, গোত্রের মানুষের বাস। ঈদ, পূজা, বড়দিন, বুদ্ধপূর্ণিমা, বৈসাবি, রাস পূর্ণিমা প্রভৃতি বিশেষ দিনে সবাই আনন্দে মেতে ওঠে। এসব ধর্মীয় উৎসব বৃহৎ অর্থে সামাজিক জীবনাচারেরই অনুষঙ্গ। এসব উৎসব উদযাপিত হয় সমাজের মধ্যেই। প্রতিটি উৎসব আমাদের একতা, ঐক্য, বড় ও মহৎ হতে শেখায়। ঈদের আনন্দে দল-মত নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষের সঙ্গে ভাগ করার মাঝেই সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ।

ঈদুল ফিতর মুসলিম উম্মাহকে সাম্য, মৈত্রী, ঐক্য এবং ইসলামি ভ্রাতৃত্ববোধ শিক্ষা দেয়। এ আনন্দের দিনে প্রতিটি মুসলিম তার সামাজিক অবস্থান ভুলে যায় এবং ভ্রাতৃত্ববোধের পর তৃপ্তিতে একে অপরকে আলিঙ্গন করে। পার্থক্য থাকে না ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সবল-দুর্বল, বংশ গৌরব, কৌলীন্য ও মান-মর্যাদা। ঈদগাহে সারিবদ্ধভাবে জামাতের সঙ্গে ঈদুল ফিতরের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষেই সাম্যের অতুলনীয় বাস্তব দৃশ্যের চিত্র ফুটে ওঠে।

মুসলমানের জন্য ঈদ একটি মহা ইবাদতও। সুনানে ইব্ন মাজাহ গ্রন্থে ঈদের ফজিলত সম্পর্কে এসেছে, যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাতে ইবাদত করবে তার অন্তরকে আল্লাহতায়ালা রহমত ও বরকতের বারিধারা দিয়ে পরিপূর্ণ করে দেবেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ)।

ঈদের ইবাদতে শরিয়ত নির্দেশিত কিছু বিধিবিধান রয়েছে, যা পালনে সামাজিক জীবনে পারস্পরিক আন্তরিকতা, সহমর্মিতা ও বন্ধন সুসংহত হয়। ঈদুল ফিতরের শরিয়তের দিক হলো, ঈদের নামাজের আগে রোজার ফিতরা ও ফিদিয়া আদায় করা, ঈদগাহে দুরাকাত নামাজ আদায় করা, খুতবা শোনা এবং উচ্চস্বরে তাকবির পাঠ করা। ঈদে আমাদের দৈহিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি ঘটে আর পরস্পরের মাঝে ইমানি ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয় এবং নিজেদের মাঝে হিংসা বিদ্বেষ দূর হয়ে এক স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়। যদি এমনটা হয় তাহলেই আমাদের এ ঈদ পালন ইবাদতে গণ্য হবে।

আল্লাহতায়ালার আদেশে এক মাস রোজা রাখার পর তার আদেশেই আমরা ঈদের আনন্দ উদযাপন করি। এক মাস রোজা আমরা আমাদের তাকওয়াকে ও ইমানকে বাড়ানোর জন্য রেখেছি। আমরা রমজানের রোজা এ জন্যই রেখেছি, যেন আল্লাহপাকের নৈকট্য অর্জনকারী হতে পারি। এক মাস পূর্ণ হওয়ার পর আল্লাহতায়ালা আমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন ঈদ উদযাপন করার। প্রত্যেক বৈধ কাজ যা থেকে তিনি আমাদের এক নির্ধারিত সময় বিরত রেখেছিলেন আজ ঈদ উদযাপনের মাধ্যমে তা করার অনুমতি দিয়েছেন।

