যেভাবে ছয় মাস আগে নমুনা পরীক্ষা শুরু হয়েছিল

প্রকাশিত: ১:৩৮ অপরাহ্ণ , জুলাই ২১, ২০২০

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব চিহ্নিত করার জন্য আজ থেকে ঠিক ছয় মাস আগে অর্থাৎ জানুয়ারি মাসের ২১ তারিখে প্রথম নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল।

শুরুতে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট বা আইইডিসিআর-ই ছিল করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা, স্ক্রীনিং, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়াসহ সংশ্লিষ্ট সব ধরণের কাজের একমাত্র সংস্থা।

এর আগে ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ এক অজানা ভাইরাস হিসেবে করোনাভাইরাস চিহ্নিত হয়েছিল চীনের উহান শহরে।

যেহেতু আগে বেশ কয়েক ধরণের করোনাভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছিল, সে কারণে সবশেষে শনাক্ত হওয়া এই ভাইরাসটিকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছিল নভেল করোনাভাইরাস নামে।

চীনের উহানে ভাইরাসটির ছড়িয়ে পড়া আর মানুষের মৃত্যুর ঘটনার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই এটির বিস্তার ঘটে পূর্ব এশিয়া, ইরান, ইউরোপ এবং দ্রুতই উত্তর আমেরিকায়।

আর অত্যন্ত ছোঁয়াচে হওয়া এবং সাধারণ যেকোন রোগের তুলনায় খুব অল্প সময়ে বেশি সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর কারণ হওয়ায় করোনাভাইরাস দেশে দেশে জন্য মানুষের চরম আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বিবিসি বাংলাকে জানান, শুরু থেকে তাদের লক্ষ্য ছিল বিমানবন্দরগুলোর ওপর নজরদারী করা।

তিনি বলেন, ২১শে জানুয়ারি ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুইজন ব্যক্তির নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে দেশে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা শুরু করা হয়।

“প্রথম পরীক্ষা জানুয়ারির ২১ তারিখে হলেও ওই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের পর থেকেই আমরা বিমানবন্দরের কর্মী এবং স্বাস্থ্য বিভাগের স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করি,” ওই সময়ের কথা স্মরণ করছিলেন তিনি।

“এরপর ২০ তারিখে বিমানবন্দরে বড় ধরণের নজরদারি শুরু করা হয়।”

তিনি বলেন যে তাদের মূল নজরদারী ছিল বিদেশ থেকে আসা সব বিমান যাত্রীর স্বাস্থ্য পরিস্থিতির দিকে – “বিশেষত চীন থেকে আসা বিমান যাত্রীদের দিকে।”

প্রথম কাদের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল?

২১শে জানুয়ারি ঢাকার বিমানবন্দরে যাদের শরীর থেকে নেয়া নমুনার পরীক্ষা করা হয়েছিল, তারা ছিলেন চীনের উহান শহর থেকেই আসা দুইজন বাংলাদেশি নাগরিক।

আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা তাদের পরিচয় প্রকাশে চাইছেন না, তবে সরকারি তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে যে ওই দুইজন ব্যক্তি একই পরিবারের সদস্য ছিলেন।

বিমানবন্দরে তাদের একজনের শরীরের তাপমাত্রা ১০১ ডিগ্রী ফারেনহাইট ছিল – যে কারণে ওই ব্যক্তি এবং তার সঙ্গে থাকা তার পরিবারের সদস্যকে আলাদা করা হয়। এরপর আইইডিসিআরের একটি দল এসে তাদের শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে করোনাভাইরাস টেস্ট করা লক্ষ্যে।

পরদিন ২২শে জানুয়ারি ওই দু’জনের নমুনার ফলাফল পাওয়া যায় – যাতে তাদের কোভিড-১৯ নেগেটিভ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, অর্থাৎ তারা সারা বিশ্বে আতঙ্ক ছড়ানো করোনাভাইরাস বহন করছিলেন না।

কিন্তু তাদেরকে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছিল, এবং এক মাস পর্যন্ত তাদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর রাখে আইইডিসিআর।

এখন তারা চীনে ফেরত গেছেন।

কিভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল?

মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, শুরুর দিকে প্যান-করোনা নামে একটি পরীক্ষার মাধ্যমে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ চিহ্নিত করা হতো।

প্রথম দিকে কোন দেশের কাছেই পর্যাপ্ত টেস্টিং কিট ছিল না, আমাদের কাছেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া স্বল্প সংখ্যক কিট ছিল,” তখনকার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানাচ্ছিলেন তিনি।

আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, তখনও আরটিপিসিআরে নমুনা পরীক্ষা করার কাজ শুরু হয়নি। তবে প্যান-করোনা টেস্টের ব্যাপারটি এমন নির্ভুল যে যদি কারো মধ্যে কোভিড-১৯ সংক্রমণ থাকে, তবে তা ধরা পড়বেই।

“প্যান-করোনা টেস্ট আরটি-পিসিআর টেস্টই, কিন্তু সেটা একটু ‘কনভেনশনাল’ পদ্ধতিতে হয়। আরটি-পিসিআরের চেয়ে এই পরীক্ষায় সময় কয়েক ঘণ্টা বেশি লাগে।”

কোন পরিস্থিতিতে নমুনা পরীক্ষা শুরু হয়েছিল?

