আজহার মাহমুদ

সচল ডাকসু অচল ছাত্ররাজনীতি

ছাত্ররাজনীতি। একটা ছাত্র ছাত্র গন্ধ আছে! মানে রাজনীতি শেখার ছাত্র। এমনি এমনি তো আর রাজনীতি শেখা যায় না। যার কারণে ছাত্ররাজনীতি প্রয়োজন। যেখান থেকে হওয়া যায় বড় বড় নেতা। আমাদের বঙ্গবন্ধুকেও আমরা ছাত্ররাজনীতি থেকে পেয়েছি। যত বড় বড় নেতা এসেছে তারা সবাই ছাত্ররাজনীতি থেকে সৃষ্টি। যারা ছাত্ররাজনীতি প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছে তারাই আজ জনপ্রিয় নেতা হতে পেরেছে। যাই হোক এসব পুরান কথা। এখনকার ছাত্ররাজনীতির কথা বলি। এখনো ছাত্ররাজনীতি রয়েছে। সবকিছুই আছে। ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, ছাত্রসেনা, ছাত্রজোটসহ কতশত দল। আমি মনে করি, ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজন হচ্ছে, দেশের রাজনীতিতে ভালো রাজনীতিবিদ উঠে আসার জন্য। ছাত্ররাজনীতি থেকে রাজনৈতিক বিষয়ে শিক্ষা পেলে এবং মানুষের জন্য কাজ করতে পারলে তারা একদিন দেশকে সঠিক পথে নিয়ে যাবে। জানি, বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমার কথাগুলো নিখাদ হাস্যকর। কেন হাস্যকর সেটা একটু পরে বলছি। 


