ধনীর সম্পদে দরিদ্রের অধিকার প্রতিষ্ঠা

প্রকাশিত: ৫:১৪ অপরাহ্ণ , মে ২০, ২০২০

পবিত্র কোরআন-এ আল্লাহ রব্বুল আলামীন সূরা আহজাব-এর ২১ নং আয়াতে বলেন, ‘(হে মানুষ!) নিশ্চয়ই তোমাদের জন্যে নবীজীবন সর্বোত্তম আদর্শ।’ নবীজীবন কোরআনের ফলিত রূপ। কোরআন বুঝতে হলে, কোরআনের গভীরে ডুব দিতে হলে নবীজীবনকে জানতে হবে। নবীজীবনকে যত গভীরভাবে অধ্যয়ন করা যায়, নবীপ্রেমে নিজের অন্তরকে যত প্লাবিত করা যায়, ততোই কোরআনের বাস্তব ও পরাবাস্তব জ্ঞানের ছটায় উপকৃত হওয়া যায়। কোরআনে ব্যক্ত ও সুপ্ত সব কথারই মর্মমূলে প্রবেশ করার ফলে; বিশ্বাসের স্তর থেকে উত্তরণ ঘটবে জানার স্তরে।

প্রথম পর্বে আপনারা জেনেছেন নবী আগমনের পটভূমি। আইয়ামে জাহেলিয়াত। মক্কার বিবর্তন। কাবার নিয়ন্ত্রক বেনিয়া পুরোহিত চক্রের শোষণ ও ভোগবাদী সমাজে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের চরম বিপর্যয়ের বিবরণ। দ্বিতীয় পর্বে জেনেছেন শূন্য থেকে জীবন শুরু। অনিশ্চয়তার পর অনিশ্চয়তা। নিজ শ্রম ও মেধায় ৩৫ বছর বয়সে আসীন হলেন মক্কার সমাজে উচ্চ মর্যাদায়। তৃতীয় পর্বে আপনারা জেনেছেন জীবনের বাঁকবদল। জাহেলিয়াত থেকে উত্তরণের সূত্র লাভ। আল্লাহ এক, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। সকল মানুষ সমান। শুরু করলেন সত্যের প্রচার। প্রথমে গোপনে। তারপর প্রকাশ্যে।

চতুর্থ পর্বে আপনারা জেনেছেন নির্মম নির্যাতন ও উৎপীড়নের মুখে স্বল্পসংখ্যক সঙ্ঘবদ্ধ মানুষের বিশ্বাস ও অহিংসায় অটল থেকে আত্মিক তূরীয় আনন্দে অবগাহনের বিবরণ। পঞ্চম পর্বে জেনেছেন হিজরত- চরম অনিশ্চয়তার মুখে সোনালি সকালের পথে যাত্রার বিবরণ। ষষ্ঠ পর্বে জেনেছেন মদিনায় আগমনের পর সামাজিক রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে ধাপে ধাপে তার ঘর গোছানোর কাহিনী। সপ্তম পর্বে জেনেছেন- সীমিত শক্তি ও উপকরণ নিয়ে বড় বিজয়ের উপাখ্যান। এবার অষ্টম পর্বে জানবেন ঘর গোছানোর সাথে সাথে ধনীর সম্পদে দরিদ্রের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যাকাতের বিধানাবলির বিবরণ।

নবী নন্দিনী ফাতেমা। চলনে বলনে তিনি ছিলেন নবীজীর মতোই। ফাতেমা যখন নবীজীর কাছে আসতেন, তখন তিনি উঠে দাঁড়িয়ে তাকে সম্ভাষণ জানাতেন, চুমু দিতেন এবং নিজের জায়গায় বসাতেন। নবীজী ফাতেমাকে তাঁর অংশ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, যে ফাতেমাকে কষ্ট দিল, সে আমাকে কষ্ট দিল। নবীজীও যখন কন্যার সাথে দেখা করতে আসতেন, তখন ফাতেমা বসা থাকলে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানাতেন, বাবার হাত ধরতেন, চুমু দিতেন এবং তারপর নিজের জায়গায় বসাতেন। ফাতেমা যেমন ছিলেন লাজুক ও বিনয়ী, তেমনি ছিলেন সত্যবাদী ধৈর্যশীল ও সাহসী।

বদরের বিজয়ের পর ফাতেমার বিয়ের প্রস্তাব এলো আলীর কাছ থেকে। আলী সাহসী যোদ্ধা ও জ্ঞানী হলেও বৈষয়িক ব্যাপারে ছিলেন বেখেয়ালি। একজন আনসারের খেজুর বাগানে গাছে পানি দেয়ার কাজ করতেন। আয় ছিল সামান্য। তাই বিয়ের প্রস্তাব দিতে প্রথমে দ্বিধান্বিত থাকলেও পরে সাহস করে নবীজীর কাছে প্রস্তাব দেন। শুনে মা ফাতেমা মাথা একটু নিচু করে চুপ হয়ে রইলেন, যা ছিল সম্মতি! নবীজী (স) বলেন, আমি প্রস্তাব নিয়ে ফাতেমার কাছে যাব। এর আগেও বিয়ের কয়েকটি প্রস্তাব সে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে নীরবে ‘না’ করে দিয়েছে। দেখি এবার সে কী করে! আলীর প্রস্তাবের কথা শুনে ফাতেমা এবার মুখ না ঘুরিয়ে মাথা একটু নিচু করে চুপ করে রইলেন। এই চুপ করে থাকাটাই ছিল সম্মতি। নবীজী ‘আল্লাহ মহান’ বলে বাইরে এসে বিয়ের ঘোষণা দিলেন। খুবই অনাড়ম্বর পরিবেশে বিয়ে হলো। বিয়ের দেনমোহর ছিল ৪০০ দিরহাম।

