অর্ধেক বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ

প্রকাশিত: ৯:০০ পূর্বাহ্ণ , জুলাই ৯, ২০২০

বাংলাদেশের ৫০ ভাগ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ৷ আর কমপক্ষে শতকরা ১০ ভাগ হাসপাতালের কোনো লাইসেন্সই নাই৷ গত দুই বছরে লাইসেন্স বাতিল হয়েছে মাত্র একটি হাসপাতালের৷

ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর কারণে যশোরের নূর মহল নামে ওই ক্লিনিকের লাইসেন্স বাতিল করা হয় গত বছরের ২ নভেম্বর৷ কিন্তু সেই ক্লিনিকটি এখন নাম বদলিয়ে মাতৃসেবা ক্লিনিক নামে পরিচালিত হচ্ছে৷

এই তথ্য খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের৷ সংশ্লিষ্ট শাখা এবং দায়িত্বপ্রাপ্তরা কাগজপত্র দেখে এই তথ্য ডয়চে ভেলেকে দিলেও তারা নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চাননি৷ বহুল আলোচিত রিজেন্ট হাসপাতালের লাইসেন্স ২০১৩ সালের পর আর নবায়ন হয়নি৷ কিন্তু এই হাসপাতালের সাথেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কোভিড হাসপাতালের চুক্তি করেছিলো৷ অধিদপ্তরের দাবি করেছে, উত্তরার এই হাসপাতালটিতে কয়েকবার অভিযান চালিয়ে তাদের সতর্ক করলেও তারা তা আমলে নেয়নি৷ নিয়ম অনুযায়ী এখন সব বেসরকারি হাসপাতালের রেজিষ্ট্রেশন অনলাইনে বাধ্যতামূলক৷ কোনো একটি শর্ত পুরণ না করতে পারলে অনলাইনে রেজিষ্ট্রেশন হয় না৷ তাই নবায়নও হয় না৷

লাইসেন্স কীভাবে পাওয়া যায়

লাইসেন্স দেয়া হয় ১০ বেডের হাসপাতাল বা ক্লিনিক হিসেবে এক বছরের জন্য৷ প্রতি বছর লাইসেন্স নবায়ন করতে হয়৷ ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে একই নিয়ম৷ এই হাসপাতালের লাইসেন্স পেতে হলে কমপক্ষে তিন জন এমবিবিএস ডাক্তার, ছয় জন নার্স ও দুইজন ক্লিনার থাকতে হবে৷ প্রত্যেকটি বেডের জন্য ৮০ বর্গফুট জায়গা থাকতে হবে৷ অপারেশন থিয়েটার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হতে হবে৷ আর সেখানে কি কি আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকতে হবে তাও বলা আছে৷ এরসঙ্গে ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন নাম্বার, বিআইএন নাম্বার, পরিবেশ এবং নারকোটিকস-এর লাইসেন্স লাগবে৷ অপারেশন থিয়েটারের জন্য নারকোটিকস-এর লাইসেন্স বাধ্যতামূলক৷ তবে আউটডোর, এমার্জেন্সি এবং অপারেশন থিয়েটার বাধ্যতামূলক নয়৷ হাসপাতালের ধরন অনুযায়ী শর্ত থাকে৷

আবেদনের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন উপ-পরিচালকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের টিম সরেজমিন পরিদর্শন করে লাইসেন্স দেয়৷ লাইসেন্স নিতে ঢাকায় ৫০ হাজার এবং জেলা উপজেলায় ৪০ হাজার টাকা লাগে৷

১০ বেডই প্রাইভেট হাসপাতালের ইউনিট৷ এরপর বেড বেশি হলে আনুপাতিক হারে জনবল বাড়ে৷

কত হাসপাতাল-ক্লিনিক

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসেবে চার হাজার ৮৪টি হাসপাতাল ও ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার এপর্যন্ত অনলাইনে লাইসেন্স নিয়েছে৷ তবে লাইসেন্স আছে এমন হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা পাঁচ হাজার ৫৫টি৷ রাজধানীসহ ঢাকা জেলায় আছে ২৯৪টি৷ যারা আগে ম্যানুয়ালি লাইসেন্স নিয়েছে তাদেরও আবার অনলাইনে লাইসেন্স নিতে হবে৷ এইসব হাসপাতালের অর্ধেকই লাইসেন্স নবায়ন করেনি৷ এক বছরের জন্য লাইসেন্স নবায়ন করতে লাগে পাঁচ হাজার টাকা৷ ২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে অনলাইন পদ্ধতি চালু হয়৷ তবে বাস্তবে সারাদেশে সাত হাজারের মত প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক আছে৷ যার একটি অংশের লাইসেন্সই নাই৷ কেউ কেউ আবার আবেদন করেই হাসপাতাল চালু করে দেন৷

নবায়ন না করলে কি হয়?

লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করলে বা নবান না করলে লাইসেন্স বাতিল করার বিধান আছে বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ( প্রাইভেট হাসপাতাল) ইউনূস আলী৷ তবে অধিদপ্তর লাইসেন্স বাতিল করতে পারেনা৷ পারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়৷ অধিদপ্তর মৌখিক এবং লিখিতভাবে তাদের সতর্ক করতে পারে৷ ১৫ দিন সময় দিয়ে হাসপতাল সাময়িক বন্ধের জন্য নোটিশ দিতে পারে৷ মেবাইল কোর্ট পরিচালনা করে শাস্তি দিতে পারে৷ ২০১৮ সালে ঢাকার ৩০টি প্রাইভেট ক্লিনিককে শোকজ করে ১৫ দিনের মধ্যে সাময়িকভাবে বন্ধ করতে বলেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর৷ তখন ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করা হয়৷ কিন্তু সেই হাসপাতালগুলো আবারও চালু হয়েছে৷ ২০১৯ ও ২০২০ সালে কোনো হাসপাতালকে সাময়িক বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়নি৷ ২০১৯ সালে যশোরে নূর মহল ক্লিনিকের লাইসেন্স বাতিল করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তার আগের বছরের৷ আর সেটা বন্ধ করেছিলো মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর নয়৷

উপ-পরিচালক ইউনূস আলী বলেন, ‘‘শর্ত পুরণ না করলে আমরা লাইসেন্স দেইনা৷ আর লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করলে তাদের শোকজ করি এবং লাইসেন্স বাতিলসহ নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করি৷’’

তবে গত দুই বছরে কতটি হাসাপতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা তিনি জানাতে পারেননি৷ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পদ্ধতি হলো কেউ অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেয় হয়, নিজেরা মনিটরিং করেনা বলে জানান তিনি৷ আর কেউ আবেদন করেই হাসপাতাল চালু করে দিলে তারা বন্ধ করতে বলেন মাত্র৷ তাই রিজেন্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে র‌্যাব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নয়৷

এদিকে অধিদপ্তরেরই একটি সূত্র জানায়, হাসপাতালগুলোর একাংশ লাইসেন্স নেয়ার সময় ভাড়া করে চিকিৎসক, নার্স ও যন্ত্রপাতি আনে৷ পরে যা আর থাকে না৷ কোনো রকম চালানো হয়৷

বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ১০ হাজারের বেশি৷ তবে এরমধ্যে হাসপাতাল ও ক্লিনিক কতটি সে হিসাব তাদের কাছে নেই৷ সংঠনের সভাপতি ডা. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘‘লাইসেন্স ছাড়াও অনেক হাসপাতাল ক্লিনিক আছে৷ আমরা তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে বার বার বলেছি৷ রিজেন্ট হাসপতাল আমাদের সদস্য নয়৷ ওই ধরনের হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমরা পত্রিকায় কয়েকদিন আগে বিজ্ঞাপনও দিয়েছি৷’’ তবে এবার কোভিডের কারণে অনেক হাসপাতাল লাইসেন্স নবায়ন করতে পারেনি বলে জানান তিনি৷ অনলাইনের কারণেও অনেকে নবায়ন করতে পারছেনা৷ শতভাগ সঠিক না হলে অনলাইনে নিবন্ধন এবং নবায়ন সম্ভব নয় বলে জানান তিনি৷

মহাপরিচালক সংবাদমাধ্যমে কথা বলছেন না
সার্বিক বিষয় নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কথা বলতে রাজি হননি৷ তিনি জানান,‘‘ আমি গত এক সপ্তাহ ধরে মিডিয়ার সাথে কথা বলছি না৷ এখন থেকে মিডিয়া সেল কথা বলবে৷’’ কিন্তু মিডিয়া সেলে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো তথ্যই দিতে পারেনি৷ DW