সংসদের মর্যাদা রক্ষায় দ্রুত কার্যকর তদন্ত ও কঠোর আইনি পদক্ষেপের দাবি টিআইবির

প্রকাশিত: ৯:৩৯ অপরাহ্ণ , জুন ২৩, ২০২০
 মানবপাচার ও অর্থপাচারের মত আন্তর্জাতিক অপরাধ ও দুর্নীতির ঘটনায় সংসদ সদস্যের অভিযুক্ত হওয়াকে বাংলাদেশের রাজনীতি ও জনপ্রতিনিধিত্বে দুর্বৃত্তায়নের একটি অসম্মানজনক দৃষ্টান্ত বলে উল্লেখ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। আজ গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংস্থাটি সংসদের মর্যাদার স্বার্থে দ্রুত কার্যকর তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় সংসদের প্রতি দাবি জানিয়েছে।
এ বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত কুয়েত ও বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে টিআইবির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রথম থেকেই সরকার, জাতীয় সংসদ, দুদক, ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট, রাজস্ব কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এই অভিযোগের ব্যাপারে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন এমন কোন তথ্য পাওয়া যায়নি, উল্টো দায়মুক্তির চেষ্টার লক্ষণ দেখা গেছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, “মানবপাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ নিয়ে কুয়েতের সংবাদ মাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তথাকথিত তদন্তের পর অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে লিখিত প্রতিবেদন দিয়েছেন, যা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আর আমাদের দেশের সরকার ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাতেই আশ^স্ত থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন। জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকেও কোন উদ্যোগের কথা জানা যায় নি। এমনকি সম্প্রতি ঐ সংসদ সদস্যকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে গ্রেফতার ও তার সম্পদ বাজেয়াপ্তের পদক্ষেপের সংবাদ প্রকাশের পরও সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী একাধিকবার জানিয়েছেন, কুয়েত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানালে তাদের কিছু করার নেই। দেশের সুনাম আর হাজার হাজার প্রবাসী শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ যেখানে জড়িয়ে আছে, সেখানে সরকারের এধরনের উদাসীনতা একই সঙ্গে লজ্জার ও আশংকার।”
কুয়েত সরকারের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের অপেক্ষায় না থেকে স্বপ্রণোদিতভাবে এই অভিযোগের বিরুদ্ধে তদন্ত করা সম্ভব ছিল ও উচিতও ছিল, এমন মন্তব্য করে ড. জামান বলেন, “যে হাজার হাজার শ্রমিককে কাজ দেওয়ার নামে পাচার করা হয়েছে এবং কার্যত জিম্মী বানিয়ে দফায় দফায় অর্থ আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, তাঁরা সবাই এদেশেরই নাগরিক। এই পাচারের ঘটনায় দেশের ভিতরে নিশ্চিতভাবেই একটি মানবপাচার চক্র গড়ে তোলা হয়েছিল, যাতে সরকারী-বেসরকারী এক বা একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতাও অনিবার্য। যেসকল আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে তা বাংলাদেশেও ঘোরতর অপরাধ।  তারপরও তদন্তের জন্য কুয়েতের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে কেন? এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে এটুকু স্পষ্ট যে, বরাবরই অভিযোগের কার্যকর তদন্তে সরকারের রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা ছিল না এবং এর পিছনে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের দৃশ্যমান যোগসাজশ ছিল।”
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের উল্লেখ করে বিবৃতিতে মন্তব্য করা হয় যে, এই ন্যাক্কারজনক ঘটনা দেশের রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের একটি দুঃখজনক দৃষ্টান্ত। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, “অতীতে কোন রকম রাজনৈতিক কার্মকা-ে জড়িত না থেকেই ক্ষমতাসীন দলের প্রত্যক্ষ সমর্থন নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন অভিযুক্ত সংসদ সদস্য। এরপর একরকম অভূতপূর্বভাবে তাঁর স্ত্রীও সংরক্ষিত মহিলা আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসেন। কোন্ প্রক্রিয়ায় বা বিনিময়ে এই দম্পতি দলীয় সমর্থন বা মনোনয়ন পেলেন তা দায়িত্বশীলরা খতিয়ে দেখবেন এমনটা আমরা আশা করবো। আর আলোচ্য এই সংসদ সদস্য দম্পতির রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ দেশের জনগণের স্বার্থে না কি ব্যক্তিস্বার্থে জাতীয় সংসদকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করার জন্য- সে প্রশ্নটাও আমাদের করতে হবে। বিশেষত কুয়েতে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হওয়ার পর তাঁর সংসদ সদস্য স্ত্রী জাতীয় সংসদের প্যাডে যেভাবে তাঁর স্বামীর পক্ষে সাফাই দিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন তা রীতিমতো ন্যাক্কারজনক এবং নিশ্চিতভাবেই জাতীয় সংসদের জন্য অবমাননাকর। মাননীয় স্পিকার আদৌ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছেন কিনা এবং সংসদ সদস্যগন বিব্রতবোধ করেছেন কিনা সেটা আমাদের জানা নেই। সম্প্রতি লিবিয়াতে মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের ঘটনার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা যতটুকু তৎপরতা দেখিয়েছে, তার লেশমাত্র এখানে দেখা যায় না বিধায় আমরা আরো হতবাক।”
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরো বলেন, “দেশের বা ব্যক্তিবিশেষের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হওয়ার অবান্তর সব অভিযোগে সরকার ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতি সংবেদনশীল তৎপরতায় আমাদের নাভিঃশ্বাস উঠে যাচ্ছে। আমরা বরাবরই তার বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জানান দিয়েছি। আর এখন যখন এই আলোচিত সংসদ সদস্য দম্পতির কর্মকাণ্ডে দেশে ও আন্তর্জাতিক পরিমণণ্ডলে দেশের সম্মান সত্যিকারভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে তখন আমরা কোন কার্যকর তৎপরতা দেখতে পাচ্ছিনা। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মাত্র একদিন আগে তাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের লেনদেন স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছে। অভিযোগ আসার পর এতোগুলো মাস পেরিয়ে গেল দুদকের এই পদক্ষেপটা নিতেই! আজ খবর বেরিয়েছে কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসের শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। যোগসাজশ বা দায়িত্বে অবহেলার কারণে সরকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য গৃহিত ব্যবস্থা কি বরাবরের মতো শুধু বদলি করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে কিনা সেটাও আমরা জানিনা।”
দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে প্রবাসী শ্রমিকদের রক্ত পানি করে অর্জিত রেমিটেন্সের গুরুত্বের কথা সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করে ড. জামান বলেন, “এই প্রবাসী শ্রমিকদের অবদানকে বিবেচনায় নিয়ে, দেশ ও জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে সরকার কঠোর অবস্থান নেবেন, স্পিকারের উদ্যোগে অন্তত খতিয়ে দেখা হবে এই ঘটনা সংসদের জন্য কতটুকু অবমাননাকর, আর এর প্রতিকারই বা কি- এমনটাই আশা করে টিআইবি। নাহলে একটি গণতান্ত্রিক দেশের অন্যতম মূল যে ভিত্তি তথা আইনের শাসন তা আরো ভুলুন্ঠিত হবে, রাজনীতি ও জনপ্রতিনিধিত্বে এসব অপরাধের আরো বিস্তার ঘটবে।”