জ্ঞানী আলীর সাথে বিয়ে ফাতেমার জীবনে দারিদ্র্য ও দৈহিক শ্রমের নতুন মাত্রা যোগ করে। আলীর সীমিত উপার্জনের কারণে যব বা গম নিজের হাতেই জাঁতায় পিষে আটা বানাতেন ফাতেমা। জাঁতা পিষতে পিষতে হাতে ফোস্কা ও কড়া পড়ে গেল। তখন দুজনে মিলে পরামর্শ করলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন, নবীজীর কাছে যাবেন এবং একজন দাসের জন্যে আবেদন করবেন। তখনকার আরবীয় রীতি অনুসারে মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ যুদ্ধবন্দিদের বিভিন্ন পরিবারে দিয়ে দেয়া হতো দাস হিসেবে কাজ করার জন্যে। একবার অনেক যুদ্ধবন্দি এলো। ফাতেমা নবীজীর কাছে গেলেন। কিন্তু তখন নবীজী বাইরে কোথাও ছিলেন। ফাতেমা তার আসার কারণ বলে এলেন আয়েশার কাছে।

নবীজী ঘরে ফিরে এলে আয়েশা তাকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বললেন। নবীজী রাতে আলীর ঘরে গেলেন। তিনি তাদের বিছানায় গিয়ে বসলেন। বললেন, তোমরা যা চেয়েছ তার চেয়ে ভালো কিছুর নির্দেশনা কি আমি তোমাদের দেব না? তারা বললেন, অবশ্যই। তখন নবীজী বললেন, তোমরা রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ৩৪ বার ‘আল্লাহু আকবর’, ৩৩ বার ‘সুবহানাল্লাহ’ এবং ৩৩ বার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ জপ করবে- এটা তোমাদের জন্যে একজন কাজের লোক পাওয়ার চেয়ে উত্তম। আসলে নবীজী (স) তার প্রিয় কন্যাকে কষ্ট ও পরিশ্রমের মধ্যে রেখেও সাধারণ অনুসারীদের সুযোগ-সুবিধাকেই সারাজীবন অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

হাসান-হোসেনের জন্ম
বিয়ের একবছর পার না হতেই মা ফাতেমার ঘর আলো করে এলো হাসান এবং পরের বছরেই ছোট ছেলে হোসেন। দুজন ছিলেন নবীজীর দু’নয়ন। এদের বংশধরেরাই নবীজীর বংশধারা হিসেবে, আহলে বায়াতের ইমাম হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছেন। আর হোসেন কারবালা প্রান্তরে শহিদ হয়ে পরিণত হয়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীকে।

নবীজীর জীবনসায়াহ্নে গুরুতর অসুস্থতার সময়ে প্রিয় কন্যা ফাতেমাও শুশ্রূষার জন্যে সেখানে ছিলেন। একসময় কন্যাকে কাছে ডেকে কানে কানে কিছু বললেন। গোপন কথা শুনে ফাতেমা কাঁদতে শুরু করলেন। এরপর তিনি আবার কাছে ডেকে কানে কানে আরেকটি গোপন কথা বললেন। এই গোপন কথা শুনে তিনি হাসতে লাগলেন। পরবর্তীতে মা আয়েশা বলেন, আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম, ঘটনা কী? জবাবে মা ফাতেমা তাকে বললেন, প্রথমবার তিনি বলেছেন, এই রোগেই তিনি বিদায় নেবেন। ফলে আমি কান্নায় ভেঙে পড়ি। দ্বিতীয় বার তিনি বললেন, পরিবারের মধ্যে আমিই প্রথম তাঁর সাথে মিলিত হবো। একথা শুনে আমি আনন্দে হেসে ফেলি। নবীজীর ওফাতের পাঁচ মাসের মধ্যেই ফাতেমা তাঁর সাথে অনন্ত আনন্দলোকে মিলিত হন।

জ্ঞানী আলীর জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সাধনার গভীরতা সম্পর্কে নবীজী বলেছেন, ‘আমি জ্ঞানের নগরী আর আলী হচ্ছে তার প্রবেশদ্বার।’ নবীজীর ওফাতের পর তিনিই ছিলেন সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত চতুর্থ ও শেষ খলিফা। অকুতোভয় এই বীর কোনো রণাঙ্গনেই কখনো পিছু হটেন নি। বড় বড় যোদ্ধাদের মোকাবেলা করতে কখনো দ্বিধা করেন নি। খন্দকের অবরোধের একপর্যায়ে দানবীয় শক্তির অধিকারী বিশালদেহী যোদ্ধা আমর ইবনে আবদ-উদ ঘোড়া নিয়ে পরিখা অতিক্রম করে হুঙ্কার দিলেন, কে আছ, আমার সাথে লড়বে? ব্যঙ্গ করে বললেন, আস! তোমাদের আমি দ্রুত জান্নাতে প্রেরণ করব!