২০১৯ সালের শেষ দিন, অর্থাৎ ৩১শে ডিসেম্বর চীন আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ব্যাপারটি জানিয়েছিল।

সেদিনই করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্কতা জারী করে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে বিষয়টি জানিয়ে দেয়।

প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, করোনাভাইরাস মূলত প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়।

কিন্তু জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়ে দেয় যে এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষেও ছড়ায়।

এই ঘোষণা ছিল অনেকটা সতর্ক বার্তার মতো – যার মানে হলো ভাইরাসটি মারাত্মক রকমের ছোঁয়াচে হতে পারে। আর মূলত ঐ সময় থেকেই বাংলাদেশে নানা ধরণের প্রস্তুতি শুরু হয়।

এসব প্রস্তুতির মধ্যে ছিল, স্বাস্থ্যকর্মী ও বিমানবন্দরকর্মীদের প্রশিক্ষণ, পরীক্ষাগার প্রস্তুত করা এবং স্ক্যানারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বসানো।

মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, শুরুতে বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত দায়িত্ব পালন করা ১৪ জন স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে আরও ১০ জনকে নিয়োজিত করা হয়। সেই সঙ্গে একজন নার্স ও একজন চিকিৎসককে যুক্ত করা হয়।

তিনি বলেন, এমন ব্যবস্থা করা হয় যেন দেশের বাইরে থেকে আসা প্রত্যেক যাত্রীকে থার্মাল ক্যামেরা স্ক্যানার পার হয়ে দেশে প্রবেশ করতে হয়।

“ওই স্ক্যানারে যাত্রীর শরীরের তাপমাত্রা ৯৮ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হলে স্ক্রিনে লাল দেখাবে, তখন ওই যাত্রীকে স্ক্রিনিং করা হত।”

কী ধরণের উপসর্গ মনিটর করা হচ্ছিল?

শুরুতেই দেখা হতো বিদেশ থেকে আসা কোন যাত্রীর তাপমাত্রা শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে বেশি কি-না, অর্থাৎ ৯৮ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হলে তাকে অবশ্য স্ক্রীনিংয়ের মুখোমুখি করা হত।

অতিরিক্ত তাপমাত্রার সঙ্গে যাত্রীর নিউমোনিয়ার লক্ষ্মণ রয়েছে কি-না, এবং কাছাকাছি সময়ে তার কোন ধরণের অসুস্থতা ছিল কি-না, সে বিষয়গুলোও নিরীক্ষা করা হত।

প্রথম টেস্ট থেকে প্রথম রোগী শনাক্ত পর্যন্ত দেড় মাসের যাত্রা

ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যখন প্রথম করোনাভাইরাসের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা শুরু হয়, তখন মূলত যেসব দেশে কোভিড-১৯ প্রথমে ছড়িয়ে পড়েছিল এমন দেশ, বিশেষ করে চীন, থেকে আগত যাত্রীদেরই নমুনা পরীক্ষা হত।

চীনের সঙ্গে থাইল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকং, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকা থেকে আগত যাত্রীদেরও স্ক্রিনিং না করে বিমানবন্দর থেকে বের হতে দেওয়া হয়নি।

এরপর ৭ই ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলাদেশে জল-স্থল-আকাশ অর্থাৎ যেকোনো পথেই কেউ দেশে প্রবেশ করুন না কেন, এবং বিশ্বের যে কোন দেশ থেকে আসা যাত্রীকে স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা হয়।

প্রথম দিকে শুধু আইইডিসিআরে পরীক্ষা করা হলেও সংক্রমণ বাড়তে থাকায় এপ্রিলের শুরুতে ল্যাবের সংখ্যা বাড়ানো হয়।

জানুয়ারির ২১ তারিখে নমুনা পরীক্ষা শুরুর দেড় মাসের কিছু বেশি সময় পরে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্তের কথা প্রথম ঘোষণা করা হয় মার্চের ৮ তারিখে।

শুরুতে চীন থেকে ফেরা যাত্রীদের দিকে সবচেয়ে বেশি নজর দেয়া হলেও ওই সময়ে যে তিন ব্যক্তির মধ্যে প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়েছিল, তারা কেউ চীন থেকে বাংলাদেশে আসেননি।

দু’জন এসেছিলেন ইতালি থেকে।

অন্যজন ছিলেন এদেরই একজনের পরিবারের সদস্য।

শনাক্ত হওয়া প্রথম ব্যক্তি বিমান চলাচল শুরু হওয়ার পর এরই মধ্যে ইতালি ফিরে গেছেন। বিবিসি