ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের নেপথ্যে কী?

প্রকাশিত: ১০:১১ পূর্বাহ্ণ , জুন ২৪, ২০২০

করোনাকালে ঢাকাবাসীর কাছে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল এখন নতুন আপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে৷ গ্রাহকদের অভিযোগ, গত তিন মাসে প্রকৃত বিলের চেয়ে সাত-আট গুণ বেশি বিল করা হয়েছে৷এই বিল সংশোধন না করে তা আদায়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে৷ শুধু তাই নয়, বিল না দিলে ৩০ জুনের পর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করারও ঘোষণা দেয়া হয়েছে৷

করোনার কারণে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসের বিদ্যুৎ বিল দেয়া হয়েছে অনুমান করে৷ মিটার রিডাররা সরেজমিনে পরিদর্শন করে বিল করেননি৷ সরকার অবশ্য এই তিন মাসের বিদ্যুৎ বিল ঠিক সময়ে পরিশোধ না করার জরিমানা মওকুফ করেছে৷

ঢাকার বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা মাহফুজুর রহমান অভিযোগ করেন, ফেব্রুয়ারি মাসে তার বিদ্যুৎ বিল ছিল এক হাজার ৫৪ টাকা৷ কিন্তু পরের তিন মাসে এক সঙ্গে তার বিল দেয়া হয়েছে ১৬ হাজার ১০০ টাকা৷ প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা৷ মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘‘অতীতে কখনোই এরকম বিল আসেনি৷ অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছিনা৷ পরে ঠিক করে দেয়ার কথা বলছে৷”

এরকম অভিযোগ আরো শত শত গ্রাহকের৷ তারা এখন প্রতিদিন অভিযোগ নিয়ে এই করোনার মধ্যেও বিদ্যুৎ অফিসে ভিড় করছেন৷ কিন্তু প্রতিকার পাচ্ছেন না৷নেপথ্যে কী?
অনুসন্ধানে বিদ্যুৎ বিলের এই ভেলকিবাজির আপাতত তিনটি কারণ খুঁজে পাওয়া গেছে৷

১. মার্চ মাস থেকে বিদ্যুতের দাম বাড়া

২. বছর শেষে রাজস্ব আদায়ের হিসাব মেলাতে বিল বেশি দেখানো এবং

৩. বিদ্যুৎ বিলের ধাপ (শ্লট) ভিত্তিক হিসাব৷

ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের কাহিনি বুঝতে হলে আবাসিক বিদ্যুৎ বিলের হিসেব কীভাবে হয়, তা আগে বুঝতে হবে৷ ১ মার্চ থেকে বিদ্যুতের নতুন দাম কার্যকর হয়েছে৷ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সবশেষ ২৭ ফেব্রুয়ারির প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিলের সর্বনিম্ন স্তরের নাম হচ্ছে লাইফ লাইন৷ এই লাইফ লাইন ৫০ ইউনিট পর্যন্ত৷ প্রতি ইউনিটের দাম এখন ৩.৭৫ টাকা৷

মার্চ থেকে বিদ্যুতের দাম ৫ থেকে ১০ ভাগ বেড়েছে৷ যেমন আগে লাইফ লাইনের প্রতি ইউনিটের দাম ছিলো ৩.৫০ টাকা৷ প্রতিটি ধাপেই এভাবে কম বেশি বেড়েছে৷ এখন আবাসিক বিদ্যুতের দাম-

প্রথম ধাপ: ০-৭৫ ইউনিট- ৪.১৯ টাকা
দ্বিতীয় ধাপ: ৭৬-২০০ ইউনিট- ৫.৭২ টাকা
তৃতীয় ধাপ: ২০০-৩০০ ইউনিট-৬.০০ টাকা
চতুর্থ ধাপ: ৩০১-৪০০ ইউনিট- ৬.৩৪ টাকা
পঞ্চম ধাপ: ৪০১-৬০০ ইউনিট- ৯.৯৪ টাকা
ষষ্ঠ ধাপ: ৬০০ ইউনিটের ঊর্ধ্বে- ১১.৪৮ টাকা

বিদ্যুতের লাইফ লাইন সুবিধা পেতে হলে নির্ধারিত ৫০ ইউনিটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে৷ কিন্তু এর বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে ব্যবহৃত বিদ্যুতের দাম প্রথম ধাপ ৪.১৯ টাকা হিসেবেই দিতে হবে৷

এরপর বিদ্যুৎ বিলের হিসাব করা হয় ধাপ অনুযায়ী৷ কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হলো সেভাবে ধাপগুলো নির্ধারণ করে বিদ্যুতের বিল হিসাব করা হয়৷ এর সঙ্গে আরো কিছু চার্জ যুক্ত হয়৷

এবার মার্চ, এপ্রিল এবং মে এই তিন মাসের বিদ্যুৎ বিল একসঙ্গে দেয়া হয়েছে৷ আর তাও দেয়া হয়েছে অনুমান করে৷ মিটার রিডিং না দেখে৷