২৮ বছর পর আজ ডাকসু সচল। সচল হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি। অনেক নাটক, টেলিফিল্ম, সিনেমাকে হার মানিয়েছে এ নির্বাচন। আর নির্বাচনের ফলাফল দেখে অনেকেই শক খাওয়ার মতোই ছিল। যারা ২৮ বছর আগেও ছাত্ররাজনীতিকে সম্মান এবং শ্রদ্ধা করেছে এখন তারাই এ রাজনীতিকে এখন অন্যচোখে দেখছে। তারাই এ নির্বাচনকে সিনেমা বলছে। তবে কি আসলেই এটা সিনেমা ছিল! যাকগে, এতক্ষণে আমার উপরের কথাগুলো কেন হাস্যকর তার প্রমাণ পেয়েছেন। কোনো এক ছাত্র নেতা তার ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বলেছে, প্রয়োজনে আরও ২৮ বছর ডাকসু অচল থাকুক তবুও জামায়াত শিবিরের সঙ্গে আমরা এক হবো না। তবে তার সঙ্গে আমার একটু ভিন্নতা রয়েছে। প্রয়োজনে ২৮ হাজার বছর ডাকসু বন্ধ থাকত, কিন্তু মানুষের ভেতর ছাত্ররাজনীতির প্রতি সম্মান থাকত। আজ সেটা ২৮ বছর পরে ডাকসু নির্বাচন দিয়ে নষ্ট হয়ে গেল। এখন মানুষ বলে, যেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না সেখানে একটি দেশে আর কি নির্বাচন হবে! বলতেই পারে। কারণ দেশের মানুষের তো বাকস্বাধীনতা আছে। যা দেখছে তা তো বলবেই। কিন্তু সরকারের উচিত ছিল ডাকসু নির্বাচন আবার দিয়ে দেশের মানুষের কাছে বিশ্বাস স্থাপন করার। কিন্তু সরকার সেটাও করল না। এতে দেশের মানুষের কাছে আবারও নির্বাচন নামক বিষয়টি তামাশায় পরিণত হয়েছে। 
আসলে এসব লিখেও কী হবে। পরিবর্তন নেই কিছুর। প্রতিবাদ করলে, লিখলে, ভুল দেখিয়ে দিলে- যেন সবকিছু দ্বিগুণ বেড়ে যায়। এই যেমন নিরাপদ সড়কের আন্দোলন করেছিলাম। এখন দেখছি আগের চেয়ে বেশি মৃতু্য হচ্ছে। শব্দদূষণ নিয়ে লিখেছি, মানববন্ধন করেছি, এখন রাস্তায় নামলে দেখি শব্দবোমা আরও বেড়েছে। নিজেদের সচেতন হওয়ার জন্য লিখেছিলাম, কিন্তু এখন দেখি নিজেরাই বেশি অসচেতন। তাই কিছু বলেও লাভ আছে বলে মনে হয় না। তবুও লেখার নেশা যায় না ছাড়া। যাকগে- যা বলছিলাম। 
একটা ছাত্র যখন ছাত্ররাজনীতি থেকে চুরি, মারামারি, অন্যায় এ সব শেখে তখন সে বড় নেতা হয়ে কি হবে বলুন তো? সহজ উত্তর দুর্নীতিবাজ। তাহলে কি এখন আমরা বড় বড় নেতার অপেক্ষায় না থেকে বড় বড় দুর্নীতিবাজের অপেক্ষায় থাকব! অনেকটা সেরকমই মনে হচ্ছে। আমরা যদি একটু পেছনে ফিরে ডাকসু নির্বাচনটা দেখি, তা হলেই এর প্রমাণ পাবো। ছাত্ররাজনীতি মানে জানতাম রাজনীতি শেখা। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে চুরি, মারামারি, আর দুর্নীতি শেখার নাম ছাত্ররাজনীতি। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের কমিটি ঘোষণা হলে একটু কমিটির সদস্যদের নামগুলো দেখতাম আমি। এবং তাদের সম্পর্কে জানারও চেষ্টা করতাম। কিন্তু বেশির ভাগ দেখতাম কয়েকটা মামলার আসামি। পকেটে চুরি আর কোমরে পিস্তল থাকা ছেলেটাই দেখি ওমুক ছাত্র সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। তারাই আজ ছাত্ররাজনীতির নেতৃত্ব দিচ্ছে। তা হলে ছাত্ররাজনীতিটা কেমন হতে পারে আপনিই ভেবে দেখুন। বাস্তবে যারা জ্ঞানী এবং মেধাবী তারা কমিটিতে স্থান পায় না। যাদের পেছনে ২০-৫০টা ছেলে থাকে এবং যাদের নিয়ে ভাঙচুর করা যায় তারাই কমিটিতে সুযোগ পায়। প্রকৃত ছাত্ররাজনীতি কবে হারিয়ে গেছে! সেটা এখনকার ছাত্ররাজনীতি না দেখলে বোঝা অসম্ভব। আগে জানতাম ছাত্ররাজনীতির হাতিয়ার কলম। কিন্তু এখন ছাত্ররাজনীতির হাতিয়ার লাটি। ছাত্ররাজনীতি মানে এখন, একদল অন্যদলকে ধাওয়া করবে, একদল অন্যদলকে পেটাবে। এ সবই এখনকার ছাত্ররাজনীতির মূল প্রতিপাদ্য। বিশ্বাস আমারও হয়নি, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন দেখে বিশ্বাস করতে হলো। যেখানে শিক্ষার্থীরা এমন করে সেখানে অন্যরা কি করবে সেটা ভেবেই আমি বিস্মিত। তাই ডাকসু সচল করতে গিয়ে আমরা অচল করে ফেলেছি ছাত্ররাজনীতিকে। 