বীর আলী এগিয়ে গেলেন। আমরের তুলনায় আলীকে মনে হচ্ছিল বালক। আমর তাচ্ছিল্যের সাথে বলল, ‘ওহে ছোকরা! কী নাম তোমার? তোমাকে মেরে আমি হাত নষ্ট করতে চাই না।’ আলী বললেন, ‘আমার নাম আলী ইবনে আবু তালিব। আপনি লড়তে না চাইলে কী হবে! আমি লড়তে চাই।’ একথা শুনে আমর আক্রোশে হুঙ্কার দিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে প্রথমে ঘোড়ার সামনের দুপা কেটে ফেললেন। [সেকালে যোদ্ধা আরোহী তখনই ঘোড়ার পা কেটে ফেলত, যখন সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, সে পালাবে না। লড়াই করে জিতবে, না হয় মরবে।]

আমর বিশাল হুঙ্কার দিয়ে আঘাত হানলেন আলীর ওপর। আলী ঢাল দিয়ে আঘাত প্রতিহত করার চেষ্টা করলেন। ঢাল ভেদ করে তলোয়ার স্পর্শ করল আলীর কপাল। আলী ঢাল ছেড়ে দিলেন। কিন্তু ঢাল আটকে রইল আমরের তলোয়ারে। আলী মুহূর্তে আমরের বাঁ পাশ ঘুরে তলোয়ারের আঘাত হানলেন। আমরের বাম পাশের গলার শিরা কেটে গেল। আমর পড়ে গেলেন মাটিতে। আলী চকিতে তার বুকের ওপর উঠে গলায় তলোয়ার চালাতে যাবেন, এসময় বিশালদেহী আমর ক্ষোভ ও ঘৃণায় আলীর মুখে থুতু নিক্ষেপ করলেন।

আলী তৎক্ষণাৎ তলোয়ার নিয়ে বুক থেকে নেমে গেলেন। বিস্মিত আমর চিৎকার করে বললেন, গলা কাটো! গলা কাটো! আলীর জবাব, ‘না’। আমর জানতে চাইল, কেন না? [সেকালে যুদ্ধরীতিতে পরাজিত আহত যোদ্ধাকে হত্যা না করে ছেড়ে দেয়া সেই যোদ্ধার জন্যে ছিল চরম অবমাননা।] আমরের প্রশ্নের জবাবে আলী বললেন, ‘কারণ তোমার সাথে যুদ্ধ করেছি ধর্মরক্ষার জন্যে, হত্যাও করতে চেয়েছি ধর্মরক্ষার জন্যে। কিন্তু তুমি যখন আমার মুখে থুতু দিলে, আমার মনে প্রচণ্ড ঘৃণা ও ক্ষোভ চলে এলো। এখন যদি তোমাকে হত্যা করি তবে তা ধর্মের জন্যে হবে না, হবে ঘৃণার জন্যে। তাই তোমাকে আমি হত্যা করব না।’ এরপর বিমর্ষ ও গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত আমর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে কিছুক্ষণ পর সেখানেই মারা যান।

আলী একাধারে ছিলেন অকুতোভয় যোদ্ধা এবং কোরআনের দেমাগি ও ক্বালবী জ্ঞানে জ্ঞানী। তিনি ছিলেন নবীজীর অন্যতম কাতিব (কোরআন লিপিকর)। বিশিষ্ট ভাষাবিদ আবুল আসাদ দোয়েলীর পরামর্শে ‘মসহাফে উসমানী’তে বর্ণ ও পাঠ-সহায়ক জের-জবর-পেশ প্রবর্তন তার একটি বড় অবদান। এর ফলে বিভিন্ন ভাষাভাষী অঞ্চলেও কোরআন পাঠে যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হতে পারত, তা পুরোপুরি দূর হয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে প্রথম তিন খলিফারই পরামর্শদাতা ছিলেন আলী। তাকে যেমন তারা সম্মান করতেন, তিনিও তাদের একইরকম সম্মান করতেন।

ওমরের খেলাফতকালে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন আলী। এসময় তিনি ইসলামি আইন বিধিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। আলী ছিলেন বাগ্মী ও কবি। তার বক্তৃতা-সংকলন ‘নাহজুল বালাগা’ অতুলনীয় বাগ্মীতার ছাপ বহন করে আজও বিরাজমান। খলিফা হওয়ার পর আলী রাজধানী নিয়ে গেলেন মদিনা থেকে কুফায়। তিনি বায়তুল মাল অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সকল অর্থ সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে বিতরণ করে দিলেন।

খলিফা থাকা অবস্থায়ও তিনি নিতান্ত দীনহীন জীবনযাপন করতেন। দিনে এবং রাতে সময় পেলেই একা ঘুরে বেড়াতেন সাধারণ মানুষের অবস্থা দেখার জন্যে, তাদের দুর্দশা দূর করার জন্যে। এক সন্ধ্যায় দেখলেন এক বৃদ্ধ ভিক্ষা করছে। লোকজনকে জিজ্ঞেস করলেন, এর ছেলেমেয়ে কেউ নেই? একজন জানালেন, বৃদ্ধ খ্রিষ্টান। তার ছেলেরা তাকে ছেড়ে চলে গেছে। আলী বললেন, তার যখন বয়স ছিল পরিশ্রম করেছে। সমাজ তার শ্রম থেকে উপকৃত হয়েছে। আজ সে পরিশ্রম করতে পারে না, তাই বলে সমাজ তাকে দেখবে না! তিনি বায়তুল মাল থেকে বৃদ্ধের জন্যে মাসোহারার ব্যবস্থা করলেন।

