আজহার মাহমুদ

পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণ


নববর্ষ, এর মানে আমরা বুঝি নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া। এটা প্রাচীনকাল থেকে হয়ে আসছে। ঠিক তেমনি বাঙালি জাতিরও পহেলা বৈশাখ নববর্ষ। এটাই আমাদের নতুন বছর। কিন্তু আমাদের কাছে আজ এটা কেমন হয়ে গেছে। আজও আমার নানু বাড়িতে গেলে জিজ্ঞেস করে, ‘নানাভাই আজকে বাংলা সনের কত তারিখ’? আমি নানুকে বলি, ‘নানু তুমি কি জান- এটা বাংলা সনের কোন মাস চলে’? নানু তখন চট করে বলে ‘আষাঢ় মাস আরকি’ আমি তখন অবাক! এখনো বাংলা মাস নিয়ে চলাফেরা করা মানুষ বাংলায় আছে, এটা দেখে অনেকটা আনন্দিতও হলাম। নানু বলেন, এক সময় বাংলা সনের তারিখেই বিয়ে, অনুষ্ঠানসহ সব কিছু হতো। কিন্তু আজ আমরা দেখছি তার বিপরীত।

এবার আসা যাক পহেলা বৈশাখ নিয়ে। এটাই আমাদের বছরের প্রথম দিন। অনেকেই বলেন, আমরা তো নতুন বছরে পদার্পণ করেছি। কিন্তু নতুন বছরে তো আমরা এখনো পদার্পণ করিনি। এটা তো ইংরেজি সাল। আমাদের নয়। পহেলা বৈশাখ আমাদের। তাই সারা বছরের সকল জীর্ণতা ক্লান্তি দূর করে পহেলা বৈশাখ বাঙালিদের জন্য নিয়ে আসে আনন্দ আর ভালোবাসা। পহেলা বৈশাখ হচ্ছে লোকজের সঙ্গে নাগরিক জীবনের একটি সেতুবন্ধন। ব্যস্ত নগর কিংবা গ্রামীণ জীবন যেটাই বলা হোক না কেন, এই নববর্ষই বাঙালি জাতিকে একত্রিত করে জাতীয়তাবোধে। বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, বিহার, আসাম, ত্রিপুরাসহ দেশে- বিদেশে বসবাসরত প্রতিটি বাঙালি এই দিন নিজ সংস্কৃতিতে নিজেকে খুঁজে পায়। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান পরিণত হয় প্রতিটি বাঙালির কাছে শিকড়ের মিলন মেলায়। ধর্ম, বর্ণ সকল পরিচয়ের উর্ধ্বে উঠে বাঙালি জাতি এই নববর্ষকে সাদরে আমন্ত্রণ জানায়। গ্রামীণ মেলাগুলো পরিণত হয় উত্সবে। এই উত্সবের রঙ-ই একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়তে বাঙালি জাতিকে এগিয়ে নিয়েছে বারবার। নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার জন্য এদেশের মানুষ সব সময়ই আন্তরিক, অকৃত্রিম ও অগ্রগামী। দীর্ঘ প্রস্তুতির বর্ষবরণকে কেন্দ্র করে অনেক আচার অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সব পেশার মানুষ। বৈশাখী মেলা হালখাতা অনুষ্ঠান কিংবা নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয় এই নতুন বছরকে আমন্ত্রণ জানাতে। বাংলার পটশিল্পীরা তাদের পসরা সাজিয়ে বসে। পটশিল্পে জায়গা করে নেয় আমাদের গ্রামীণ জীবনের নানা কথা। লোকজ ব্যবহারিক তৈজসপত্রের বিভিন্ন অংকন শিল্প আমরা খুঁজে পাই এই পটচিত্রের মাধ্যমে। শিল্পী তার রঙিন আল্পনায় স্বপ্ন দেখে আগামী দিনের। নিজ সংস্কৃতিতে গড়ে ওঠে বাঙালি জাতির প্রজন্ম।

নগরকেন্দ্রিক ব্যস্ততাকে পিছে ফেলে সমস্ত শ্রেণি-পেশার মানুষ এই দিনটিকে সাদরে বরণ করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসমূহ ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বহু সাংস্কৃতিক সংগঠন মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করে। ১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া এই শোভাযাত্রা সকল অপসংস্কৃতি, অনিয়মের বিরুদ্ধে এক জোরালো প্রতিবাদ। জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কো ২০১৬ সালে এই মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। বাঙালি সংস্কৃতির জন্য যা ছিল একটি বিশাল অর্জন। এছাড়া রমনার বটমূলসহ দেশের প্রতিটি অঞ্চলে অনুষ্ঠিত হয় সংগীত, নৃত্যকলা কিংবা আবৃত্তি। এই শিল্পগুলোর প্রতিটিই স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের শিকড়কে। বরণ করে নেয় নিজ পরিচয়ের নববর্ষকে।

