আশা জাগিয়েও হতাশার দিকে যাত্রা

প্রকাশিত: ১:৪৭ অপরাহ্ণ , ফেব্রুয়ারি ২, ২০২১

মিয়ানমারের আধুনিক ইতিহাসে অং সান সু চি সব চেয়ে দৃশ্যমান ও একইসঙ্গে বিভাজনকারী রাজনীতিক।তিনি একদিকে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন, মানবাধিকার রক্ষার অক্লান্ত সৈনিক এবং গণতন্ত্রপন্থি বলে স্বীকৃত হয়েছেন, আবার সেই সু চি-কেই দেখা গিয়েছে মিয়ানমারের সেনার সমর্থক হিসাবে, যখন তারা সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের হত্যা করেছে, বিতাড়ন করেছে।

এহেন সু চি সেনার হাতে আটক হয়েছেন। তাঁকে স্টেট কাউন্সিলারের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার সামান্য আগে ১৯৪৫ সালের ১৮ জুন সু চি-র জন্ম। বার্মার স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নায়ক অং সানের মেয়ে। অং সানকে মিয়ানমারে জাতির পিতা বলা হয় এবং তিনি সামরিক বাহিনী তাতমাডোরও প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৪৭ সালে তাঁকে হত্যা করা হয়। তার পরের বছর, ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীন হয়।

সু চি বরাবর বলে এসেছেন, দেশের মানুষকে সেবা করা তাঁর কর্তব্য। কিন্তু ১৯৮৮ সালে ৪৩ বছর বয়সে তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন। ততদিন তিনি শিক্ষাবিদ হিসাবে কাজ করেছেন, তাঁর দুই ছেলেকে বড় করেছেন।

সে সময় ছাত্র আন্দোলন চলছিল, দেশের সমাজবাদী একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধে। কিন্তু সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে এমন কেউ ছিলেন না, যিনি সব বিরোধীকে একজোট করে শাসকদের বিরুদ্ধে দাঁড় করাবেন। ছাত্ররা তখন নেতৃত্ব দেয়ার জন্য সু চি-কে অনুরোধ করে এবং তিনিও বিনা দ্বিধায় রাজি হয়ে যান।

১৯৮৮ সালের অগাস্টে সু চি-র রাজনৈতিক উত্থানের শুরু। ইয়াঙ্গনে বিখ্যাত বৌদ্ধমন্দির শ্বেডগন প্যাগোডার সামনে পাঁচ লাখ মানুষের সমাবেশে বক্তৃতা দিয়ে শুরু হলো সু চির রাজনৈতিক জীবন। সু চি তাঁর বাবার উত্তরাধিকার নিয়ে এগিয়ে গেলেন, বললেন, এই আন্দোলন হলো দেশের স্বাধীনতার জন্য দ্বিতীয় সংগ্রাম।

এই বক্তৃতাই সু চি-কে বর্মার সব চেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতায় পরিণত করল। তবে এই আশার কিরণ দীর্ঘস্থায়ী হলো না।

একমাসের মধ্যেই মিয়ানমারের সেনা জনপ্রিয় আন্দোলন বন্ধ করে দিল এবং সরকারের দখল নিয়ে নিল। তারা নতুন করে নির্বাচন এবং বহুদলীয় শাসনের প্রতিশ্রুতি দিল। কয়েক হাজার মানুষ মারা গেলেন। ১৯৮৯ সালে সামরিক সরকার দেশের নাম বদল করে রাখল মিয়ানমার।১৫ বছর ধরে গৃহবন্দি সু চি

সামরিক অভ্যুত্থানের পর গণতন্ত্রপন্থি রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি(এনএলডি) তৈরি করলেন। সেনার প্রতিশ্রুতি ছিল ১৯৯০ সালে নির্বাচন হবে। তারা সেই নির্বাচন করালো। সু চি-র দল পার্লামেন্টের পাঁচ ভাগের মধ্যে চার ভাগ আসনে জিতল।

