আমরা কি পৃথিবীতে অমর হয়ে থাকতে চাই?

প্রকাশিত: ৯:১২ অপরাহ্ণ , মে ৩১, ২০২০

রহমান মৃধা, সুইডেন থেকে

বর্তমানে কারও মৃত্যুতে কি সেই আগের মতো কান্নার রোল ওঠে যেমনটি উঠেছে অতীতে? কারও মৃত্যুর পরে আমরা কি স্মরণে রাখি সেই মৃত ব্যক্তিকে? কী করলে পৃথিবী মনে রাখবে আমাদের? আমরা কি পৃথিবীতে অমর হয়ে থাকতে চাই? এ সব প্রশ্ন কি আমাদের হৃদয়ে দোলা দেয়?

বহুবার শুনেছি বিশ্বের বড় বড় প্রাক্তন নেতা, ম্যানেজিং ডিরেক্টরদের বলতে, ক্ষমতায় থাকাকালীন কেন যে এটা, ওটা করিনি। যদি আবার সুযোগ আসে জীবনে তবে সব কিছুর পরিবর্তন করে ফেলবো। বাংলাদেশে এধরণের কাহিনী নিশ্চয় শুনেছেন অনেকেই। বিশেষ করে রাজনীতিবিদরা যখনই ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে, পুনরায় ক্ষমতায় এলে কী করবেন আর কী না করবেন এটাই সব সময় বলে থাকেন।

পৃথিবীতে অনেক শিল্পপতি, কোটিপতি রয়েছেন যারা বেঁচে থাকতেই অনেক কিছু করেছেন তার দেশ এবং বিশ্বের জন্য। আবার অনেকে কিছুই করেননি। জানি না তারা দ্বিতীয়বার বেঁচে থাকার সুযোগ পেলে কিছু করতেন কিনা!

আমরা মানবজাতি কিছু হারালে তার গুরুত্ব অনুভব করি কিন্তু সেটা থাকাকালীন তা করিনা। কেন যে এমনটি হয় তাকি আমরা জানি? আমরা কি তাহলে ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে সব ভুলে যাই?

এবারের করোনায় অনেক বড় লোকও আক্রান্ত হয়েছেন এবং অনেকে মারাও গেছেন। যারা মারা গেছেন তাদের আর ফিরে পাওয়া যাবে না, তবে যারা মরার হাত থেকে বেঁচে গেছেন তারা নিশ্চয় ভুলে যাবেন না।
ইটালি, স্পেন বা অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের শীর্ষ ধনী পরিবারের মধ্যেও অনেকে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

এরা শুধু বাংলাদেশে নয়, সিঙ্গাপুর ও কানাডার ধনীদের তালিকায়ও স্থান পেয়েছে। শুনেছি এবারের করোনায় একটি ধনী পরিবারের প্রায় সকলেই আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে দুজনের অবস্থা সংকটাপন্ন। তাদের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আইসিইউ বেড দিয়েছে। দুঃখের বিষয় মাত্র একটি যন্ত্র যা শুধু একজনকেই সেবা দিতে পারে। অথচ দুজনই মরণাপন্ন।

গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, অন্তিম সময়ে ছোট ভাইয়ের মুখ থেকে যন্ত্রটি (ভেন্টিলেশন সাপোর্ট) খুলে নিয়ে বড় ভাইকে দেয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে তার ফুসফুসের কার্যক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে মারা যান বড় ভাই। পরে তড়িঘড়ি করে যন্ত্রটি দেয়া হয় ছোট ভাইয়ের মুখে। মৃত্যুর সঙ্গে এখনও লড়ছেন তিনি।

বাংলাদেশে অনেক পরিবার রয়েছে যাদের বার্ষিক টার্নওভার দেশের স্বাস্থ্যখাতের মোট বাজেটের চেয়ে বেশি। তাদের মতো দুয়েকজন উদ্যোক্তা চাইলেই দেশের পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে পাল্টে দিতে পারতেন। কিন্তু তারা কি জানতেন যে এমন একদিন আসবে, যখন কোটি কোটি টাকা থাকলেও সিঙ্গাপুর-থাইল্যান্ডের দরজা খুলবে না?

তারা কি জানতেন যে, মহামারীর বিশ্বায়ন হবে আর জাতি নিজ বাউন্ডারির মধ্যে বসে থাকবে। সহসাই এই দরজা খুলবে না। যারা দেশকে ভালোবেসে দেশের দায়ভার নিয়েছে তারা ছাত্রজীবন থেকেই স্বপ্ন দেখেছে বাংলাকে সোনার বাংলা করবে। বঙ্গবন্ধু কোর্ট পরতেন যাতে কিনা তিনি ভুলে না যান তার ছয় দফা। এখন বঙ্গবন্ধুর মতো কোর্ট অনেকেই পরে, তবে তার মতো করে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকতে কেউ কাজ করেন না।

জানি না বর্তমান যারা সেই ডিজাইনের কোর্ট পরেন তাদের মিশন কী। তারা ক্ষমতায় গিয়ে সব ভুলে শুধু নিজেদের কথাই ভেবেছে। আজ বাংলার মানুষের পেটে খাবার নাই। হাসপাতালে গেলে চিকিৎসার ব্যবস্থা নাই। যদি আমরা সবাই একটু সহানুভূতির পরিচয় দিয়ে কাজ করি তাহলে সত্যিই বাংলাদেশ সোনার বাংলা হতে পারে। সব রেখে চলে যেতে হবে সেই অজানা দেশে, কিছুই সঙ্গে যাবে না।

মনের কাছে হাজার প্রশ্ন রেখে একটি কথা শুধু বলবো, আজ পৃথিবীতে ভালোবাসা ছাড়া কিছুই স্থায়ী নয়। আসুন ভালোবাসা রেখে যাই যাবার বেলায়। কারণ সন্ধ্যা ঘনিয়ে যাবে, বেলা শেষ হয়ে যাবে, যদি তার আগে কিছু রেখে যেতে না পারি তবে কী স্মৃতি নিয়ে নতুন প্রজন্ম বেঁচে থাকবে?

রহমান মৃধা, দূরপরবাস সুইডেন থেকে, [email protected]