দুই শিশু হত্যা

বিষ মেশানো ৫টি মিষ্টি পাঠায় প্রেমিক

প্রকাশিত: ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ , মার্চ ১৮, ২০২২

টানা ৭ মাসের পরকীয়া প্রেম, দফায় দফায় শারীরিক সম্পর্ক। ফোনে নিয়মিত যোগাযোগ। তবে পরকীয়া প্রেমিক শিশুদের নিয়ে বিবাহ করতে রাজী নয়। তাই পথের কাঁটা দুটি শিশুকে দুনিয়া থেকে সরাতে পথ খুঁজতে থাকে তারা। এর এক পর্যায়ে বিষ মেশানো ৫টি মিষ্টি পাঠায় পরকীয়া প্রেমিক। সেই বিষ মেশানো মিষ্টি খাইয়ে দুই সন্তানকে হত্যা করে গর্ভধারিণী মা।

ঘটনাকে ভিন্ন দিকে মোড় ঘুরাতে সাজানো হয় নাপা সিরাপ সেবনে মৃত্যুর কথা। এ নিয়ে তোলপাড় হয়ে উঠে সারাদেশ। ঘটনার তদন্তে পৃথক ৪টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। টনক নড়ে স্বাস্থ্য বিভাগের। নড়ে চরে বসে স্থানীয় প্রশাসনেরও।

গত ১০ মার্চ রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের দূর্গাপুর গ্রামে নাপা সিরাপ সেবনে কিছুক্ষণ পরেই মৃত্যু কোলে ঢলে পড়ে দুই সহোদর শিশু ইয়াছিন খান (০৭) ও মোরসালিন খান (০৫)। এ নিয়ে তোলপাড় হলে পরীক্ষা-নীরিক্ষা শুরু হয় নাপা সিরাপের। সেখানে ক্ষতিকর কোন উপাদান মেলেনি।

এর মধ্যেই জেলা পুলিশ তদন্ত শুরু করে। এক সপ্তাহ ধরে পুলিশ নজরবন্দি রাখে শিশুর মাতাকে। প্রযুক্তিগত তদন্তসহ নানা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে চাঞ্চ্যকর এই ডাবল মার্ডার রহস্য ৭ দিনের মধ্যেই উদঘাটন করে পুলিশ।

আশুগঞ্জ থানা পুলিশ শিশুদের মাতা লিমাকে বুধবার রাতে গ্রেফতার করে।

জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের কাছে আদ্যপান্ত বর্ণনা দেয় লিমা। শিশুদের মা লিমা আক্তার মইসার গ্রামে শ্রমিক সর্দার সফিউল্লাহর সাথে দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছিল। এরপর তারা বিবাহের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে শিশু দুটি তাদের নতুন সংসার করার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাড়াঁয়। তাই পথের কাটা সরাতে এই নৃশংসতার পথ খুঁজে নেয় তারা। পরকীয়া প্রেমিক তার বাড়িতে বিষ মেশানো ৫টি মিষ্টি পাঠায়।

সেই সাথে মিষ্টিগুলো খাওয়ানোর নির্দেশনা প্রদান করে। এরপর বড় শিশু ৩টি ও ছোট শিশুকে ২ মিষ্টি খাওয়ানো হয়। এর পর তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে। এর আগ থেকেই তাদের কিছুটা জ্বর ছিল। তাই বাহিরের দোকান থেকে নাপা সিরাপ আনতে বলে। পরে সিরাপও খাওয়ানো হয়।

জানা যায়, ১২ বছর আগে লিমার বাবা-মা তার অমতে পাশের পাড়ার ইসমাইল হোসেন পুত্র সুজনের সাথে তার বিয়ে দেয়। বিয়ের আগে সে ইসমাইল হোসেনকে কখনো দেখেনি। বিয়ের দিন সে জানতে পারে তার স্বামী চোখে দেখে না এবং স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারে না। বিয়ের প্রথমদিন থেকেই স্বামীকে তার পছন্দ ছিল না।

বিয়ের ১৫ দিন পর স্বামী তাকে বাপের বাড়ি থেকে আনতে গেলে সে তার সাথে গিয়ে সংসার করতে রাজি ছিল না। এরপর মায়ের জোড়াজুড়িতে অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও স্বামীর বাড়িতে আসে এবং সংসার করতে থাকে। বিয়ের এক বছর পর থেকেই সে ধানের মিলে কাজ শুরু করে।

এভাবেই সে রাইস মিলে কাজ করে সংসার চালাতো। এরই মধ্যে ইয়াছিন ও মুরছালিনের জন্ম। তখন সংসারের দায়িত্ব বেড়ে গেলে পারিবারিক অশান্তি আরও বেড়ে যায়। সে সময় লিমা দুই সন্তানকে বাসায় রেখে বাহাদুপুরে বাহাউদ্দিনের ধান মিলে কাজ শুরু করেন। এই মিলে প্রায় ৭ বছর কাজ করার পর ২০২০ সালে শুরুর দিকে বাহাদুরপুর লাল ফারুকের ধানের মিলে কাজ নেন।