দেশের অনেক মানুষ তখন মনে করেছিলেন, সু চি-র মধ্যে বুদ্ধের নৈতিক ধারণা ও আধ্যাত্মিকতার মিশেল রয়েছে। এটাই এনএলডির ওই বিপুল জয়ের অন্যতম কারণ।

তবে সেনা-শাসকরা নির্বাচনের ফলের মর্যাদা রাখেনি। তারা সু চি-কে গৃহবন্দি করে। ১৯৮৯ সালের জুলাই থেকে ২০১০-এর নভেম্বর পর্যন্ত তিনি ইয়াঙ্গনে তাঁর বাড়িতেই বন্দি অবস্থায় ছিলেন।

নোবেল শান্তি পুরস্কার

১৯৯০ সালে শান্তির জন্য নোবেল পান সু চি। তাঁর হয়ে তাঁর ছেলেরা সেই পুরস্কার নেন। তিনি সেই পুরস্কারের পুরো অর্থ(১৩ লাখ ডলার) মিয়ানমারের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার জন্য দান করেন।

সু চি-র নোবেল পাওয়ার ফলে তাঁর ও মিয়ানমারের দিকে আন্তর্জাতিক নজর গেল। সু চি হয়ে উঠলেন গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতীক। গৃহবন্দি থাকার সময়ও মহাত্মা গান্ধীর অহিংস দর্শনে বিশ্বাস রেখেছেন সু চি। তিনি ভয়ের থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার কথা বলে গিয়েছেন। তারপরই তাঁকে নিয়ে বই লেখা হয়েছে, গান ও সিনেমা হয়েছে। তিনি হয়ে গেছেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের আইকন।

কিন্তু এই সেলিব্রিটি স্টেটাসের জন্য তাঁর ক্ষতিও হয়েছে। তাঁকে গৃহবন্দি করে রেখেছে সেনা শাসকরা। তাঁর স্বামী মাইকেল অ্যারিস যখন ক্যান্সারে মৃতপ্রায়, তখন সামরিক শাসকরা সু চি-কে জানান, তিনি লন্ডন যেতে পারেন, কিন্তু আর মিয়ানমারে ফিরতে পারবেন না। সু চি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি জানতেন, একবার দেশের বাইরে গেলে তিনি সত্যিই আর ফিরতে পারবেন না। তাই তিনি দেশে থেকে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেন।

সংস্কার ও গণতন্ত্র ফিরে আসা

বহু বছর ধরে সু চি ও সেনার মধ্যে আলোচনা এগোয়নি। তিনি তাঁর জনপ্রিয়তা ও নৈতিক মূলধনকে রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপান্তরিত করতে পারেননি। আর সেনা-শাসকরাও তাঁদের ভাবমূর্তি বদলাতে পারেনি। তাঁদের গোড়া থেকেই ক্ষমতালোভী একনায়ক হিসাবে দেখা হচ্ছিল।

২০১০ সালের নির্বাচনের পর সাবেক জেনারেল থেই সিন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হন এবং সংস্কার কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি মিয়ানমারের দরজাও বাইরের বিশ্বের জন্য খুলে দেন।

সু চি মুক্তি পান। তাঁর সামনে তখন বিকল্প ছিল, হয় সেনা যেটুকু রাজনৈতিক কাজ করার অনুমতি দিয়েছে, তা মেনে নিয়ে রাজনীতি করা অথবা অন্য পথে হাঁটা। তিনি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যাঁরা সেনার বিরুদ্ধে লড়ছিলেন, এই সিদ্ধান্ত ছিল তাঁদের নীতির বিরুদ্ধে।

তাঁর সমালোচকরা অবাক হয়ে গেছিলেন। সু চি তাঁদের বললেন, ”মানুষ যখন মনে করে, আমি সবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছি, তখন আমিই অবাক হয়ে যাই। আমি রাজনীতি করতে এসেছি, মানবাধিকারের রক্ষক বা মানবাধিকারকর্মী হতে নয়।”