নববর্ষের এই উত্সব নারী-পুরুষ সকলের। উত্সবে যোগ দেওয়ার স্বাধীনতাও সবার সমান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে নারী হয়রানি এবং নির্যাতনের বিষয়গুলো লক্ষ্য করা যাচ্ছে উদযাপনকালে, উত্সবস্থলে। এটি আমরা মেনে নেব না। এবারের নববর্ষের শুভক্ষণে মুছে যাক বিগত বছরের জরা এবং গ্লানি, যার মধ্যে সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো ক্রমবর্ধমান নারী নির্যাতন এবং আগুনের ঘটনাগুলো। সকলের প্রতি আহ্বান, যার যার অবস্থান থেকে, বছরের প্রথম দিনটি থেকেই সকল প্রকার নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ করি, আগুনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ি। এছাড়াও সড়ক দুর্ঘটনা থেকে কিভাবে প্রতিকার পেতে পারি সেটাও এবারের পহেলা বৈশাখে আমাদের সকলের ভাবতে হবে। শুধু আনন্দ নয়, দেশের কথাও ভাবতে হবে এবারের পহেলা বৈশাখে।

একটি জাতি যখন তার নিজ সংস্কৃতিতে বলিষ্ঠ হয় তখন তাকে কোনো অপসংস্কৃতি, কু-সংস্কার গ্রাস করতে পারে না। তাই নিজ সংস্কৃতির সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসা শিল্পগুলোর নিয়মিত চর্চার প্রয়োজন। যে-কোনো জাতির কাছেই তার নিজ সংস্কৃতিই সেরা এবং আপন। বিশ্বায়নের এই যুগে নিজেদের সংস্কৃতি রক্ষায় এবং বিস্তারে আমাদের নিজেদের সংস্কৃতির ছায়াতলে অবস্থান নিতে হবে। অন্যান্য সংস্কৃতির সঙ্গেও আমরা পরিচিত হব, তবে তার আড়ালে যেন ঢেকে না যায় আমাদের স্বকীয়তা। কিন্তু বর্তমানে আমরা যেন সে পথেই হাঁটছি। বাঙালি হিসেবে নিজ সংস্কৃতির প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা থাকাও জরুরি। অন্যথায় পহেলা বৈশাখ, ২১ ফেব্রুয়ারি কিংবা বাঙালির যেকোনো উত্সব হবে অর্থহীন। বাঙালির প্রাণ পহেলা বৈশাখকে আরো অর্থবহ করতে হলে প্রয়োজন বাঙালির স্বকীয়তা ধরে রাখা। তবেই বাঙালির প্রাণ বাঁচবে।

লেখক: আজহার মাহমুদ

প্রাবন্ধিক, কলামিষ্ট ও ছড়াকার

ইমেইল: azharmahmud705@gmail.com

15.04.2019 | 02:30 PM | সর্বমোট ৩০৫ বার পঠিত

পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণ" data-width="100%" data-numposts="5" data-colorscheme="light">

জাতীয়

রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নেয়া হচ্ছে না

ভাসানচর রোহিঙ্গাদের থাকার জন্য উপযুক্ত স্থান হলেও আপাতত ভাসানচরে নেওয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা....... বিস্তারিত

26.06.2019 | 07:25 PM


রাজধানী

জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবিতে বাউল তরীর মানববন্ধন ।

জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নিবেদিত কন্ঠশিল্পী,গীতিকার, নাট্যকার,কবি, সাহিত্যিক, গীতিকবি...... বিস্তারিত

26.06.2019 | 11:44 PM

চট্টগ্রাম

বাঁশখালীতে দিনদুপুরে কথিত বন্দুকযুদ্ধে দুই ভাই নিহত

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে দুই ভাই নিহত হয়েছেন। তাদের নাম জাফর মেম্বার (৪৮) ও খলিলুর (৪৫)। র‌্যাবের দাবি,...... বিস্তারিত

21.06.2019 | 11:29 PM

ফেইসবুকে নিউজ ৭১ অনলাইন

ধর্ম

যেভাবে কবর জিয়ারত করবেন

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ   ::কবর জিয়ারত করা সুন্নত। এটি হৃদয়কে বিগলিত করে। নয়নযুগলকে করে অশ্রুসিক্ত। স্মরণ করিয়ে দেয় মৃত্যু ও আখিরাতের...... বিস্তারিত

22.06.2019 | 06:33 PM

বিনোদন

সর্বশেষ সংবাদ

সব পোস্ট

English News

সম্পাদকীয়

বিশেষ প্রতিবেদন

মানুষ মানুষের জন্য

আমরা শোকাহত

অতিথি কলাম

সাক্ষাৎকার

অন্যরকম

ভিডিওতে ৭১এর মুক্তিযোদ্ধের ইতিহাস

ভিডিও সংবাদ