সেখানে এক বছর কাজ করার পর প্রায় ১০ মাস পূর্বে বগইর এলাকায় এস আলম রাইস মিলে কাজ শুরু করেন। এই মিলে কাজ করতে গিয়ে মিলের সর্দার সফিউল্লাহ ওরফে সোফাইর সঙ্গে পরিচয় হয়। এর এক পর্যায়ে সোফাই সর্দার বিয়ের প্রস্তাব দেয়। সে সময় সে স্বামী এবং দুই সন্তানের কথা বলে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয় লিমা। তবে সংসারের অভাব অনটনের কারণে সর্দারের উপর লিমার আকর্ষণ কাজ করতে থাকে।

এর মধ্যে দু’জনের মধ্যে ফোনে কথাপোকথন এবং দেখা-সাক্ষাত চলছিল। বিভিন্ন সামগ্রী উপহার দেয় সোফাই সরদার। অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে দু’জন। শারীরিক মেলামেলাও চলতে থাকে তাদের। গত এক মাস আগে সোফাই সর্দার সিমসহ একটি মোবাইল ফোন দেয় লিমাকে।

অবৈধ সম্পর্ক চলকালীন বিভিন্ন সময় সোফাই সর্দার দুই ছেলেকে ছেড়ে বিয়ে করার কথা বলত। সন্তানদের কথা বললে সে বলত পথের কাটা সরাও, ব্যবস্থা আমি করব। তোমার এ নিয়ে ভাবতে হবে না। ঘটনার ৩ দিন আগে ৭ মার্চ সন্ধ্যায় দুজন মিলে বসে দুই সন্তানকে হত্যার পরিকল্পনা করে।

সে সময় সোফাই বলে ‘আমি বিষ মেশানো মিষ্টি তোমার বাড়িতে দিয়ে আসলে তুমি সুযোগ বুঝে ছেলেদের তা খাওয়াই দিবা। তারপর যা হবার হবে।’

ঘটনার দিন ১০ মার্চ তাদের মধ্যে মোবাইল ফোনে পরিকল্পনা নিয়ে বেশ কয়েকবার কথাও হয়। সেদিন আছরের নামাজের পর লিমার শাশুড়ী ওয়াজ শুনতে বাড়ির বাহিরে গেলে সেই সুযোগে সোফাই সর্দার পলিথিনের ব্যাগে ৫টি মিষ্টি দিয়ে যায়।
সোফাই সর্দার রাস্তায় গিয়ে লিমার শাশুড়ীকে পাওনা টাকা দেওয়ার জন্য ফোনে ডাকেন। শাশুড়ী টাকা নিয়ে বাড়িতে আসলে লিমা ছেলের গায়ে জ্বরের কথা বলে তাকে নাপা সিরাপ আনতে বাড়ির পাশের ফার্মেসীতে পাঠায়। এরপর পরিকল্পনা মাফিক বিষ মিশানো মিষ্টি দুই সন্তানকে খাওয়ায় সে।

মিষ্টি খাওয়ানোর ৫ মিনিটের মধ্যেই শাশুড়ীর আনা নাপা সিরাপ আধা চামচ করে দুই ছেলেকে খাওয়ানো হয়। সব কিছুই ছিল পরিকল্পনা মাফিক। যেনো কেউ বুঝতে না পারে। সবাই যেনো মনে করে ওই ওষুধে ছেলেরা মারা গিয়েছে।

ওষুধ খাওয়ার ১০ মিনিট পরে দুই ছেলে বমি করতে থাকে। এ সময়ে তাদের মাথায় পানি ঢালা হয়। দুই সন্তানকে নিয়ে আশুগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বলা হয়, নাপা সিরাপ খাওয়ার পরে তার ছেলেরা বমি করে অসুস্থ্য হয়ে গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে বড় ছেলে ইয়াছিনকে ১৫ মিনিট এবং ছোলে মুরছালিনকে ১৫ মিনিট করে অক্সিজেন দেয় চিকিৎসক।
সোফাই সর্দার হাসপাতালে তাদের দেখতে আসে। এরপর ডাক্তার দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য সদর হাসপাতালে নিতে বললে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়।

সেখানকার চিকিৎসক নাপা সিরাপ খেয়ে অসুস্থ্য হওয়ার কথা শুনে বাসায় গিয়ে বেশি বেশি লেবুর পানি খাওয়ানোর কথা বলেন। পরে সেখান থেকে বাড়ি আসার পথে বিশ্বরোড মোড়ে আসতেই আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে মারা যায় দুই সন্তান।

খবর পেয়ে ওদিন পুলিশ লিমার মোবাইল নম্বর নিয়ে গেলে সে ভয় পায়। ১২ মার্চ একই মিলে কাজ করা মালার মাধ্যমে মোবাইল ফোন এবং সিমটি সোফাই সর্দারের নিকট ফেরত পাঠায় লিমা।

পরে পুলিশের জেরার মুখে লিমা সব পরিকল্পনা ও অপরাধের কথা স্বীকার করলে পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে যায়। এ ব্যাপারে থানায় ৪ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তার মধ্যে ২ জন অজ্ঞাত।

শিশুদের পিতা ইসমাইল খান জানান, লিমাকে সফিউল্লাহ সর্দারের দেয়া সিমকার্ড ঘিরে সন্দেহ থেকেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে হত্যার সাথে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছে। আমি এর বিচার চাই।

পরকীয়া প্রেমিক সফিউল্লাকেও গ্রেফতারে পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অভিযানে চালিয়ে যাচ্ছে।