২০১৫ সালে মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচনে এনএলডি বিপুলভাবে জয়ী হয়। সু চি দেশের প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। কারণ, তাঁর স্বামী ছিলেন ব্রিটিশ। সংবিধান অনুসারে তাই সু চির পক্ষে প্রেসিডেন্ট হওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি স্টেট কাউন্সিলার হন। এই পদটি বিশেষভাবে তাঁর জন্য তৈরি করা হয়েছিল এবং এটা ছিল প্রধানমন্ত্রীর সমগোত্রীয়।

সারা বিশ্ব জুড়ে মিডিয়া লিখল, অবশেষে মিয়ানমারে গণতন্ত্রের জয় হলো।রোহিঙ্গা গণহত্যা ও সু চি-র ভাবমূর্তিতে ধাক্কা

তবে সেই উচ্ছ্বাস দীর্ঘস্থায়ী হলো না। মিয়ানমারে শুরু হলো জাতিগত বিরোধ ও উত্তেজনা।

২০১৬ সালের অক্টোবরে এবং ২০১৭ সালের অগাস্টে পশ্চিম রাখাইনে রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি তাতমাডো বাহিনীকে আক্রমণ করে। এরপরই সেনা রোহিঙ্গাদের উপর যথেচ্ছ অত্যাচার চালায়। সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে যায়। তারপরই রিপোর্ট আসে, সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের একের পর এক গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে এবং তাদের হত্যা করেছে। জাতিসংঘের মতে, এটা হলো এথনিক ক্লিনসিং-এর টেক্সটবুক উদাহরণ।

সু চি-র প্রতিক্রিয়া আসে অনেক দেরিতে এবং সেটা ছিল সংযত প্রতিক্রিয়া। তাঁর অনেক সমর্থক ও ভক্ত নিরাশ হন। কারণ, তিনি সেনার কাজের সরাসরি নিন্দা করেননি। বরং তাঁকে তাঁদের পাশে থাকতে দেখা গিয়েছে।

এরপর তাঁকে দেয়া অনেক সম্মান ফিরিয়ে নেয়া হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাঁদের দেয়া মানবাধিকারের পুরস্কার ফিরিয়ে নেয়।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে অং সান সু চি আবার বিশ্বকে অবাক করে দিলেন, যখন তিনি ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিসে গণহত্যা সংক্রান্ত শুনানিতে মিয়ানমারের প্রতিনিধিত্ব করলেন।

সেখানে তিনি বললেন, মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের পুরো বা আংশিকভাবে মুছে ফেলার কোনো ইচ্ছে সেনার ছিল না। এর ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাঁর ভাবমূর্তিতে বিশাল ধাক্কা লাগল।

কিন্তু মিয়ানমারে উল্টো ফল হলো। অনেকে ‘মাদার সু’ ও সেনার পাশে এসে দাঁড়ালেন।

২০২০-র সাধারণ নির্বাচনে এনএলডি ও সু চি বিপুল জয় পেলেন। সেনার মদতপুষ্ট ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি অভিযোগ করল, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। তারপরেই সেনা অভ্যুত্থান হলো।

রাজনীতিতে সু চি-র জীবন বৈপরীত্যে ভরা। মাঝেমধ্যেই তাতে অবাক করা মোড় এসেছে, তিনি প্রত্যাশার উল্টো কাজ করেছেন। এটা বলাই যায়, যে প্রধান ঘটনা তাঁর জীবন গড়ে দিয়েছে, তার উপর সু চি-র কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। সোমবারের সেনা অভ্যুত্থানের পরেও ভবিষ্যতে সু চি কী ভূমিকা পালন করবেন, সেটাও সম্ভবত তাঁর হাতে নেই। DW