DW এর সংবাদভাষ্য

বাংলাদেশে বর্ণবাদ: ‘এডিটার খোঁজ রাখে ক’জনার?’

প্রকাশিত: ১২:২৬ অপরাহ্ণ , জুন ৬, ২০২০

বাংলাদেশে অ্যাসিড সন্ত্রাস কমেছে, কিন্তু ফর্সা রং-প্রীতি কমেনি৷ হ্যাঁ, যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশ যেভাবে জর্জ ফ্লয়েডদের মেরে ফেলে, সেভাবে কোনো মানুষকে শুধু কালো বলে মেরে ফেলা হয় না৷তাই বলে দেশে বর্ণবাদ নেই তা ভাবলেও ভীষণ ভুল হবে৷

শুধু গায়ের রং কালো বলে অনেকেই খুব জ্বালা-যন্ত্রণা পায়৷ সইতে না পেরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রও ছয় তলা ভবনের ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করেন৷

মেয়েদের অবস্থা আরো খারাপ৷
এক অনলাইন ব্যবসায়ী তরুণী ফেসবুক লাইভে একটি ক্রিমের কার্যকারিতা বর্ণনা করতে গিয়ে দাবি করে বসলেন, কোনো কালো মেয়ে সেই ক্রিম মাখলে ফর্সা তো হবেনই, চোখ ট্যারা থাকলে তা-ও সোজা হয়ে যাবে৷ শুধু তা-ই নয়, সে নাকি এমন ক্রিম যা পেটে মাখলে যে নারীর বাচ্চা হয় না, খুব তাড়াতাড়ি তার বাচ্চাও হয়ে যাবে!

এমন প্রচারে কাজ হয় বলে, কালো বলে গঞ্জনা সইতে সইতে মুক্তির আশায় অনেক মেয়ে কেনার জন্য ছুটে আসেন বলেই ফেসবুক লাইভে ক্রিম নিয়ে হাজির হয়েছিলেন অনলাইন ব্যবসায় পটু হয়ে ওঠা সেই তরুণী৷ বিষয়টি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার নিরাপত্তা ও অপরাধ বিভাগের নজরে আসায় ওই তরুণী ফেসবুকে ক্ষমা চেয়ে এ যাত্রা রেহাই পেয়েছেন৷

এই রেহাই পাওয়ার অর্থ হলো, ‘সাবু শপ’-এর মালকিন ভবিষ্যতে হয়ত আর ক্রিম মাখলে ট্যারা চোখ সোজা হবে বা ক্রিমের ফুঁস মন্তরে বাচ্চা হবে বলবেন না, কিন্তু যে কেউ ফর্সা, সুন্দর, আকর্ষণীয় হয়ে উঠবেন তা তো নিশ্চয়ই বলবেন! সুতরাং, তথাকথিত ফর্সা না হওয়ায় অনেকেই নিজেকে বিয়ের বাজারে অচল, চাকরির বাজারে অযোগ্য ভেবে সাবু শপে টাকা ঢালবেন৷

অথচ গায়ের রং যে কোনো যোগ্যতা বা অযোগ্যতা হতে পারে না- এ কথা অনেক দিন ধরেই বিভিন্ন স্তরে বলা হচ্ছে৷ তাই বলা যাবে না যে, সচেতনতা বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেই৷ উদ্যোগ আছে ঠিকই, তবে তাতে ধারাবাহিকতা এবং কারো আস্থা নেই৷আস্থা জন্মানোর কোনো কারণও নেই৷ গায়ের রং নিয়ে হীনমন্যতা তো সব পর্যায়েই রয়ে গেছে আগের মতো৷ সমাজের উঁচু স্তরেই আস্থাহীনতাটা প্রায় আকাশ সমান উঁচু৷

আগে হিন্দি সিনেমায় দেখা যেতো কালো থেকে ফর্সা হয়ে সুপারহিট হেমা মালিনি, রেখা, শ্রীদেবী, শিল্পা শেঠিকে, তারপর দেখা গেছে কাজল, বিপাশা বসুদের, এখন দেখা যাচ্ছে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, দীপিকা পাড়ুকোনদের৷