আমরা ছাত্ররাজনীতি মানে এখন বুঝি পড়াশোনা বাদ দিয়ে মারামারি করা। হাতে কলম আর খাতা থাকার পরিবর্তে লাটি আর ছুরি-পিস্তল থাকা। কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবো কিন্তু ক্যাম্পাসে বসে নেতামি করার নাম ছাত্ররাজনীতি। বিশ্বাস হয় না? তবে কয়েকটা নামকরা কলেজে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ঘুরে আসুন। আর দেখে আসুন কত কত নেতা কলেজ ক্যাম্পাসে পড়ে আছে। তাদের সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে দেখুন তারাও পড়াশোনায় আছে। কিন্তু রাজনীতির জন্য সে ক্লাস করে না। আমার কাছে কিছু বন্ধু আমাকে সব সময় বলে রাজনীতি করলে নাকি পড়াশোনা করা যায় না। তার পড়াশোনা নাকি শেষ হয়ে যায়। কিন্তু বিষয়টা আমার কাছে বিষের মতো মনে হয়। কেন রাজনীতি করলে পড়া যাবে না। রাজনীতি করা যদি কারও স্বপ্ন হয়ে থাকে তবে সে কেন রাজনীতি করবে না? রাজনীতি তো বঙ্গবন্ধুও করেছেন। রাজনীতি তো শেখ হাসিনাও করেছেন। রাজনীতি তো ওবায়দুল কাদেরও করেছেন। রাজনীতি তো তোফায়েল আহমেদও করেছেন। তবে তারা তো পড়াশোনাটাও সেভাবে করেছে। সবাই উচ্চশিক্ষিত হয়ে আজ বড় বড় রাজনীতিবিদ হয়েছেন। তা হলে আমরা কেন পারব না? আমরা কেন অন্যায় অনিয়মে থাকব? ডাকসু নির্বাচনে ভোট চুরি, মারামারি, লাঠিপেটা এ সব কেন আমরা করব? যারা মারামারি করেছে তারা কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নয়? যদি তাই হয়, তাহলে দেশের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা কি শিখবে? আমরা মনে করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং উচ্চমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যারা পড়াশোনা করে তারাও উচ্চমানের মেধাবী শিক্ষার্থী। কিন্তু কিছু কিছু দৃশ্য দেখে এ সব শিক্ষার্থীর প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসা যেন এক নিমিষেই ধ্বংস হয়ে গেল। এটা শুধু আমার কথা নয়, দেশের মানুষের কথা। তাই পরিশেষে বলতে চাই- ছাত্ররাজনীতি বাঁচিয়ে রাখতে চাইলে সচেতন হতে হবে বড়দের। ছাত্ররাজনীতি মানে মারামারি নয়, শিক্ষা এটা যতদিন প্রতিষ্ঠিত হবে না ততদিন বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতির সুনাম আসবে না।


লেখক: আজহার মাহমুদ

প্রাবন্ধিক, কলামিষ্ট ও ছড়াকার

ইমেইল: azharmahmud705@gmail.com

07.04.2019 | 02:22 PM | সর্বমোট ৩৯৮ বার পঠিত

সচল ডাকসু অচল ছাত্ররাজনীতি" data-width="100%" data-numposts="5" data-colorscheme="light">

জাতীয়

‘ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মীমাংসা হবে এবার’

চলতি বছরের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার ভারত সফরে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মীমাংসা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক...... বিস্তারিত

23.08.2019 | 06:41 PM



রাজধানী

চট্টগ্রাম

এশিয়ান পেপার মিলের উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ

দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদা নদী দূষণের দায়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার নন্দীরহাট এলাকার এশিয়ান পেপার মিলস (প্রা.) লিমিটেড কারখানার...... বিস্তারিত

18.08.2019 | 03:26 PM

ফেইসবুকে নিউজ ৭১ অনলাইন

ধর্ম

পাপ মোচনের মাধ্যমেই শেষ হয় হজের আনুষ্ঠানিকতা

হজ ইসলামের পঞ্চম রোকন। বিশ্ব মুসলিমের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। প্রত্যেক আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ্যবানের ওপর হজ ফরজ। একজন হাজীকে আল্লাহ...... বিস্তারিত

11.08.2019 | 07:50 PM

বিনোদন

মুষড়ে পড়েছেন আমির-কন্যা ইরা!

আমেরিকা পাড়ি দিয়েছেন বন্ধু মিশাল কৃপালনী। আর এদিকে মুম্বাইতে পড়ে আছেন ইরা খান। আর তাতেই মুষড়ে পড়েছেন আমির-কন্যা ইরা খান।...... বিস্তারিত

22.08.2019 | 08:56 PM


সর্বশেষ সংবাদ

সব পোস্ট

English News

সম্পাদকীয়

বিশেষ প্রতিবেদন

মানুষ মানুষের জন্য

আমরা শোকাহত

অতিথি কলাম

সাক্ষাৎকার

অন্যরকম

ভিডিওতে ৭১এর মুক্তিযোদ্ধের ইতিহাস


ভিডিও সংবাদ