ঝুঁকিতে জনগণের আমানত

ব্যাংক ঋণ নিয়ে ধনীদের লড়াই

প্রকাশিত: ২:২৪ অপরাহ্ণ , মে ২৯, ২০২০

এক ব্যাংকের পরিচালকের ঋণ চাই৷ ঝুঁকি বিবেচনায় রাজি হননি অন্য ব্যাংকের পরিচালক৷ যা নিয়ে বিরোধে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে মামলা৷ বিবাদীপক্ষ অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো বাদী পক্ষের বিরুদ্ধে ঋণ নেওয়ার অভিযোগ তুলেছে৷করোনা ভাইরাস মাহামারিতে বিপর্যস্ত দেশের অর্থনীতি৷ শুধু দেশ নয় বরং পুরো বিশ্বের অর্থনীতি এক ভয়াবহ মন্দার সামনে দাঁড়িয়ে আছে৷ অন্যদিকে, বেশ কয়েক বছর ধরে বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণের কারণে দেশের ব্যাংকখাত ‍নাজুক অবস্থায় রয়েছে, ভেঙ্গে পড়তে পারে যেকোনো সময়ে৷

গত বছর সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমান ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা৷ যদিও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর মতে, বাংলাদেশে প্রকৃত অর্থে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো অনেক বেশি৷ বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি, ১১ দশমিক ৪ শতাংশ৷ গত ১৯ মে এক্সিম ব্যাংকের করা মামলার এজাহার অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালক সিকদার গ্রুপ ৫০০ কোটি টাকা ঋণের জন্য যে সম্পত্তি বন্ধকের প্রস্তাব দিয়েছে সেটির বাজার মূল্য ঋণের পরিমান থেকে অনেক কম হওয়ায় এক্সিম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া এবং অতিরিক্ত এমডি মোহাম্মদ ফিরোজ হোসেন ঋণ দিতে রাজি হননি৷ আর তাতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালকদের একজন রন হক সিকদার এমডি হায়দারকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করেন৷

পরে রন সিকদার ও তার ভাই দিপু হক সিকদার এক্সিম ব্যাংকের দুই পরিচালককে অপহরণ করে নির্যাতন করেন এবং অস্ত্রের মুখে সাদা কাগজে সই নেন৷ এক্সিম ব্যাংকের মামলার পর পুলিশ দুই ভাই রন ও দিপুকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে৷

এক্সিম ব্যাংকের মামলার পর ন্যাশনাল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের পরিচালকের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলে, রন হক এ ধরনের কোনো ‍ঋণের আবেদনই করেননি৷

‘‘বরং এক্সিম ব্যাংকের জনৈক পরিচালক ব্যবসা প্রসারের জন্য ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকারের ঋণ সুবিধা গ্রহণ করে৷ জনৈক পরিচালক তার কন্যার নামেও ঋণ সুবিধা গ্রহণ করে৷ জনৈক পরিচালক বেনামে ঋণ সুবিধা গ্রহণের জন্য প্রস্তাব প্রেরণ করেছেন৷”

১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার দেশের ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি-র চেয়ারম্যান৷ অন্যদিকে, দেশে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত প্রথম বেসরকারি ব্যাংক ‘ন্যাশনাল ব্যাংক’র মালিকানা রয়েছে দেশের প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী সিকদার পরিবারের হাতে৷

দেশে বর্তমানে ৫৯টি ব্যাংক কার্যক্রম চালাচ্ছে৷ তারমধ্যে ৪১টি বেসরকারি, ৯টি বিদেশি ও ৯টি রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংক৷ খেলাপি ঋণের কারণে বেশিরভাগ ব্যাংকই ভেতর থেকে ক্ষয়ে গেছে৷ অথচ, বড় অংকের ঋণ খেলাপিরা মূলত দেশের ধনী শ্রেণী, যারা ক্ষমতাবান এবং অনেকেই সরকার ঘনিষ্ঠ৷ নিয়েম-কানুনের তোয়াক্কা না করে ক্ষমতা দেখিয়ে তারা মোটা অংকের ঋণ নিয়েছেন এবং ঋণ ফেরত দিতে কোনো তাড়াও নেই তাদের মধ্যে৷ সরকার থেকেও নানা কারণে তাদের চাপ প্রয়োগ করা হয় না৷

অনেক সময় ব্যাংকের দুর্নীতিগ্রস্ত পরিচালকেরাও নিজেদের লাভের বিনিময়ে অবৈধ ঋণ দিয়ে ব্যাংককে ডুবিয়ে দেন৷ যার একেবারে টাটকা উদাহরণ বেসিক ব্যাংক এবং সেটির সাবেক পরিচালক আবদুল হাই বাচ্চু৷ অথচ ব্যাংকের আমানতের যোগানদাতা সাধারণ মানুষ৷ ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে সাধারণ মানুষ কষ্ট করে ব্যাংকে টাকা জমায়৷ সেই টাকা ঋণ দিয়ে ব্যবসা করে ব্যাংক৷ ঋণ নিয়ে ধনী শ্রেণী আরো ধনী হয় এবং সময়মত ঋণ পরিশোধ না করায় খেলাপি হলেও ক্ষমতার জোরে থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে৷ ঝুঁকিতে পড়ে যায় সাধারণ মানুষের আমানত৷ এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, ‘‘যারা ঋণ খেলাপি তারা রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে তাদের যোগাযোগ থাকে৷ এখন সংস্কৃতিটা দাঁড়িয়েছে যে, মানুষ ঋণ নেয় সেটা ফেরত দেবে না জেনেই৷ খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপের অভাবই এটা হচ্ছে৷” এক্সিম ব্যাংক কাণ্ডের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘‘আইন কি আমাদের শাসন করছে, নাকি কয়েকটি ধনী গ্রুপ আমাদের শাসন করছে৷ ব্যাংকারদের নিয়ে আমরা আগে থেকে বিভিন্ন প্রশ্ন শুনে আসছি৷ তারা চাপে আছেন, আবার কেউ কেউ ঘুষ নিয়ে কাজ করছেন৷ এখন যেটা জানা গেল, সেই চাপটা ভয়ংকর৷ এ কাজটা করল সরকার ঘনিষ্ট একটা ধনী গ্রুপ, যাদেরও একটি ব্যাংক রয়েছে৷ এরা অনেক ক্ষমতাবান, অনৈতিক ক্ষমতাবান৷

‘‘এক্সিম ব্যাংকের মালিকেরাও ধনিক গোষ্ঠী৷ এক ধনিক গোষ্ঠী গুলি করেছে, আরেক গোষ্ঠী তাদের রক্ষা করতে চেয়েছে৷”

ব্যাংক এভাবে চাপে পড়লে জনগণের আমানত অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বলেও মনে করেন তিনি৷ বলেন, ‘‘চাপে পড়ে ঝুঁকি বিবেচনা করে ঋণ দিলে তা আর আদায় হবে না৷ ফলে জনগণের আমানতের খেয়ানত হবে৷ এমনিতেই ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণে জর্জরিত৷ আর চাপ দিয়ে নেওয়া ঋণই তো খেলাপি হয়৷”

তিনি সরকারের কাছে এ ঘটনার দ্রুত নিষ্পত্তির আবেদন করেছেন৷ না হলে এই খাতে মানুষের আস্থা ফিরবে না৷ খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যাংকখাত হয়তো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে৷ DW