ঢাকাই ফিল্ম এবং টেলিভিশন নাটকে আগে দেখা যেতো রোজিনা, নিমা রহমানদের মেকআপে অবয়বের প্রকৃত রং ঢেকে পর্দায় আলো ছড়াতে, তাদের পরে একই ধারা বজায় রেখেছেন পূর্ণিমা, রোকেয়া প্রাচী, অপি করিম এবং আরো অনেকে৷

অথচ প্রত্যেকেই যার যার জায়গায় দারুণ যোগ্য৷ তবু প্রকৃত রং আড়াল করে নিজেকে ফর্সা না দেখিয়ে ব্যাতিক্রমী আত্মবিশ্বাসী নারীর দৃষ্টান্ত হতে কেউ পারেননি৷

বাংলাদেশে এমন একজনও নেই যিনি গর্ব করে বলতে পেরেছেন, ‘‘আমি গায়ের রং নিয়ে একটুও কুণ্ঠিত নই৷ ফর্সা হতে চাই না আমি, আপনারও ফর্সা হওয়ার দরকার নেই৷’’

আসলে সেরকম পরিবেশই তৈরি হয়নি এখনো৷

এখনো নিষিদ্ধ হয়নি তথাকথিত রং ফর্সাকারী ক্রিম৷ তাই তৈরি হচ্ছে হাস্যকর সব বিজ্ঞাপন৷ সেই বিজ্ঞাপন প্রচার করছে সব গণমাধ্যম৷ কোনো প্রতিষ্ঠিত তারকা কোনোদিন বলেননি, ‘‘রং ফর্সা করার কোনো প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপনের মডেল হবো না৷’’ কোনো মিডিয়া হাউজ একবারও বলেনি, ‘‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি বা এমন অন্য কোনো বিজ্ঞাপন আর নেবো না৷’’

ওসব ক্রিমের বাজার তাই দিনদিন আরো ফুলেফেঁপে উঠছে৷ ‘‘কালোও ভালো”র প্রচার তারিখ দেখে দেখে যতই হোক, তাতে তাই বিশেষ কাজ হচ্ছে না৷

লাইভে এসে এই একুশ শতকের বিশ্বমানের ক্রিকেটার তামিম ইকবালও তাই অকপটে রুবেল হোসেনের গায়ের রং নিয়ে ‘মশকরা’ করছেন, জবাবে কাচুমাচু হয়ে আগ্রাসী ফাস্টবোলারকে বলতে হচ্ছে, ‘‘ ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি মাখছি, ভাই৷’’

আপোষকামীতা এবং অসচেতনতা এত এত ‘উঁচু’ পর্যায়ে এমন নিবিড় হলে ফর্সা-প্রীতি আর কালোয় অশ্রদ্ধা কমবে কেমন করে?

বাংলাদেশে ধর্ম, ভাষা ইত্যাদির কারণে অন্যকে আঘাত করাও নানা মোড়কে বিভিন্ন মাত্রায় চলছে৷

ধর্মের কারণে যেটুকু অন্যায় হয়েছে বা হচ্ছে তার জন্য রাজনীতিবিদদের দায়ই বেশি৷ বড় দলগুলোর বেশি, ছোট দলগুলোর কম, কিন্তু দায় আছে সবারই৷ সময় বুঝে ধর্মের ব্যবহার সবাই কম-বেশি করেছেন এবং করছেন৷

বর্তমান নেতা-নেত্রীদের অনেকে তো বটেই, এমনকি প্রয়াত অনেক ‘নমস্য’ নেতাও স্রেফ সংখ্যাগরিষ্ঠের আরো কাছে যাওয়ার কৌশল হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার করেছেন, নানাভাবে বিদ্বেষ জিইয়ে রাখা, কিংবা বাড়ানোয় ভূমিকা রেখেছেন৷