খলিফা আলী কতটা ন্যায়পরায়ণ ছিলেন এবং তার আমলে বিচার বিভাগ কতটা স্বাধীন ছিল, তা বোঝা যায় একটা ছোট ঘটনা থেকে। আলীর একটি বর্ম চুরি যায়। একদিন কুফার বাজারে হাঁটতে গিয়ে তিনি দেখেন, এক ইহুদি তার সেই বর্ম বিক্রি করার জন্যে নিয়ে বসে আছে। আলী তার বর্ম শনাক্ত করে বর্মটি নিজের বলে দাবি করলেন। ইহুদিকে বললেন, তোমাকে আদালতে আসতে হবে। আলী তখন আমীরুল মোমেনিন। নিজের বর্ম নিয়ে নেয়ার জন্যে একটা ধমকই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তিনি তা না করে বিচারকের কাছে নালিশ করলেন। বিচারক শুরাহ্ আলীকে তার আর্জি উপস্থাপন করতে বললেন।

আলী বললেন, ‘এই বর্মটি আমার।’ বিচারক এবার ইহুদিকে তার বক্তব্য পেশ করতে বললেন। ইহুদি আমীরুল মোমেনিনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে বললেন, ‘বর্মটি আমার।’ বিচারক এবার আলীকে তার সপক্ষে সাক্ষী হাজির করতে বললেন। আলী তার পক্ষে পুত্র হাসান এবং দাস কামবারকে সাক্ষী হিসেবে হাজির করলেন। বিচারক তখন বললেন, আপনাকে হাসানের পরিবর্তে অন্য কাউকে সাক্ষী হিসেবে হাজির করতে হবে। ‘আপনি কি হাসানের সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করছেন?’ বিস্মিত আলীর পাল্টা প্রশ্ন বিচারকের প্রতি।

বিচারক বললেন, ‘বিষয়টি তা নয়। আপনি আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন, কোনো পুত্র যদি তার পিতার পক্ষে সাক্ষ্য দেয় তবে তা আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়।’ খলিফা অন্য কোনো সাক্ষী হাজির করতে না পারায় রায় ইহুদির পক্ষে চলে গেল। ইহুদি বর্ম নিয়ে আদালত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় পুরো ঘটনায় বিস্মিত ও হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল এবং ইসলাম গ্রহণ করল।

আলোকিত আলীর সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তার স্রষ্টাপ্রেম। জগতের আর বাকি সবকিছু ছিল তার কাছে মায়া। সারাদিন জ্ঞানের চর্চা, খেলাফতের কাজ আর রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেজদায় নামাজে আল্লাহর ধ্যানে মত্ত থাকা-এই ছিল তার দিনপঞ্জি। আহলে বায়াতের ইমাম ছিলেন তিনি। সাধনার সুফিধারার নকশবন্দি তরিকা ছাড়া অপর সকল প্রধান তরিকাই উৎসারিত হয়েছে জ্ঞানী আলী থেকে। নকশবন্দি তরিকা উৎসারিত হয়েছে প্রাজ্ঞ আবু বকর থেকে।

মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার রাতে তিনি তার ঘরে হেলান দিয়ে গভীর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। ফজরের আজান হওয়ার পর একজন তাকে ডাকার জন্যে এলো। কিন্তু তার গভীর নিমগ্নতা দেখে ফিরে গেল। সে যখন তৃতীয় বার এলো তখন আলী উঠে মসজিদের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। হাঁটতে হাঁটতে তিনি কবিতার ছন্দে বলছিলেন: ‘তৈরি হও মৃত্যুর জন্যে। অবশ্যই মৃত্যু তোমাকে স্বাগত জানাবে। মৃত্যু যখন তোমাকে আলিঙ্গন করবে, মুসাফির! তখন কোনো দুশ্চিন্তা কোরো না।’

মসজিদের ঢোকার সময়ই আততায়ী দরজার পাশ থেকে মাথার পেছনে তরবারির আঘাত হানল। রক্তের ধারা বইতে শুরু করল। তার মুখমণ্ডল-দাড়ি রক্তে ভেসে গেল। আহত অবস্থায় তিনি পুত্রদের ডেকে পাঠালেন। তাদেরকে শেষ উপদেশ প্রদান করলেন। আততায়ীকে ধরে তার কাছে আনা হলে তিনি নির্দেশ দিলেন, সে কয়েদি। তার থাকা খাওয়ার সুবন্দোবস্ত করো। আমি বেঁচে গেলে তাকে হত্যা বা ক্ষমা যে-কোনোটাই করতে পারি। যদি আমি মারা যাই তবে তোমরা তাকে ততটুকুই আঘাত করবে যতটুকু সে আমাকে করেছে। তোমরা বাড়াবাড়ি কোরো না। যারা বাড়াবাড়ি করে আল্লাহ তাদের অপছন্দ করেন। তিনি তার উপদেশ শেষ করার পর ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ জিকির ছাড়া আর কোনো কথা বলেন নি। তিনি ৬৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

যাইহোক, বদরে মুসলমানদের বিজয়ে আরবভূমির সর্বত্র একটা কম্পনের সৃষ্টি হলো। নবীজীর শত্রুরা আরো প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠল। ইহুদিরা আউস ও খাজরাজদের মধ্যে পুরনো শত্রুতা উস্কে দেয়ার চেষ্টা করল। এর মধ্যেই একজন মুসলিম মহিলাকে এক ইহুদি দোকানি লাঞ্ছিত করলে সে চিৎকার করে উঠল। তার চিৎকারে নিকটবর্তী এক মুসলিম তরুণ এগিয়ে এলো। দুজনের মারামারিতে দোকানি মারা গেল। তখন অন্য ইহুদিরা মিলে এ মুসলিম তরুণকে হত্যা করল।

