যানবাহনের থার্ড পার্টি ইনস্যুরেন্স বাতিল

প্রকাশিত: ৬:০৩ অপরাহ্ণ , ডিসেম্বর ২১, ২০২০

বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-তে যানবাহনের ক্ষেত্রে থার্ড পার্টি বীমা করার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়নি। বাংলাদেশে যানবাহনের ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকি বীমা বা থার্ড পার্টি ইনস্যুরেন্স বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।

কোন যানবাহনের কারণে কোন ব্যক্তি যদি আহত বা নিহত হয়, অথবা যদি কোন সম্পদের বা অন্য গাড়ির ক্ষতি হয়, তার ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য এই ‘থার্ড পার্টি ইনস্যুরেন্স’ করা হতো। অর্থাৎ চালক বা যাত্রীর বাইরে যে ক্ষতি হয়, সেটার ক্ষতিপূরণের জন্য বীমা করার নামই থার্ড পার্টি ইনস্যুরেন্স।

কিন্তু বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-তে যানবাহনের ক্ষেত্রে থার্ড পার্টি বীমা করার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়নি। সেই আইনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বীমায় এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।

কী বলা হয়েছে আইডিআরএ প্রজ্ঞাপনে?

আইডিআরএ’র প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, মটর ভেহিকেল অর্ডিনেন্স ১৯৮৩, (অর্ডিনেন্স নং এলভি অব ১৯৮৩) (থার্ড পার্টি ইনস্যুরেন্স বা Act Liability) বাধ্যতামূলক ছিল। উক্ত অর্ডিনেন্স রহিতক্রমে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ (২০১৮ সালের ৪৭ নং আইন) প্রতিস্থাপিত হয়।

সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ধারা ৬০ এর উপধারা ((১) ও (২) বল হয়েছে:

যাত্রী ও মোটরযানের বীমা – (১) কোন মোটরযানের মালিক বা প্রতিষ্ঠান ইচ্ছা করিলে তাহার মালিকানাধীন যে কোনও মোটরযানের জন্য যে সংখ্যক যাত্রী পরিবহনের জন্য নির্দিষ্টকৃত তাহাদের জীবন ও সম্পদের বীমা করিতে পারিবে।

(২) মোটরযানের মালিক বা প্রতিষ্ঠান উহার অধীন পরিচালিত মোটরযানের জন্য যথানিয়মে বীমা করিবেন এবং মোটরযানের ক্ষতি বা নষ্ট হওয়ার বিষয়টি বীমার আওতাভুক্ত থাকিবে এবং বীমাকারী কর্তৃক উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পাইবার অধিকারী হইবেন। এই কারণে তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকি বীমা বাতিল করা হয়েছে।

বীমা কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সড়ক আইন হওয়ার পর অর্থমন্ত্রী থার্ড পার্টি ইনস্যুরেন্স করার নিয়ম বাতিল করার নির্দেশ দেন। কারণ আইনি কারণে এটা করা হলেও বাস্তবে তেমন একটা কাজে আসে না। এরপর এ ধরণের পলিসি বাতিল করার পর ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকি বীমার সুবিধা-অসুবিধা কী?

কর্মকর্তারা বলছেন, এর আগে বাংলাদেশে তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকি বীমা করা হলেও সেখানে ক্ষতিপূরণের সর্বোচ্চ সীমা ছিল ২০ হাজার টাকা। কিন্তু বীমা করা হলেও এ ধরণের ইনস্যুরেন্সের দাবি করার হার অনেক কম।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, ২০১৮ সালে দেশজুড়ে ৫ হাজার ৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছে মোট ৭ হাজার ২২১ জন। আহত হয়েছে ১৫ হাজার ৪৬৬ জন। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে ৪ হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ৭ হাজার ৩৯৭ জন। আর আহতের সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ১৯৩ জন।

কিন্তু এদের কেউই বীমা বাবদ কোন ক্ষতিপূরণ পাননি।

বাংলাদেশ ইনসুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন- বিআইএর সভাপতি শেখ কবির হোসেনও বলেছেন, ”এই পলিসি মালিকরা করছেন আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে। এর চেয়ে বরং কমপ্রিহেনসিভ বীমা করা হলে মালিক ও বীমা কোম্পানি উভয়েই লাভবান হবেন।”

