এলাকাভিত্তিক লকডাউন কি শেষ অস্ত্র?

প্রকাশিত: ১১:১৪ অপরাহ্ণ , জুন ৯, ২০২০

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে এবার রাজধানী ঢাকার একটি এলাকা পূর্ব রাজাবাজারকে রেড জোন হিসাবে চিহ্নিত করে মঙ্গলবার রাত থেকে সেই এলাকাকে পরীক্ষামূলকভাবে লকডাউন করা হয়।

গত সপ্তাহে কক্সবাজারে এলাকাভিত্তিক লকডাউন করা হয়েছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জনসংখ্যা এবং সংক্রমণের হার বিবেচনা করে বাংলাদেশকে রেড, ইয়োলো এবং গ্রীন জোনে ভাগ করার পরিকল্পনায় প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির পর তা এখন চূড়ান্ত করা হচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলেছেন, ৬৬দিনের সাধারণ ছুটির টার্গেট ব্যর্থ হওয়ার পর এখন এলাকাভিত্তিক লকডাউন কতটা ফল দেবে- তা নিয়ে তাদের সন্দেহ রয়েছে।

এলাকাভিত্তিক লকডাউন করার সরকারের নতুন পরিকল্পনায় ঢাকায় প্রথম যে এলাকাকে রেড জোন হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেই পূর্ব রাজাবাজার এলাকার বাসিন্দাদের অনেকের মাঝে এই ব্যবস্থা সম্পর্কে বিভান্তি রয়েছে।

সেখানকার একজন বাসিন্দা ডা: ফারহানা আফরিন বলছিলেন, “আমাদের এলাকায় রেড জোন এবং লকডাউনের এই ব্যবস্থায় আসলে কি করা হচ্ছে, সে সম্পর্কে বাসিন্দাদের অনেকের পরিস্খার কোন ধারণা নেই। অনেকে এটা নিয়ে কনসার্ন, আবার অনেকে কনসার্ন নয় বলে আমার মনে হয়েছে।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী এই পূর্ব রাজাবাজার এলাকায় তিন মাসে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছে ২৭জন।

সংক্রমণের সংখ্যা এবং হার বেশি এমন এলাকাগুলোকে রেড জোন হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

দেশে গত ২৬শে মার্চ থেকে ৬৬দিন সাধারণ ছুটি ছিল। কিন্তু তা ছিল একেবারে ঢিলেঢালা।

সেই ছুটির মাঝেই গার্মেন্টস কারখানাগুলো খোলা হয়। ঈদকে কেন্দ্র করে লক্ষ লক্ষ মানুষ গ্রামে এবং শহরে যাওয়া আসা করে।

বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন, লকডাউন শব্দ ব্যবহার না করে সাধারণ ছুটি দেয়াটা ছিল প্রথম ভুল। এছাড়া কঠোরভাবে মানুষকে ঘরে রাখার চেষ্টা না করে ৬৬দিন ছুটি দেয়া হলেও সংক্রমণ ঠেকাতে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

তারা আরও বলেছেন, সরকারের আগের পদক্ষেপ ব্যর্থ হওয়ায় এখন এলাকাভিত্তিক লকডাউন কতটা কার্যকর করা সম্ভব হবে-তা নিয়ে তাদের সন্দেহ রয়েছে।

ঢাকায় কলেরা হাসপাতাল আইসিডিডিআরবি’র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড: এটিএম ইকবাল আনোয়ার বলেছেন, “এখনতো সরকার মেনেই নিয়েছে যে, করোনাভাইরাসের সাথে আমাদের লম্বা সময় ধরে চলতে হবে। এখন এটা কতটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেটা বলা মুশকিল।”

তবে সরকারের নীতিনির্ধারকদের অনেকে অনেকেই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারের পদক্ষেপের ব্যর্থতার অভিযোগ মানতে রাজি নন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেছেন, সাধারণ ছুটির ইতিবাচক প্রভাবের কারণে এক লাফে বিস্ফোরণের দিকে যায়নি বলে তারা মনে করেন।