ইহুদিরা বনু কায়নুকা গোত্রভুক্ত হওয়ায় মদিনা সনদের শর্তানুসারে নবীজী তাদের বিষয়টি সুরাহা করতে বললেন। তখন তারা উল্টো হুমকি দিল, ‘তোমরা যুদ্ধ সম্পর্কে অজ্ঞ লোকদের সাথে বিজয়ী হয়ে আহাম্মকের স্বর্গে থেকো না। তোমাদের ভাগ্য খুব ভালো। আমাদের সাথে যুদ্ধ করো, টের পাবে যুদ্ধ কী!’ মদিনায় ইহুদিদের এই গোত্র বদর যুদ্ধের সময়ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল। এবার দুই পক্ষের লড়াইয়ের একপর্যায়ে মুসলমানরা বনু কায়নুকার দুর্গ অবরোধ করল। বনু কায়নুকাদের অসদাচরণের কারণে তাদের কোনো মিত্র এমনকি ইহুদি গোত্ররাও তাদের পক্ষে এগিয়ে এলো না। ১৫ দিন অবরুদ্ধ থাকার পর তারা আত্মসমর্পণ করল। শান্তির শর্ত অনুসারে সমস্ত মালামালসহ বনু কায়নুকা মদিনা ত্যাগ করল। ব্যবসায়িক পাওনা, পুঁজি ও লগ্নিকৃত অর্থ উদ্ধারের জন্যে তাদের তিন দিন সময় দেয়া হয়েছিল। সমস্ত পাওনা আদায় করে সেজেগুজে বাদ্যবাজনা বাজাতে বাজাতে খায়বরের পথে তারা মদিনা ত্যাগ করল দ্বিতীয় হিজরির জিলকদ মাসে।

নবীজী যখন বদরে, তখন তাঁর কন্যা ও উসমানের স্ত্রী অসুস্থ রুকাইয়া মারা যান। বিজয়ী বাহিনী নিয়ে মদিনায় প্রবেশের সময় তিনি এই দুঃসংবাদ পান। পরবর্তীকালে তিনি তৃতীয় কন্যা উম্মে কুলসুমকে বিয়ে দেন উসমানের সাথে। নবীজীর দুই কন্যাকে বিয়ে করার জন্যে উসমান অভিহিত হলেন ‘জিন্ নূরাইন’ (দুই নূরের অধিকারী) নামে। সৎ, বিনয়ী, দানশীল ও ভালো মানুষ উসমানকে নবীজী কতটা পছন্দ করতেন তা বোঝা যায় রুকাইয়ার মৃত্যুর পর উম্মে কুলসুমকে তার সাথে বিয়ে দেয়ার মাধ্যমে।

উসমান ইসলাম গ্রহণকারী পঞ্চম ব্যক্তি। সোনার চামচ মুখে নিয়েই তিনি জন্মগ্রহণ করেন। কোরাইশদের ধনাঢ্য উমাইয়া গোত্রের অন্তর্ভুক্ত তার পিতা আফফানও ছিলেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। পারিবারিক ব্যবসা ও পিতার বিশাল সম্পদের উত্তরাধিকারী হওয়ায় তিনি পরিণত হন হেজাজের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের একজন। উসমান লেখাপড়া ও আপস আলোচনায় যেমন দক্ষ ছিলেন, তেমনি ছিলেন দানশীল। ইসলাম গ্রহণের আগেও তিনি অভাবীদের দান করতেন মুক্তহস্তে।

হিজরত করার পর দ্রুত তিনি নিজেকে মদিনার একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন। হিজরতের পর মদিনায় মুসলমানদের সবচেয়ে বড় অভাব ছিল পানির। তাদের আবাসের কাছাকাছি একটিমাত্র কূপ ছিল। কূপের ইহুদি মালিক পানি ব্যবহারের জন্যে অস্বাভাবিক অতিরিক্ত মূল্য ধার্য করল মুসলমানদের ওপর। ফলে পানির স্বল্পতার কারণে তাদের জীবন হয়ে উঠছিল দুর্বিষহ। উসমান ইহুদির কাছে কূপ কেনার প্রস্তাব দিলেন। সে বিপুল অর্থের বিনিময়ে কূপের অর্ধেক বিক্রি করতে সম্মত হলো।

উসমান অর্ধেক কূপ কিনলেন। শর্ত ছিল- একদিন উসমান, একদিন ইহুদি এভাবে পালাক্রমে তারা কূপের পানি ব্যবহার করবেন। উসমান তার ব্যবহারের দিনে মুসলমানদের জন্যে কূপের পানি বিনামূল্যে সংগ্রহের সুযোগ করে দিলেন। সুতরাং সকল পানি সংগ্রহকারী উসমানের দিনেই পানি সংগ্রহ করতে শুরু করল। ইহুদির দিনে কেউই কূপের ধারেকাছেও যায় না। ফলে ইহুদি বাধ্য হলো পুরো কূপ বিক্রি করতে। উসমান তখন এই ‘বীর রুমা’ কূপটি পুরোপুরি কিনে সবার ব্যবহারের জন্যে দান করলেন।