তবে বাংলাদেশের যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলছেন, এতদিন তারপরেও দুর্ঘটনার শিকার মানুষজনের জন্য ক্ষতিপূরণের একটি ব্যবস্থা ছিল, মানুষের সেই জায়গাটা বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু নতুন আইনে সেটা তো আর থাকছে না।

তিনি পরামর্শ দেন, শুধুমাত্র তহবিল নয়, যানবাহনের মালিকরাও যাতে ক্ষতির শিকার যাত্রী বা সাধারণ মানুষকে একটি ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হন, সেটা আইনে থাকা উচিত।

তাহলে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ কীভাবে হবে?

সড়ক দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের জন্য বাস্তবিক অর্থে এই মুহূর্তে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন। সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য একটি তহবিল গঠন করার কথা বলা হয়েছে।

সেই তহবিল থেকে দুর্ঘটনায় নিহতদের জন্য পাঁচ লাখ টাকা আর আহতদের জন্য তিন লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

তবে বাংলাদেশের যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলছেন, আইনটি করার পর দুই বছর পার হয়ে গেলেও এখনো ওই তহবিল ব্যবহারের বিষয়ে কোন নীতিমালা তৈরি করা হয়নি। তহবিল পরিচালনায় সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি মালিক-শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি নিয়ে একটি কমিটি গঠনের কথা। সেটাও গঠন করা হয়নি। সেই কমিটিতে যাত্রী বা সাধারণ মানুষের কোন প্রতিনিধিকেও রাখা হয়নি।

এর ফলে এই তহবিল আসলে দুর্ঘটনার শিকার মানুষের কতটা কাজে আসবে, তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন। তবে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সদস্য মোঃ দলিল উদ্দিন জানিয়েছেন, যানবাহনের দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে কীভাবে কী করা যায়, সেটা নিয়ে এখন চিন্তাভাবনা চলছে।

কোন ইনস্যুরেন্সে কেমন খরচ?

আইনে যানবাহনের যাত্রীদের জন্য বীমা করার বিষয়টি ঐচ্ছিক রাখা হয়েছে। তবে প্রথম পক্ষের বীমা করা হলে গাড়ি চুরি বা ছিনতাই হলে, ভেঙে গেলে, বা ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়। শর্তে থাকলে চালক ও যাত্রীর শারীরিক ক্ষতির জন্যও বীমার অর্থ পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের বীমাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মোটর বাইকের থার্ড পার্টি ইনস্যুরেন্সে সর্বোচ্চ প্রিমিয়াম ২৫৯ টাকা। অন্যদিকে ফার্স্ট পার্টি ইনস্যুরেন্সে এর প্রিমিয়াম সর্বনিম্ন ৪ হাজার ৭৮২ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৯০২ টাকা।

সেডান গাড়ির থার্ড পার্টি ইনস্যুরেন্সে সর্বনিম্ন প্রিমিয়াম ৪১৪ টাকা ও সর্বোচ্চ ৭৫৯ টাকা। ফার্স্ট পার্টি ইনস্যুরেন্সের প্রিমিয়াম সর্বনিম্ন ৬৪ হাজার ৭৮৩ টাকা ও সর্বোচ্চ ১ লাখ ১৯ হাজার ৬৩৮ টাকা।

বাসের ক্ষেত্রে থার্ড পার্টিতে সর্বনিম্ন প্রিমিয়াম ১ হাজার ৯০৯ টাকা ও সর্বোচ্চ প্রিমিয়াম ২ হাজার ২৭৭ টাকা। অন্যদিকে ফার্স্ট পার্টি ইনস্যুরেন্সে সর্বোচ্চ প্রিমিয়াম ৪ লাখ ৬৭ হাজার ২২৭ টাকা।

ট্রাকের জন্য থার্ড পার্টি ইনস্যুরেন্স সর্বনিম্ন প্রিমিয়াম ৭৮২ টাকা ও সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৬১ টাকা। ফার্স্ট পার্টি ইনস্যুরেন্সের সর্বোচ্চ প্রিমিয়াম ৯৯ হাজার ৩৫৮ টাকা। সূত্র: বিবিসি বাংলা