“লকডাউনটা আমাদের সংবিধানে ছিল না। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই ঘরে থেকে সহযোগিতা করেছে এবং সেকারণে সংক্রমণের ব্যাপক বিস্তার ঘটেনি। সাধারণ ছুটি যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, সেটা আমাদের সংক্রমণের পরিসংখ্যানই বলছে।”

একইসাথে তিনি বলেছেন, “এটাতো জানেনই যে, আমাদের উহান থেকে লোক আনতে হয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদের লোক এসেছে। বিভিন্ন কারণে আমরা পারিনি। আর ব্যাপক জনগোষ্ঠীর ঘনবসতির দেশ। এগুলো অনেক কারণ আছে।”

সংক্রমণের শুরুর দিকে ঢাকার টোলাবাগ এলাকা এবং মাদারিপুরের শিবচরকে লকডাউন করে ইতিবাচক ফল পাওয়ার বিষয়কে উদাহরণ হিসাবে তুলে ধরে মি: হোসেন বলেছেন, এখন এলাকাভিত্তিক লকডাউন সফল হবে বলে তারা মনে করছেন।

তবে ঢিলেঢালা সাধারণ ছুটি এবং সেই ছুটি প্রত্যাহারের পর অর্থনৈতিক সব কর্মকান্ড চালু করায় এখন সংক্রমণ উর্ধ্বমুখী রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

সেই প্রেক্ষাপটে জনসংখ্যা এবং সংক্রমণের হার বিবেচনা করে দেশকে রেড, ইয়োলো এবং গ্রীন জোনে ভাগ করার প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যেই সম্মতি দিয়েছেন।

এরপর বিশেষজ্ঞ কমিটি পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করার আলোচনা চালাচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন ডা: লেনিন চৌধুরী, তিনি মনে করেন, শুধু জোন ভাগ করে বাঁশ দিয়ে রাস্তা আটকিয়ে রাখলেই সংক্রমণের বিস্তার ঠেকানো যাবে না।

“জোনে ভাগ করা হয় এই কারণে যে, রোগীদের চিহ্নিত করে যাতে ব্যবস্থা নেয়া যায়। যেমন ধরেন, একটি ইয়োলো জোনে ৩০জন রোগী আছে। এই ৩০জনকে চিকিৎসার আওতায় এনে তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে পরীক্ষা করে ব্যবস্থা নিতে হবে। এভাবে একটা ইয়োলো জোনকে সংক্রমণমুক্ত গ্রীন জোনে পরিণত করতে হবে।”

“রেড জোনকে কিন্তু পরীক্ষার অভিযানের আওতায় আনতে হবে। এগুলো না করে শুধু জোনে ভাগ করলেই সুফর পাওয়া যাবে না” বলে তিনি বলেছেন।

প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের বক্তব্য হচ্ছে, তারা বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে কার্যকর সব পদক্ষেপই নিচ্ছেন।

“রেড জোন চিহ্নিত করে, সেখানে রাস্তাঘাট সব বন্ধ করে দেয়া হবে যাতে বাসিন্দারা মুভমেন্ট করতে না পারে। বাসিন্দারা যারা অনলাইন খাবার কিনে আনতে পারবেন। যারা তা পারবেন না, তাদের জন্য চাল,ডাল বা সবজির বিক্রেতা ভ্যানে করে সরবরাহ করবে।”

মি: হোসেন আরও বলেছেন, “করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য জোনের ভিতরে বুথ থাকছে, যেখানে বাসিন্দাদের নমুনা সংগ্রহ করা হবে। এলাকার ভিতরেই ঔষধ এবং ডাক্তার রাখা হচ্ছে, যাদের প্রয়োজন হবে-তারা সেই সুবিধা নিতে পারবেন। এসব ব্যবস্থায় ১৪দিনে একটা জোনে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি।”

সরকারের সাথে সম্পৃক্ত বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলেছেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় শেষ অস্ত্র হিসাবে সরকার এলাকাভিত্তিক লকডাউনের এই পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেটা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা না হলে পরিস্থিতি খারাপের দিকেই এগুবে।