মুসলমানদের সকল যুদ্ধযাত্রায় তিনি বিপুল অর্থ ও উপকরণ নিয়ে অংশগ্রহণ করেছেন। ব্যক্তিগত ক্ষেত্রেও তার বদান্যতার কোনো তুলনা ছিল না। আলীর বিয়ের সময় তিনি তার ঢাল ৫০০ দিরহাম দিয়ে কিনে নেন। যার মধ্যে ৪০০ দিরহাম দেনমোহরে ব্যয় হয়। আর ১০০ দিরহাম আনুষঙ্গিক আপ্যায়নে। পরে উসমান ঢালটি বিয়ের উপহার হিসেবে আলীকে ফেরত দেন।

দ্বিতীয় খলিফা ওমরের সময় অনাবৃষ্টি ও তীব্র খরার কারণে মদিনায় কোনো ফসল না হওয়ায় দুর্ভিক্ষাবস্থা সৃষ্টি হয়। এসময় সিরিয়া থেকে খাদ্য ও রসদ নিয়ে ১০০০ উটের কাফেলা মদিনায় পৌঁছায়। এই কাফেলার মালিক ছিলেন উসমান। ব্যবসায়ীরা পাঁচ শতাংশ লাভ দিয়ে উসমানের কাছ থেকে সকল মালামাল কিনে নেয়ার জন্যে দৌড়ে এলো। তিনি হেসে বললেন, আমি আরো বেশি লাভে আমার মালামাল বিক্রি করে দিয়েছি আল্লাহর কাছে। আল্লাহ বলেছেন: ‘যারা নিজেদের ধনসম্পত্তি আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তাদের এই সৎদান এমন একটি শস্যবীজ, যাতে উৎপন্ন হয় সাতটি শিষ আর প্রতিটি শিষে থাকে শত শস্যদানা। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বহুগুণ প্রবৃদ্ধি দান করেন। …’ (সূরা বাকারা : ২৬১)। উসমান সকল খাদ্যশস্য মদিনার দরিদ্রদের মধ্যে ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করে দিলেন।

আবু বকর ও ওমর- প্রথম এই দুই খলিফার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা ছিলেন উসমান। ওমরের মৃত্যুর পর ছয় জনের কাউন্সিল উসমানকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করে এবং আলীসহ মসজিদে নববীতে অবস্থিত সবাই তার হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। রাজকীয় ও সামন্তবাদী শোষণ থেকে সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্যে আরবের বাইরে প্রথম দুই খলিফা যে অভিযাত্রা করেছিলেন, তা আরো পরিপুষ্ট করে তোলেন উসমান। তার আমলে পশ্চিমে উত্তর আফ্রিকা পার হয়ে আটলান্টিক, পূবে আফগানিস্তান অতিক্রম করে হিন্দুকুশ, উত্তরে আজারবাইজান, আর্মেনিয়া, জর্জিয়া, কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত ইসলামি সামাজিক সাম্যের পতাকা উড্ডীন হয়।

তিনিই প্রথম আরবে নৌবাহিনী গঠন করেন এবং ভূমধ্যসাগর থেকে রোমান-বাইজেন্টাইন নৌ-আধিপত্য বিনাশ করেন। এসময় নবীজীর ভবিষ্যদ্বাণী সফল করে মুসলিম নৌ-সেনারা সাইপ্রাস জয় করে। বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপনই খলিফা উসমানের সাফল্য নয়, তার সবচেয়ে বড় সাফল্য বিস্তীর্ণ এলাকায় সুদবিহীন মুক্ত অর্থনীতি প্রচলন। চীন, ভারত ও ইউরোপের মধ্যকার বিশাল বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে মুসলমানরা। তার ব্যবসায়িক প্রজ্ঞা নির্দেশ করে, এই বিশাল ব্যবসা শুধু ব্যক্তির অর্থে পরিচালনা সম্ভব না। এজন্যে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। তিনি ব্যক্তির সততা যাচাই করে আরব ব্যবসায়ীদের বায়তুল মাল থেকে সুদছাড়া মোটা অঙ্কের অর্থ ঋণ দিতে শুরু করেন।

ব্যবসা সবসময়ই নির্ভর করে পারস্পরিক আস্থার ওপরে। এই আস্থা এতটা প্রবল হয়ে ওঠে যে, শুধু কাগজে লেখা অঙ্গীকারপত্র যা ‘শাক্’ নামে পরিচিত, দিয়েই বিপুল অর্থ লেনদেন শুরু হয়। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ‘চেক’ শব্দটি এই ‘শাক্’ শব্দেরই বিবর্তিত রূপ। তার সময়ে অর্থনৈতিক অবস্থা এতটাই উন্নত হয় যে, যাকাত নেয়ার মতো আরবে কাউকে পাওয়া যেত না। খলিফা উসমান একদিকে যেমন নবীজীর ওহী লেখক ছিলেন, অপরদিকে নবীজীর ১৪৬টি হাদীস সরাসরি বর্ণনা করেছেন।

ওযু, নামাজ ও ইসলামের সকল ধর্মাচারের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সর্বাধিক অভিজ্ঞ ও সূক্ষ্মদর্শী ব্যক্তি। ধর্মাচার শেখানোর জন্যে তাকেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করা হতো। অবশ্য ধর্মপ্রাণ উসমানের সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে, প্রথম খলিফা আবু বকর কর্তৃক কোরআন গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ ‘মসহাফ’-কে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়া। তিনি উম্মুল মোমেনিন হাফসার কাছে সংরক্ষিত মসহাফ চেয়ে পাঠান। এবং কোরাইশদের পঠন ও লিখনরীতি অনুসারে মসহাফের কপি করার জন্যে প্রধান কাতিব জায়েদ ইবনে সাবিত, আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের, সাঈদ ইবনুল আস, আবদুর রহমান ইবনে হারিস, উবাই ইবনে কাবসহ ১২ জন সাহাবীর একটি টিম গঠন করেন। তারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্ভুলভাবে এই মসহাফের কপি করেন।