মজলুম নেতা মওলানা ভাসানিও এর উর্ধে উঠতে পারেননি৷ তাঁর উদ্দেশ্যে খোলা চিঠিতে শওকত ওসমান লিখেছিলেন, ‘‘আপনার সাম্প্রদায়িক উচ্চারণসমূহ গোটা দেশকে আবার বর্ণবিদ্বেষের পঙ্কিল পথেই ঠেলে দেবে৷ জাতীয়তাবাদের অর্জিত চেতনাটুকু ধ্বংস হয়ে গেলে তার পরবর্তী পর্যায় সমাজতন্ত্র আর কোন পথ ধরে আসবে?মধ্যযুগীয় চেতনা বর্তমানে কোনো সমাজবিপ্লবের সহায়ক নয়৷” (গ্রন্থ: পূর্ণ স্বাধীনতা চূর্ণ স্বাধীনতা, পৃষ্ঠা ৭৩)

মওলানা ভাসানী ‘আসসালামুআলাইকুম’ বলে পশ্চিম পাকিস্তানকে মানসিকভাবে বিদায় দিয়েছিলেন ১৯৫৭ সালের কাগমারি সম্মেলনে৷ আট সদস্যের সর্বদলীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন৷ তবে আওয়ামী মুসলিম লীগের হয়ে রাজনীতি শুরু করা দূরদর্শী নেতা পরে ন্যাশনাল আওয়ামি পার্টি গঠন করে সেখানেও বাকি জীবন থাকেননি৷ শেষ জীবনে তাঁর সংগঠনের নাম ছিল ‘খোদাই খিদমতগার’৷ প্রচার? কেমন প্রচার? কিসের প্রসার?

ধর্ম, সংস্কৃতি, আঞ্চলিকতা ইত্যাদির কারণে হিংসা, সহিংসতার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমের ভূমিকা কেমন? স্বীকার করতেই হবে যে, গণমাধ্যমের একাংশ সজাগ, সক্রিয় বলে বিশেষ করে সংখ্যালঘু, বাউল বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের দুর্দশার অনেক খবর অন্তত জানা যাচ্ছে৷ আবার অনেক খবর যে সব সময় পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না, ছাপাও হয় না তা-ও ঠিক৷

চারণ কবি মুকুন্দ দাস সংবাদ মাধ্যমের এমন ভূমিকা দেখে সেই ব্রিটিশ আমলে ‘এডিটার খোঁজ রাখে ক’জনার’ কবিতায় লিখেছিলেন,

‘‘এডিটার খোঁজ রাখে ক’জনার?

চল্লিশ কোটি মায়ের ছেলে নাম ছাপে সে দু’চার জনার৷৷

নামটি যার টাইটেলযুক্ত, লেখনীটি সেথায় মুক্ত,

তা বৈ লিখার উপযুক্ত আছে কি রে আর৷

রামা আজ দিল্লী যাবেন শ্যামা যাবেন কাছাড়-

স্টারে নাচবে কুসুমকুমারী আ মরি খবরের বাহার!

এ দেশের এডিটার যত, বুঝলে তাদের দায়িত্ব কত ;

লেখায় তারা ঢালতো আগুন আসন পেতো নেতার৷

দেশের সেবক উঠতো মেতে জয় দিতো বিধাতার–

তারা ফেলতো ছিঁড়ে বাঁধন ছেদন মুক্ত তারা হতো আবার৷৷’’

(গ্রন্থ : গণসংগীত সংগ্রহ, সম্পাদনা: সুব্রত রুদ্র, পৃষ্ঠা ২১)

মুকুন্দ দাস ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নেমে জেল খেটেছিলেন৷ তার ওপর ঔপনিবেশিক শাসকের জুলুমের খবর সে আমলের অনেক পত্রিকায় ছাপা হতো না৷ কারামুক্তির পর আবার লিখেছেন, লিখতে লিখতেই চারণকবি মৃত্যুকে বরণ করেছেন ১৯৩৪ সালে৷