বেতন-ভাতা ছাড়া বেসরকারি চিকিৎসকদের ঈদ

প্রকাশিত: ৯:১৮ অপরাহ্ণ , মে ৩১, ২০২০

ডা. তাজিন আফরোজ শাহ

ঈদ সবার জন্য অনাবিল আনন্দ বয়ে আনলেও এবারের প্রেক্ষাপটটা অনেকটাই ভিন্ন ছিল। নোভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতি সব কিছু উলট-পালট করে দিয়েছে। তবু জীবন থেমে থাকেনি। তাইতো সবাই তাদের নিজেদের মত করে ঈদুল ফিতরের আনন্দে মেতে উঠেছিল। কিন্তু এই লকডাউন পরিস্থিতিতেও নিজেদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ফ্রন্টলাইনে থাকা সরকারি চিকিৎসকদের পাশাপাশি বিভিন্ন হাসপাতালে দিন রাত স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছেন বেসরকারি চিকিৎসকরা। তাদের অনেকেই ঠিক মত বেতন, উৎসব ভাতা পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে তাদের ঈদ কেটেছে অনেকটাই নিরানন্দে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই।

সরকারি চাকরিতে আর যাই হোক মাস শেষে নিয়মিত পাওয়া যায় বেতন–ভাতা, প্রণোদনা, রয়েছে চাকরির নিশ্চয়তা। আর বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে তা সব সময় মানা হয় না বা হয়ে ওঠে না। আর এ জন্যই সেদিন ফেসবুকে আক্ষেপ করে একজন লিখেছেন “চাকরি করলে সরকারি আর চাষ করলে তরকারি”। সবে মাত্র খুশির ঈদ শেষ হলো কিন্তু দেশের বেশির ভাগ বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে কর্মরত শিক্ষক, চিকিৎসক ও কর্মচারীরা ঠিকমত বেতন ও উৎসব ভাতা পাননি বলে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে শোনা যাচ্ছে।

মৃত্যু ঝুঁকি মাথায় নিয়ে দেশের করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা প্রদানে অনন্য নজির স্থাপন করে চলেছেন দেশীয় চিকিৎসকরা। বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশনের (বিডিএফ)-এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী আজ পর্যন্ত কোভিড আক্রান্ত ডাক্তারদের সংখ্যা মোট ৯৪১ জন, এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন প্রায় ৪২০ জন। মৃত্যুবরণ করেছেন ১০ জন, তবে কোভিডের লক্ষণ ও এক্সপোজার হিস্ট্রি নিয়ে মৃত কিন্তু টেস্ট নেগেটিভ এসেছে (৩০-৪০% ক্ষেত্রে আসতেই পারে) এরকম চিকিৎসকরা যুক্ত করলে এই সংখ্যাটা ১২ এর ওপরে।

তারপরেও এদেশে প্রায় ৫০ হাজারের বেশি চিকিৎসক বেসরকারি মেডিকেল কলেজ বা হাসপাতালগুলোতে সেবা প্রদান করে যাচ্ছেন। তাদের চাকরির নিশ্চয়তা নেই, অন্যান্য সুযোগ সুবিধাও কম, প্রণোদনা তো দূরের কথা। এই করোনা দুর্যোগের সময় তাদের অনেকেরই বেতন বন্ধ করে দেওয়া এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করায় এ বিপুল সংখ্যক পেশাজীবীদের মধ্যে হতাশা নেমে এসেছে।

চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশন-বিডিএফের পরিচালিত সম্প্রতি এক জরিপে করোনা সঙ্কট শুরু হওয়ার পর থেকে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালগুলোর ৬১ শতাংশ চিকিৎসকের বেতন অনিয়মিত হয়ে পড়েছে বলে প্রতিবেদন উঠে এসেছে। বিডিএফ গত ১৩ থেকে ১৫ মে অনলাইনে জরিপ চালিয়ে পরিস্থিতির ব্যাপকতা বোঝার চেষ্টা করে। ৫১৯ জন চিকিৎসকের ওপর চালানো ওই জরিপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাস সঙ্কট শুরুর পর বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালগুলোর ৬১ শতাংশ চিকিৎসকের বেতন অনিয়মিত; বোনাস পাননি ৮৩ দশমিক ৮ শতাংশ।

হালেই কোভিড ডেসিগনেটেড হওয়া হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, গত ডিসেম্বরে সর্বশেষ বেতন পেয়েছি। জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল মাসের বেতন এখনও হয়নি। আমরা অনেক দেন-দরবার করেছি। তারা দিব, দিচ্ছি করছে। বলছে তাদের ফান্ড নাই। হাসপাতালে রোগী নেই। আমরা যদি বেতনটা না পাই তাহলে কীভাবে চলে? রাজধানীর কেয়ার হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, ফেব্রুয়ারি মাসের বেতনের ৩ ভাগের দুই ভাগ বেতন পেয়েছি। মার্চ-এপ্রিলের বেতন হয়নি। নার্স, আয়া, ওয়ার্ড বয় সবারই এক অবস্থা। সেখানকার একজন চিকিৎসক বলেছেন, লকডাউনের আগে নিয়মিত বেতন হলেও এখন সমস্যায় পড়েছি আমরা। কর্তৃপক্ষ বলেছে, শুধু যারা উপস্থিত থাকবে তাদের বেতন দেওয়া হবে।

