আমলারা খেলছেন, রাজনীতিবিদেরা দেখছেন

প্রকাশিত: ৯:৪৭ পূর্বাহ্ণ , ডিসেম্বর ২৯, ২০২০

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেছেন, ‘‘মাঠে খেলছেন আমলারা৷ রাজনীতিবিদরা সাইডলাইনে বসে খেলা দেখছেন৷” এখন প্রশ্ন হলো, রাজনীতিবিদেরা কেন রাজনীতিতে নাই৷ আমলারা কেন তা দখল করছেন?রোববার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের বনানী অফিস মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে জিএম কাদের আরো বলেন, ‘‘সংবিধান অনুযায়ী দেশের মালিক হচ্ছেন জনগণ আর তাদের ভোটে নির্বাচিতদেরই দেশ পরিচালনার কথা৷ কিন্তু কাজকর্মে এমপি সাহেবদের খবর নেই, আর সচিব-সাহেবরা সব কাজ করেন, মন্ত্রী মহোদয়েরা শুধু জানতে চান৷”

জিএম কাদের যে পরিস্থিতির কথা বলেছেন তাতে দেশের প্রকৃত চিত্রই ফুটে উঠেছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা৷ তারা এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে গণতন্ত্রের জন্য আরো দুঃখজনক পরিণতির আশঙ্কা করেন৷

অবশ্য তারা মনে করেন, আমলারাজোর করে রাজনীতিতে ঢুকছেন না৷ রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতার সুযোগ নিচ্ছেন তারা৷ তাদের মতে, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য যদি আমলাতন্ত্র নির্ভর হতে হয় তাহলে আমলারা সুযোগ নেবেনই৷ স্বাভাবিক নিয়মেই রাজনীতিবিদেরা তখন সাইডলাইনে চলে যাবেন৷ তারা এটাকে বলছেন, ‘‘স্যাড স্টোরি৷”

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সররকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রহমান বলেন, ‘‘এখন প্রশাসনের সচিব বা পদস্থ কর্মকর্তারা অবসরের পরই রাজনীতিতে যোগ দিয়ে এমপি মন্ত্রী হতে চান৷ আর কাজটি শুরু করেন সরকারি চাকরিতে থাকার সময়ই৷ তারা সরকারি চাকরিতে থেকেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন৷ সভা সমাবেশে অংশ নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন৷”এই সুযোগটি তারা কেন পাচ্ছেন? সরকারি চাকরিতে থাকতেই তাদের কেন রাজনৈতিক আচরণ করতে দেখা যায়? এর জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. শান্তনু মজুমদার বলেন, ‘‘এর দায় রাজনীতিবিদদের৷ বিএনপিকে আর কী বলবো! ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরই যা অবস্থা তাতে আমলা নির্ভর হওয়া ছাড়া তাদের আর উপায় কী থাকতে পারে৷”

তবে তিনি মনে করেন, ‘‘জিএম কাদেরের ভাই( এইচএম এরশাদ) বেঁচে থাকলে তাকে তিনি প্রশ্ন করলে ভালো করতেন৷ এই রাজনীতিবিদদের সাইডলাইনিং-এ তার কোনো ভূমিকা আছে কিনা?”বাংলাদেশে করোনা ব্যবস্থাপনা ও এনিয়ে নানা কাজে মন্ত্রী এমপিসহ মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিবিদদের তেমন কোনো ভূমিকা নেই৷ ব্যক্তিগত উদ্যোগে কেউ হয়তো কিছু করছেন৷ কিন্তু প্রশাসনিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে তারা অনুপস্থিত৷ ফলে যারা জনপ্রতিনিধি তাদের কাজ চলে গেছে আমলাদের কাছে৷ আমলারা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নন৷ ফলে সাধারণ মানুষ কোনো কিছু জানতে জানতে পারছেন না৷ কারুর কাছে যেতে পারছেন না৷ এটা কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়৷

আর আমলারাও রাজনীতির বাইরে এই অযাচিত ক্ষমতা পেয়ে নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা৷ জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুন নিজেই ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় প্রশাসনের কমর্কর্তাদের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘‘কর্মকর্তাদের অপরাধ প্রবণতা এত পরিমাণে এখন বেশি যে প্রতিদিন তিন-চারটি করে বিভাগীয় মোকদ্দমা শুনতে হয় এবং বিভাগীয় মোকদ্দমায় অনেকের শাস্তি হচ্ছে৷ এটা আমাদের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক৷”ড. তারেক শামসুর রহমান মনে করেন, আমলাদের প্রভাব এখন অনেক বেশি বেড়ে গেছে৷ ক্ষমতার প্রয়োজনে আমলা নির্ভরতার পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে রাজনীতিবিদদের দক্ষতার অভাবেও এটা হয়েছে৷ তবে এটা হওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন তিনি৷ তিনি বলেন, ‘‘রাজনীতি করবেন রাজনীতিবিদেরা৷ কিন্তু এখন তা করছেন আমলারা৷ তারা চাকরি বিধি লঙ্ঘন করে রাজনৈতিক বক্তব্য দেন ও তৎপরতা চালান৷ তাহলে রাজনীতিবিদেরা কী করবেন?”

এর ফলেসরকার ও রাজনীতি এখন আমলাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে৷ অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বলেন, ‘‘এটা বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও রাজনীতির জন্য একটা স্যাড স্টোরি৷” DW