তবুও ধরে নিই, একজন গ্রাহক মাসে ৭৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন৷ মাসে মাসে তিনি বিল পেলে তার বিল হতো প্রতি ইউনিট ৪.১৯ টাকা হিসেবে৷ কিন্তু এবার তিন মাসে তাকে একসঙ্গে বিল দেয়া হয়েছে ২২৫ ইউনিটের৷ তাহলে তার প্রথম ধাপ ৭৫ ইউনিটের বিল হয়েছে ৪.১৯ টাকা হিসেবে৷ দ্বিতীয় ধাপ ৭৬-২০০ ইউনিটের বিল হয়েছে ৫.৭২ টাকা হিসেবে, আর ওই গ্রাহকের তৃতীয় ধাপ ২০০-৩০০ ইউনিট-এ ২৫ ইউনিটের বিল হয়েছে ৬.০০ টাকা হিসেবে৷

যদিও বিদ্যুৎ বিভাগ দাবি করছে, তারা একসঙ্গে তিন মাসের বিল করলেও তা গড় করে প্রতিমাসের ধাপ নির্ধারণ করেছে৷ কিন্তু গ্রাহকদের বিলে সেই ধাপ উল্লেখ করা নেই৷ আর তারা লিখিত অভিযোগ করলেও তাদের ধাপ অনুযায়ী বিল দেখানো হচ্ছেনা৷

এর সঙ্গে বছর শেষে রাজস্বের হিসেব মেলানোর জন্য অতিরিক্ত আরো ১০-১৫ ভাগ বাড়তি বিল করা হয়েছে বলে বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে৷

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বিইআরসিকে দেয়া চিঠিতে গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল যৌক্তিক পরিমাণের চেয়ে সর্বোচ্চ ১০ গুণ বা এক হাজার ভাগ বেশি আসার অভিযোগ করেছে৷বিতরণ কর্তৃপক্ষ যা বলছে
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি বা ডিপিডিসির জেনারেল ম্যানেজার রবিউল হুসাইনের দেয়া তথ্যমতে, করোনার কারণে মার্চ, এপ্রিল ও মে এই তিনমাসের বিল একসঙ্গে করা হয়েছে৷ ফেব্রুয়ারির বিল ঠিক ছিলো৷ তাই মার্চের প্রথম তারিখ এবং মে মাসের শেষ তারিখের রিডিং নিয়ে তিন মাসের মোট বিল একসঙ্গে করা হয়েছে৷

তাহলে সাত-আট গুণ বেশি বিল কীভাবে হয়? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, ‘‘তিন মাসের বিল একসাথে পাওয়ায় গ্রাহকের কাছে বেশি মনে হচ্ছে৷ এছাড়া এই সময়ে গরমের কারণে গ্রাহকরা বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন৷ আর মার্চ মাস থেকে যে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে এটা গ্রাহকের মাথায় নেই৷”

কিন্তু তার এইসব ‘যুক্তিতে’ সাত-আট গুণ বিদ্যুৎ বিল বেশি হওয়ার যুক্তি মানতে পারছেন না গ্রাহকরা৷ কারণ তাদের কাছে গত বছরের একই সময়ের বিদ্যুৎ বিল আছে৷ তারা তা মিলিয়ে দেখে অভিযোগ করছেন৷ তাদের দাবি, বিদ্যুতের বিল ১০ ভাগ বাড়ার হিসেব ধরলেও এখনকার বিল প্রকৃত হিসেবের চেয়ে পাঁচ-ছয় গুণ বেশি৷

তবে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান বিদ্যুৎ বিলের ত্রুটির কথা স্বীকার করেন৷ কিন্তু তিনি দাবি করেন, ‘‘তিন মাসের বিলের ধাপ একসঙ্গে নির্ধারণ করা হয়নি৷ গড় করে প্রতিমাসের বিলে ধাপ আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে৷”

অবশ্য বিলে কিছু ভুল আছে এবং তা সংশোধন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিকাশ দেওয়ান৷ তিনি বলেন, ‘‘ওভার এবং আন্ডার বিলিং, দুই ধরনের ঘটনাই ঘটেছে৷ যোগ, বিয়োগ করতেও কিছু ভুল হয়েছে৷”

তারপরও এত গ্রাহকের সাত-আট গুণ বিল বেশি কীভাবে আসে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি৷ এই দুইজন কর্মকর্তা রাজস্ব আদায়ের হিসাব মেলাতে বিদ্যুৎ বিল কিছু বেশি করার অভিযোগও অস্বীকার করেন৷

বিল বাতিলের দাবি
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা প্রকৌশলী শামসুল আলম বলেন, ‘‘তিন মাসের বিল একসঙ্গে করা বেআইনি৷ আর এই বিল একসঙ্গে করার ভিতরেই আছে অনেক জটিলতা৷ মনগড়া বিল করা হয়েছে৷ আমরা মনে করি মাসের বিল মাসে দিতে হবে৷ মনগড়া বিল দিলে চলবেনা৷ আমরা এই বিল বাতিলের দাবি জানিয়েছি৷ প্রতি মাসের বিল প্রতি মাসে দেয়ার দাবি করেছি৷” DW