খলিফা উসমান একটি কপি নিজের কাছে, একটি কপি মদিনার মহাফেজখানায় রেখে অবশিষ্ট কপিগুলো সত্যায়ন করে বিভিন্ন প্রদেশের শাসনকর্তাদের কাছে প্রেরণ করেন। ইতিহাসে এই মসহাফ পরিচিত হয় ‘মসহাফে উসমানী’ নামে। ১৪০০ বছর ধরে এই কোরআনই অবিকৃত অবস্থায় পঠিত হচ্ছে ঘরে ঘরে।

যে-কোনো বিপ্লবেরই বিপক্ষে থাকে প্রতিবিপ্লবের একটা স্রোত, যারা সেই বিপ্লবের মধ্যে দেখতে পায় নিজেদের বিনাশ। বিপ্লবের গতি নাশ করার জন্যে তারা অনেক সময় হয়ে ওঠে অতিবিপ্লবী। ইসলাম বিজয়ী শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ায় পূর্বতন পরাজিত শক্তির অনেক সুযোগসন্ধানীও এই কাফেলায় যুক্ত হয়। তাদেরই একটি অংশ উসমানের বিরুদ্ধে প্রথমে অপপ্রচার শুরু করে। পরবর্তীকালে তা সশস্ত্র বিদ্রোহের রূপ নেয়। একপর্যায়ে তারা মদিনায় খলিফার বাসভবন ঘেরাও করে এবং খলিফার পদত্যাগ দাবি করতে থাকে। আলীসহ অন্যান্য নেতৃস্থানীয় সাহাবীরা উসমানের কাছে বিদ্রোহীদের নির্মূল করার আদেশ দেয়ার আবেদন জানান। কিন্তু ধর্মপ্রাণ বিনয়ী কোমলমনা খলিফা তার নিজের জান বাঁচানোর জন্যে কোনো মুসলমানের রক্তপাত করতে অস্বীকৃতি জানান। একই সাথে বিদ্রোহীদের দাবি মানতেও অস্বীকার করেন।

অবরুদ্ধ অবস্থা অব্যাহত থাকে মাসাধিককাল। ৩৫ হিজরির ১৮ জিলহজ শুক্রবার তিনি রোজা রেখেছিলেন। এদিন তিনি তার ২০ জন দাসকে মুক্ত করে দেন। তিনি একটি নতুন পাজামা ভালো করে বাঁধেন। তার মুক্ত দাস মুসলিম ইবনে সাইদকে বলেন, আমি স্বপ্নে রসুলুল্লাহ, আবু বকর ও ওমরকে দেখলাম। তারা আমাকে বললেন, ‘সবর করো! তুমি শিগগিরই আমাদের সাথে ইফতার করবে।’ বিদ্রোহীরা জুম্মার নামাজ পড়ার জন্যেও তাকে ঘর থেকে বেরোতে দেয় নি। বীর রুমা কূপ থেকে খাবার পানির সরবরাহও বন্ধ করে দেয়। অথচ এই কূপটি তিনিই ইহুদির কাছ থেকে কিনে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্যে দান করেছিলেন। আসর নামাজের পর বিদ্রোহীরা ঘরে ঢুকে তাকে হত্যা করে। তিনি তখন ‘মসহাফ’ পড়ছিলেন।

রক্তের প্রথম ফোঁটা পড়ে মসহাফে লিপিবদ্ধ সূরা বাকারার ১৩৭ নম্বর আয়াতের ওপর: ‘ওরাও যদি তোমাদের মতোই বিশ্বাস করে, তবে নিশ্চয়ই ওরা হেদায়েতের সরলপথ পাবে। আর যদি ওরা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বুঝতে হবে ওরা অবশ্যই কঠিন গোঁড়ামি ও ভ্রান্তিতে ডুবে আছে। ওদের মোকাবেলায় তোমাদের সাহায্যের জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি সব শোনেন, সব জানেন।’ কতটা ভালো মানুষ হলে তখনকার একমাত্র পরাশক্তি প্রধান হিসেবে ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় এমনভাবে জীবন দেয়া সম্ভব! উসমান ছাড়া আর কারো পক্ষে এভাবে জীবন দেয়া সম্ভব হতো কিনা-তা আল্লাহই ভালো জানেন।

মদিনা সনদে স্বাক্ষরকারী গোত্র হওয়া সত্ত্বেও বদর সংঘর্ষের পর বনু নাদির গোত্রপতি কাব ইবনে আশরাফ মক্কায় গিয়ে কবিতা আবৃত্তি করে কোরাইশদের প্রতিহিংসাকে উস্কে দেয়ার কাজে নেমে পড়ল। সে মুসলিম নারীদের নিয়ে অশ্লীল কবিতা প্রচার করতে শুরু করল। মদিনায় তার গোত্রে ফিরে এসেও সে একই হিংসা ছড়ানো অব্যাহত রাখল। নবীজী তাকে এ অপরাধের জন্যে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করলেন। তার নির্দেশে মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা ও তার সঙ্গীরা তাকে হত্যা করল হিজরি তৃতীয় সালে।

