চির নিদ্রায় শায়িত হলেন ড. ইনামুল হক

প্রকাশিত: ৬:৩৬ অপরাহ্ণ , অক্টোবর ১২, ২০২১

সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে চির নিদ্রায় শায়িত হলেন স্বাধীনতা ও একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. ইনামুল হক। বুয়েট ও বনানী কবরস্থান জামে মসজিদে দুই দফা জানাজা শেষে তাঁকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

আজ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ড. ইনামুল হকের প্রতি শ্রদ্ধা জানান সরকারের মন্ত্রীবর্গ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ।

সকালে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ড. ইনামুল হকের মরদেহ শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে নেয়া হয়। সেখানে শ্রদ্ধা জানান তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল এমপি, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক মেহের আফরোজ চুমকি এমপি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান, অভিনেত্রী শাহনাজ খুশি, আবুল হায়াত, তানজিকা আমিন, নাতাশা হায়াত, মোমেনা চৌধুরী, বৃন্দাবন দাস, মীর সাব্বির, নির্মাতা অরণ্য আনোয়ারসহ অনেকে।

এছাড়া বাংলাদেশ বেতার-টেলিভশন শিল্পী সংস্থা, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক বিষয়ক উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, সাংস্কৃতিক সংগঠন সম্প্রীতি বাংলাদেশ, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

এর আগে ড. ইনামুল হকের প্রথম জানাজা সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় বেইলি রোডে তাঁর নিজ বাসায় অনুষ্ঠিত হয়। এরপর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তাঁর মরদেহ নেয়া হয় শিল্পকলা একাডেমিতে। সেখানে শিল্পী এবং তার দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা তাকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, ‘ড. ইনামুল হক একাধারে শিক্ষাবিদ, অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক, অধিকন্তু তিনি একজন অত্যন্ত সজ্জন মানুষ ছিলেন। তিনি দীর্ঘ ৪৩ বছর বুয়েটে শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। বহু কালজয়ী নাটকের স্রষ্টা তিনি, বহু কালজয়ী নাটকে তিনি অভিনয় করেছেন। তিনি একইসঙ্গে চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেছেন। তাঁর মতো এমন একজন গুণী মানুষের হঠাৎ প্রস্থান, সত্যিকার অর্থেই জাতির জন্য বেদনার, আমাদের সবার জন্য বেদনার।’

ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে কখনো ভাবিনি, হঠাৎ করে তিনি এভাবে চলে যাবেন। কিছুদিন আগেও তাঁর সাথে আমার কথা হয়েছে। তাঁর সাথে বহু কাজে আমি যুক্ত ছিলাম। তাঁর মৃত্যু জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি, নাট্য অঙ্গন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। আমার মতে এটা তাঁর অকালে চলে যাওয়া।’

নৌপরিবহন পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালেদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘তাঁর চলে যাওয়াটা আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। প্রধানমন্ত্রী, দেশরত্ম শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টা করছি, সেই জায়গায় তিনি পুরোধা ব্যক্তি ছিলেন। আজীবন তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে লালন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণ তাঁর স্বপ্ন ছিল। সেজন্য সর্বক্ষেত্রে তিনি আপোসহীন ভূমিকা রেখেছেন। এক প্রকার নীরবেই তিনি চলে গেলেন। এটা আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি, কিন্তু তাঁর কর্ম আমাদেরকে আগামীদিনে পথ দেখাবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘ড. ইনামুল হক শুধু একজন অধ্যাপক হিসেবেই নন, একজন সমাজকর্মী, একজন সমাজ সংস্কারক, একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সেই হিসেবেই তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর এই মৃত্যুতে জাতি একজন বিদগ্ধ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে হারালো, একজন নাট্য অভিনেতা, একজন নাট্য নির্দেশককে হারালো।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ফজলে নূর তাপস শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বলেন, ‘এই শূন্যতা আসলে পূরণ হবে না। তিনি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি আদর্শ হয়ে থাকবেন।’

ড. ইনামুল হকের মেয়ে হৃদি হক বলেন, ‘ড. ইনামুল হক আসলে সবার ছিলেন। ওনার ভাবনায়, চিন্তায়, চেতনায় ছিলো বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ। এর বাইরে কিচ্ছু ছিলো না। তিনি আমাদের সকলের নাট্যগুরু, নাট্যপ্রাণ মানুষ। সারাজীবন নাটক, থিয়েটার, শিল্পচর্চা, সেই গণআন্দোলনের সময় থেকে শেষদিন পর্যন্ত বাবা অনুবাদের কাজ করে গেছেন। যেই ভালোবাসা তিনি মানুষকে দিয়েছিলেন, মানুষও তাঁকে সেই ভালোবাসা দিচ্ছেন।’

গতকাল সোমবার দুপুরে ড. ইনামুল হক ইন্তেকাল করেন। তার বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। ১৯৪৩ সালে ফেনী সদরের মটবী এলাকায় জন্ম নেন ড. ইনামুল হক। বাবার নাম ওবায়দুল হক ও মা রাজিয়া খাতুন। দাম্পত্য সঙ্গী নাট্যজন লাকী ইনাম। তাদের সংসারে দুই মেয়ে হৃদি হক ও প্রৈতি হক।

নাট্যজগতে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১২ সালে ড. ইনামুল হক একুশে পদক লাভ করেন। ২০১৭ সালে তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে সরকার।