ঈদ উদযাপন মূলত আল্লাহতায়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন আর কৃতজ্ঞতার সর্বোত্তম পন্থা হলো-ধনী-গরিব সবাই একত্রিত হয়ে ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করা। একমাস রোজা রাখার যে তৌফিক আল্লাহয়াতালা দিয়েছেন এরই কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এ দুরাকাত নামাজ। তাই বলা যায়, ঈদ কেবল ভালো খাওয়ার বা ভালো পরার আর বন্ধুদের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় আনন্দ ভ্রমণ করার নাম নয় বরং কৃতজ্ঞতা আদায়ের জন্য একটা বিশেষ সুযোগ হিসাবে আল্লাহতায়ালা আমাদের ঈদ দান করেছেন।

আমরা যে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছি, আমাদের সর্বদা এটিও স্মরণ রাখতে হবে যে, শুধু আনন্দ-ফুর্তিতে মেতে না থেকে আল্লাহপাকের ইবাদতের প্রতিও যেন দৃষ্টি থাকে। আমাদের চিন্তা চেতনায় যে বিষয়টি জাগ্রত রাখা উচিত, তা হলো নেকি ও তাকওয়াকে প্রতিষ্ঠিত ও প্রচলন করা, আর এটাই আমাদের আসল উদ্দেশ্য। এ শিক্ষাই আমাদের রমজানের রোজা আর ঈদ দেয়। দুটিই আমাদের আনুগত্যের শিক্ষা দেয়।

আমাদের এতে খুশি হওয়াও উচিত নয় যে, ঈদের দিনে গরিবদের সাময়িক খুশির উপকরণের ব্যবস্থা করে দিয়েছি বরং যাদের সামর্থ্য আছে তারা যেন তাদের স্থায়ী খুশির উপকরণের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করে। কার ধর্ম কী, এটা দেখার বিষয় নয়, মানব সেবাই হলো পরম ধর্ম। এ ছাড়া একই উৎস থেকে আমাদের সবার সৃষ্টি। ঈদের এ আনন্দ তখনই সার্বজনীন রূপ লাভ করতে পারে যখন সমাজ ও দেশের সবাই একত্রে আনন্দের ভাগী হব। আমাদের সন্তানদেরও ঈদের এ মাহেন্দ্রক্ষণে গরিবদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের শিক্ষা দিতে হবে। ঈদের যে উপহার তাদের দেওয়া হয়, তা থেকে যেন তারা একটা অংশ গরিবদের জন্য পৃথক করে নেয়। তারা যেন শুধু নিজেদের বন্ধু-বান্ধবদের প্রতিই খেয়াল না রাখে, নিজেরাই যেন ভালো খাবার ইত্যাদি না খায় বরং গরিব, অসহায় যারা রয়েছে তাদের প্রতিও যেন খেয়াল রাখে। এ ঈদে বিশেষ করে অসহায় প্রতিবেশীর খোঁজ নিতে হবে। রাসূলল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তি মুমিন নয়, যে পেট পুরে খায় অথচ তার পাশের প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে।’ মহানবির (সা.) এ শিক্ষার ওপর আমাদের আমল করতে হবে। আমরা যখন এ বিষয়গুলো দৃষ্টিতে রেখে ঈদ উদযাপন করব তখন আমাদের ঈদ হবে ইবাদত আর আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ।

আরেকটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে, এই যে মাসব্যাপী আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে রোজা, নফল ইবাদত এবং বিভিন্ন পুণ্য কাজ করলাম এসব কি শুধু পবিত্র মাহে রমজানের জন্য নাকি বছরের এগারোটি মাসও এরপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে হবে। আমাদের পবিত্র মাহে রমজানের পুণ্য রকর্মগুলো বছরজুড়ে অব্যাহত রাখতে হবে। এমনটি যদি আমরা করতে পারি তবেই আমরা আল্লাহপাকের সন্তুষ্টির চাদরে সদা আবৃত থাকব।

পবিত্র ঈদুল ফিতরের মাধ্যমে সবার মাঝে ভ্রাতৃত্বের মেলবন্ধন রচিত হবে-এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আল্লাহতায়ালা আমাদের প্রকৃত অর্থে ঈদ উদযাপন করার তৌফিক দান করুন, আমিন।

লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]