প্রত্যেক ধনী মুসলমানের ওপর জমাকৃত অর্থসম্পদের ৪০ ভাগের একভাগ যাকাত দান ফরজ ঘোষণা করা হলো। এ অর্থসম্পদ সম্মিলিতভাবে দারিদ্র্য বিমোচন করার উদ্যোগে ব্যয় করতে হবে। যাকাতকে বাধ্যতামূলক করার মধ্য দিয়ে ধনীর সম্পদে দরিদ্রের অধিকারের আইনগত ভিত্তি স্থাপন করা হলো। আগে ধনীরা দান করার মাধ্যমে নিজের দয়ার প্রকাশ ঘটাতেন। কিন্তু নবীজী অনুসারীদের বললেন, দান করা তোমাদের কর্তব্য। দরিদ্রকে দান করা, এতিমকে লালন করা, মা-বাবার খেদমত করা, মানুষকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়া, মানুষের সেবা করা তোমার মানবিক দায়িত্ব। এর পুরস্কার আল্লাহ তোমাকে ইহকাল ও পরকালে দেবেন। নিয়মিত সদকা বা দান ও যাকাত আদায়কে তিনি বিশ্বাসের মানদণ্ডে রূপান্তরিত করলেন।

যাকাতের আট খাত
যাকাত হিসেবে প্রদত্ত অর্থ ব্যয়ে কোরআনে সুনির্দিষ্ট আটটি খাত নির্ধারণ করা হলো: ‘যাকাত তো শুধু (এক) দরিদ্র, (দুই) অক্ষম, (তিন) যাকাত ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মচারী, (চার) যাদের মন জয় করা প্রয়োজন, (পাঁচ) মানুষকে দাসত্ব থেকে মুক্তির জন্যে, (ছয়) ঋণজর্জরিত অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্যে, (সাত) আল্লাহর পথে (জনকল্যাণমূলক কাজ, ধর্মপ্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজে) এবং (আট) মুসাফিরদের জন্যে ব্যয় করা যাবে। (যাকাতের অর্থ ব্যয়ে) এটাই আল্লাহর বিধান। ….. (সূরা তওবা : ৬০)।

‘আর (হে নবী!) তুমি তাদের ধনসম্পত্তি থেকে যাকাত গ্রহণ করে তাদেরকে পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধির পথে এগিয়ে দাও। তুমি তাদের জন্যে দোয়া করো এবং তোমার দোয়া তাদের অন্তরকে প্রশান্ত করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব শোনেন, সব জানেন। (সূরা তওবা : ১০৩)

প্রতিশোধ নেয়ার মানসে বদরে পরাজয়ের আড়াই মাস পর আবু সুফিয়ান ২০০ ঘোড়সওয়ার নিয়ে গোপনে মদিনার উপকণ্ঠে এলেন। বনু নাদির গোত্রের সাল্লাম ইবনে মিশকামের আতিথেয়তা গ্রহণ করলেন। নবীজী ও মুসলমানদের সকল খোঁজখবর নিলেন। তারা মদিনার তিন মাইল দূরে অবস্থিত উরাইদে দুজন আনসারকে হত্যা করে এবং খেজুর গাছসহ কয়েকটি বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। নবীজী এ খবর পাওয়ার সাথে সাথে ২০০ জন সাহাবীকে তাদের পেছনে ধাওয়া করতে পাঠালেন।

মুসলমানরা ধাওয়া করতে আসছে জানতে পেরে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বাধীন এই ঘোড়সওয়ার বাহিনী ঊর্ধশ্বাসে মক্কার দিকে ছুটল। পালানোর গতি দ্রুত করার জন্যে ‘সাবিক’ নামক সংরক্ষণযোগ্য সুস্বাদু খাবারসহ সকল রসদপত্র রাস্তায় ফেলতে ফেলতে তারা ঘোড়ার বোঝা হালকা করল। মুসলমানরা অনেক পেছনে থাকায় কোরাইশরা এবার খুব সফলভাবে পালাতে সক্ষম হলো। অবশ্য তাদের ফেলে যাওয়া এমন বিপুল পরিমাণ সুস্বাদু খাবার ধাওয়াকারীরা খুব তৃপ্তির সাথে উপভোগ করল। এ কারণে এটি পরিচিত হয় ‘সাবিক অভিযান’ নামে।

বদরের পর কোরাইশদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ জোরদার করার লক্ষ্যে ঘন ঘন টহলদল প্রেরণ করা হলো। ফলে সিরিয়ার বাণিজ্যপথ তাদের জন্যে পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। কোরাইশরা ইরাকের পথে বাণিজ্যযাত্রা নিরাপদ ভেবে সেদিকে বাণিজ্য কাফেলা প্রেরণ করতে শুরু করল। বিভিন্ন স্থান থেকে তথ্য সংগ্রহকারীরা এ খবর নবীজীকে জানালে তিনি জায়েদ ইবনে হারিসার নেতৃত্বে জনযোদ্ধাদের ১০০ জনের একটি দল প্রেরণ করলেন। এরা নজদের কারাদা ঝর্নার পাশে কোরাইশদের পুরো বাণিজ্য কাফেলাকে ঘেরাও করে ফেলল। তারা কাফেলার গাইড ও দুজন কোরাইশকে বন্দি করে মদিনায় নিয়ে এলো। বাকি সবাই পালিয়ে গেল।

কাফেলার মূল্যমান ছিল একলক্ষ দিরহাম। সে সময়ের তুলনায় বিপুল অর্থ! নবীজী সকল মালামাল অনুসারীদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। বাণিজ্য কাফেলার গাইড ফুরাত পরে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করলেন।