আমি নিজেই যেহেতু চিকিৎসক এবং বিভিন্ন চিকিৎসক পেশাজীবী সংঘটনের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন জন বিভিন্ন অভিযোগ করেন আমাদেরকে। উল্লেখ্য, বিভিন্ন মাধ্যম যেমন, ফেসবুক পেজ/গ্রুপ, ফোনালাপ এবং ই-মেইল থেকে জানা যায়, বেতন বকেয়া রয়েছে ইউএস বাংলা মেডিকেল ৫ মাস, সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল ৬ মাস, শাহাবুদ্দীন মেডিকেল কলেজ ২ মাস, ম্যান্ডি ডেন্টাল কলেজ ১০ মাস, সিটি ডেন্টাল কলেজ ১২ মাস, নর্দার্ন মেডিকেল-রংপুর ৩ মাস। এ ছাড়াও অর্ধেক বেতন দিয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে আদ দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ খুলনা ও যশোর, কুমুদিনী উইমেনস, মুন্নু মেডিকেল মানিকগঞ্জ, ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজ, কেয়ার মেডিকেল কলেজ, সেন্ট্রাল মেডিকেল-কুমিল্লা, ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল-টঙ্গী।

তাছাড়া আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ছাঁটাইয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বেসরকারি অনেক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্মীদের গত বছরের বেতনও বকেয়া রয়েছে। তাদের অভিযোগ, এখন মহামারির কথা বলে তাদের বকেয়া পরিশোধ করা হচ্ছে না। এদিকে বিভিন্ন বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে একই অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, পর্যাপ্ত সুপারভিশন ও জবাবদিহিতার অভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ তাদের ডাক্তার ও অন্যান্য স্টাফদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করে থাকেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া স্বত্বেও বেশিরভাগ বেসরকারি ডাক্তাররা কোনো রকম নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পান না। তারা ট্যাক্স দেন, দেশের ক্রান্তিলগ্নে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রোগী দেখেন, কিন্তু তাদের জব ও ফাইনান্সিয়াল সিকিউরিটির দিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তথা মন্ত্রণালয়ের ন্যুনতম দৃষ্টি আছে কিনা সন্দেহ। আমাদের দাবি, সরকার তাদের এই বঞ্চিত নাগরিকদের প্রতি নজর দিক, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করুক সার্ভিস রুল বানাতে এবং প্রত্যেকের বেতন বোনাসসহ সব বকেয়া পরিশোধ করাতে।

তারা যে বেতন না দেয়ার জন্য আর্থিক ক্ষতির অজুহাত দিবে, সেটা যেন সরকার খতিয়ে দেখে এবং সত্য হলে প্রণোদনা বা সহজ শর্তে লোন দিয়ে সেটা পূরণ করে দেয়। আর সেটা না করতে পারলে যেসব প্রতিষ্ঠান মাসের পর মাসের বেতন দিচ্ছে না তাদের শাটডাউন করে মালামাল নিলামে উঠিয়ে ডাক্তার ও স্টাফদের বকেয়া পরিশোধ করানো হোক।

১০টি সুপারিশমালা-

করোনা চিকিৎসায় অগ্রদূত ডাক্তারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষে নিম্নোক্ত ১০টি সুপারিশমালা পেশ করা হল।

১. অবিলম্বে বেসরকারি ডাক্তারদের বকেয়াসহ পূর্ণ বেতন ঈদ বোনাস পরিশোধের উদ্যোগ নেবার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। পাশাপাশি চিকিৎসকগণের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবার দাবি জানাচ্ছি।

২. ডাক্তারদের পর্যাপ্ত সংখ্যক উন্নত মানের পিপিই ও মাস্ক সরবরাহ নিশ্চিত করা।

৩. করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ডাক্তারদের আইসোলোশনে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধাসহ পৃথক হোটেল ও অ্যাপার্টমেন্টের ব্যবস্থা করা।

৪. করোনা রোগী সনাক্ত করার সুবিধা উপজেলা পর্যায়ে চালু করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, সরঞ্জাম ও জনবল নিয়োগ করা।

৫. চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রমে নিয়োজিতদের সম্মান প্রদান ও কর্মক্ষেত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

৬. বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের করোনাতে আক্রান্ত বা মৃত হলে সরকারি চাকরিজীবীদের মত প্রণোদনা দিতে হবে।

৭. প্রতিটি বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে জব সিকিউরিটি ও সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী বেতন কাঠামো অনুযায়ী সার্ভিস রুল থাকতে হবে।

৮. হাসপাতাল চালানোর জন্য পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করতে হবে।

৯. রোস্টার ডিউটির সময়ে খাবারের ব্যবস্থা থাকতে হবে ও নারী ডাক্তারদের ইভনিং বা নাইট ডিউটির সময় ট্রান্সপোর্ট সুবিধা রাখতে হবে। স্টাডি লিভ ও ম্যাটার্নিটি লিভের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

১০. ছুটির দিন বা ডিউটি আওয়ারের বাইরে যদি হাসপাতালে আসতে হয় তাহলেও ট্রান্সপোর্ট সুবিধা দিতে হবে।

উপরোক্ত সুপারিশমালা অনুসরণ করা হলে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, সেই অনুযায়ী দেশের করোনা পরিস্থিতি আশু উন্নতি হবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস।

লেখক: ডা. তাজিন আফরোজ শাহ, সহযোগী অধ্যাপক, উত্তরা আধুনিক মেডিক্যাল কলেজ ও কো-চেয়ারপার্সন, বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশন (বিডিএফ)